বিশেষ প্রতিবেদন: ২৫ শে বৈশাখ দিনটির মধ্যেই কেমন যেন একটা নস্টালজিক ব্যাপার লুকিয়ে আছে৷ বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বনের মধ্যে ২৫ বৈশাখ জায়গা করে নিয়েছে৷ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনটি তাই আপামোর বাঙালির কাছে একটা উৎসব৷ স্কুল-কলেজ কিংবা পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তী বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত৷ আজও বাঙালির জীবনে সমান প্রাসঙ্গিক রবীনদ্রনাথ৷ তাই তো ২৫ শে বৈশাখ, ইংরাজি ৯ মে বাঙালির ঘরে ঘরে ঘটা করে পালিত হয় রবীন্দ্র জয়ন্তী৷ ১৫৭তম জন্ম জয়ন্তীর প্রাক্কালে কবিগুরু সম্পর্কে এই ১০ টি তথ্য বাঙালির না জানলেই নয়৷

(১) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আর্জেন্তাইন লেখক ও সম্পাদক ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ক এক ধরনের রহস্যময় বলা যেতে পারে। ১৯২৪ সালে ইউরোপ থেকে পেরু যাত্রাপথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসুস্থ হয়ে আর্জেন্তিনায় থাকার সময় ওকাম্পো তাঁর সেবা করেছিলেন। ওকাম্পো কোনওদিন ভারতে আসেননি, কিন্তু এই দুজনের প্লেটোনিক সম্পর্ক এখনও গবেষক, সাহিত্যপ্রেমীদের কৌতূহলী করে তুলে। সেরকমই একজন আর্জেন্তাইন পরিচালক পাবলো ছিসার। যিনি রবীন্দ্রনাথ এবং ওকাম্পোর সম্পর্ক নিয়ে চলচিত্র নির্মাণ করেছেন। সিনেমার নাম ‘থিংকিং অব হিম’৷ এতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভিক্টর ব্যানার্জি, ওকাম্পোর চরিত্রে আছেন আর্জেন্তাইন অভিনেত্রী এলেনোরা ওয়েক্সলার। অন্য একটি চরিত্রে আছেন রাইমা সেন৷

(২) ২০০৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পদকটি শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণ কমপ্লেক্সের জাদুঘর থেকে চুরি হয়। যার সঠিক কিনারা এখনও পর্যন্ত করতে ব্যর্থ তদন্তকারী সংস্থা৷ অবশেষে রবি ঠাকুরের সার্ধজন্মশতবার্ষিকীতে নোবেল ফাউন্ডেশন তাঁর নামে একটি নতুন পদক ইস্যু করে।

(৩) অবসর সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিমালয়ে কাটাতে ভালোবাসতেন। তাঁর হিমালয়ে ভ্রমণের সূত্র মেয়ে রেনুকা। রেনুকা টিবি বা যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকরা তাঁকে বিশুদ্ধ বাতাসের কোনও জায়গায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তখন রবীন্দ্রনাথ মেয়ে রেনুকাকে নিয়ে ১৯০৩ সালে হিমালয়ের রামগড় যাত্রা করেন। সেখানে থাকাকালীন কবিগুরু ‘শিশু’ শিরোনামের কবিতা সংকলনের জন্য কবিতা লেখেন। রেনুকার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়লে তিনি আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯১৪ সালে রেনুকা মারা গেলে তিনি পুণরায় রামগড়ে পাড়ি জমান। আর এখানে বসেই তিনি ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের কিছু অংশ রচনা করেন। আর এই কাব্যগ্রন্থের জন্যই তিনি নোবেল পেয়েছিলেন। রামগড়ের যেজায়গায় তিনি থাকতেন, সেই জায়গা এখন ‘টেগোর টপ’ বা ‘ঠাকুর চূড়া’ নামেই পরিচিত।

(৪) ১৩ ভাই-বোনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সবার ছোট। তিনি স্কুল বা প্রথাগত শিক্ষা এড়িয়ে চলতে চাইতেন। তাই তাঁর পড়াশোনার দায়িত্ব নেন বড় ভাই হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি রবীন্দ্রনাথকে জুডো, জিমন্যাস্টিক এবং কুস্তিও শেখাতেন। এবং রবি ঠাকুর এক্ষেত্রে যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন বলেই জানা যায়৷ প্রথাগত শিক্ষার প্রতি উদাসীন রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনে মাত্র একদিন কলেজে গিয়েছিলেন। সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই আজ বাঙালির গর্বের শিক্ষাবিদ৷

(৫) মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৮৭৭ সালে ১৬ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এই বয়স থেকেই তিনি স্বনামে ছোট গল্প এবং নাটক লেখা শুরু করেন।

(৬) রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যে প্রথমবারের মতো আধ্যাত্মিক চেতনা এবং প্রেমের মিলন ঘটান। সেইসব রচনার উদ্দেশ্য ছিল, আত্মার শান্তি এবং পরকালীন মুক্তি। তাঁর রচনা উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের রচনার প্রভাব ছিল।

(৭) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই একমাত্র কবি, যিনি তিনটি দেশের জাতীয় সংগীত লেখার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। তাঁর ‘জন গণ মন’ শিরোনামের গানটি ভারতের, ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বাংলাদেশ জাতীয় সঙ্গীত৷ শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীতেও রবীন্দ্রনাথের সুর রয়েছে৷ তবে বিষয়টি বিতর্কিত৷

(৮) রবীন্দ্রনাথ ভ্রমণ পিপাসু ছিলেন। বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন জাতির সামাজিক-রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে জানার কৌতূহল ছিল তাঁর। ‘ডিসকোভারি অব ইন্ডিয়া’ বইয়ে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু কবিগুরু সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘তিনি ছিলেন ভারতের আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। যিনি আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করায় বিশ্বাসী ছিলেন। যিনি ভারতবর্ষের বার্তা সারা বিশ্বে এবং বিশ্বের বার্তা ভারতবাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

(৯) ৬০ বছর বয়সে এসে তিনি রবি ঠাকুর ছবি আঁকায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর আঁকা ছবিতে নিউ আয়ারল্যান্ডের প্রভাব লক্ষ করা যায়।

(১০) রবীন্দ্রনাথের জন্ম জয়ন্তীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিদেশেও বিশেষভাবে উদযাপিত হয় রবীন্দ্র জয়ন্তী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here