নিজস্ব প্রতিবেদক, দার্জিলিং: পাহাড়ের রাজনীতি কি বদলাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে অবশ্যই চোখ রাখতে হবে সামনের লোকসভা নির্বাচণের দিকে। কারন শাসকের বিরুদ্ধে ১৬দলের জোট। আর সেই জোটের তরফে চেষ্টা হচ্ছে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের জন্য একজন প্রার্থীকেই দাঁড় করানো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে শাসক বলতে ঠিক কাকে বোঝানো হচ্ছে, তৃণমূল না মোর্চা? তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের শাসক দল হলেও পাহাড়ের ক্ষমতার অলিন্দে এখনও তারা সেভাবে আসতে পারেনি। কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে ছড়ি ঘুড়িয়েছে পাহাড়ের দলগুলিই। তা সে সুবাস ঘিসিংয়ের জিএনএলএফ হোক কি বিমল গুরুং-রোশন গিরির গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। কিন্তু কি ঘিসিং জমানা হোক কি গুরুং জামানা, পাহাড়ের মানুষজন কিন্তু খুব একটা উন্নয়ন বা লাভের মুখ দেখতে পায়নি। পৃথক রাজ্যের দাবিতে পাহাড়ের বুকে যে আন্দোলন, বনধ, খুনোখুনি হয়েছে তাতে সামগ্রিক ভাবে পাহাড়ের আর্থসামাজিক পরিকাঠামোর ক্ষতিসাধনই হয়েছে, তথাকথিত পাহাড়বাসীর কোন উপকার সাধন ঘটেনি।

সুবাস ঘিসিংয়ের আমলেও জিএনএলএফ কোনদিন লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী দিত না। ঘিসিং খালি জানিয়ে দিতেন ভোটটা কাকে দিতে হবে নাকি ভোট বয়কট করতে হবে। পাহাড়বাসী কিন্তু বিনা প্রশ্নে সেই নির্দেশ বছরের পর বছর মেনে এসেছে। মোর্চার আমলেও তার খুব একটা বদল ঘটেনি। গুরুং ভোট বয়কটের ডাক না দিলেও লোকসভা নির্বাচনে মোর্চার প্রার্থী দেননি। দু দুটি লোকসভা নির্বাচণে তার সমর্থন ছিল গেরুয়া শিবিরের দিকেই। মোর্চার সেই সমর্থনে জয়ী হয়েছেন বিজেপি প্রার্থীরা। কিন্তু এখন গুরুং ফেরার, নিখোঁজ রোশন গিরিও। জিটিএ চালাচ্ছেন গুরুং বিরোধী মোর্চা নেতা বিনয় তামাং ও অনিল থাপা। তবে ঘিসিং বা গুরুং তাদের জমানায় যে আধিপত্য দেখিয়ে গিয়েছেন সেই রকম আধিপত্যবাদ কিন্তু ভোগ করতে পারছেন না বিনয়-অনিল জুটি। কার্যত পাহাড়ের ক্ষমতায় টিকে থাকতে তার ভরসা রাজ্য সরকারের সমর্থন। বলতে দ্বিধা নেই বিনয় তামাংয়ের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুসম্পর্ক পাহাড়ের বুকে যেমন উন্নয়নের জোয়ার নিয়ে এসেছে তেমনি আর্থসামাজিক ক্ষেত্রেও পাহাড়বাসীর মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তার জেরে পাহাড়ের বুকেও সমতলেও দল হলেও জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়ছে তৃণমূল কংগ্রেস। বস্তুত মোর্চা আর তৃণমূলই এখন পাহাড়ের দুই প্রধান শক্তি।

বিনয় তামাং চেয়েছিলেন পাহাড়ের কোন ভূমিপুত্র নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়াক লোকসভা নির্বাচনে দার্জিলিং লোকসভা আসন থেকে। তাকে সমর্থন করুক তৃণমূলও। কিন্তু বিনয়ের এই সুত্র মানতে নারাজ তৃণমূল। তারা সরাসরি নিজেদের দলীয় প্রতীকেই দলীয় প্রার্থী দাঁড় করাবে বলে জানিয়ে দিয়েছে। বিনয় তামাং মোর্চার বর্তমান সভাপতি হলেও পাহাড়ে এখনও কিছু গুরুং অনুগামীরা রয়ে গিয়েছেন। সময় সময় তারা পাহাড়ে নানা পোস্টার যেমন লাগায় তেমনি সুকৌশলে গুরুং না গিরির ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পাহাড়ে ছড়িয়েও দেয়। বিনয় তামাংয়ের তাই ক্ষমতায় টিকে থাকতে ও উন্নয়ন করে দেখাতে তৃণমূলের সমর্থন একান্তই প্রয়োজন। তাই তৃণমূল প্রার্থী দিলেও তা নিয়ে উচ্চবাক্য করতে পারছেন বা বিনয়। তৃণমূলের প্রার্থীকেই সমর্থন দেওয়ার কথা আজ না হোক কাল তাকে ঘোষণা করতেই হবে। ঠিক এই রকম অবস্থায় পাহাড়ের ১৬টি দল সর্বসম্মত ভাবে একজন নির্দল প্রার্থী দাঁড় করাতে চাইছে বিনয়ের প্রভাব খাটো করতে। আগামি ১৫ মার্চ তারা এ বিষয়ে প্রার্থীর নামও ঘোষণা করবে বলে জানিয়েছে। যদিও এই জোট নিয়ে চিন্তিত নয় জোড়াফুল শিবির।

এর কারন হিসাবে তাদের অভিমত, যে ১৬টি দল জোট করেছে তারা কারা? জিএনএলএফ, সিপিআরএম, সিপিআইএম, কংগ্রেস, জন আন্দোলন পার্টি, গোর্খা লিগ প্রমুখ। এদের মধ্যে জিএনএলএফ ব্যাতীত কোন দলেরই পাহাড়ের ক্ষমতায় আসার সৌভাগ্য হয়নি। ঘিসিং উত্তর জামানায় জিএনএলএফেরও আর সেই আগের মত প্রভাব নেই। তাই এই ১৬টি দলের নেতারা একমত হয়েও যদি কোন প্রার্থী দাঁড় করায় তাহলেও তা দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে থাকা পাহাড়ের ৩টি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ১ লক্ষও ভোট পাবে কিনা সন্দেহ। তার ওপর বিজেপি আলাদা করে প্রার্থী দেবে। মোর্চার বিনয়পন্থী নন এমন ভোটাররা বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দিলেও দিতে পারে। কিন্তু সেটা খুবই কম। তৃণমূল হাসতে হাসতে পাহাড়ের তিনটি বিধানসভা আসন থেকে খুব কম করে হলেও আড়াই লাখ ভোট পাবে। সেই কারণে কটা দল জোট গড়ল, কে তাদের প্রার্থী হল তা নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নয় জোড়াফুল শিবির। উল্লেখ্য ১৬টি দল যখন এই জোট গড়তে তৎপর ঠিক তখনই সিপিআরএম দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রে প্রাক্তন সাংসদ আর বি রাইয়ের নাম ঘোষণা করে দিয়েছে। তাতে জোটের অন্যদলগুলি বেশ ক্ষুব্ধও হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here