ঋদ্ধীশ দত্ত: ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষামূলক কার্টুন ছবিতে একটা দৃশ্য কমবেশি অনেকেই দেখেছি আমরা। স্মৃতির ওজন অনেকটা ভারী হয়ে গেলেও মনে করতে খুব একটা কসরৎ হবে না। ছবিটা অনেকটা ছিল এরকম; এক ব্যক্তি নিজের ছেলেকে একটা করে বাঁশের সরু ছড়ি বা কাঠি রকমের কিছু হাতে দিয়ে ভাঙতে বলছেন। ছেলেটি সামান্য শক্তি লাগিয়েই তা ভেঙে ফেলছে। কিন্তু একসঙ্গে যখন অনেকগুলি ছড়ি বেঁধে তা ভাঙতে বলছেন, তখন সহজে ভাঙতে পারছে না সে। উপসংহার বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। বৃহস্পতিবার ১৫টি লোকসভা ও বিধানসভার উপনির্বাচনের ফলাফলের দেখার পর শৈশবের সেই ছবিটাই বারবার ভেসে উঠছিল চোখের সামনে। কারণ ২০১৯ সাধারণ লোকসভা নির্বাচনেও এই ছবিটাই দেখতে চলেছে ভারতের আম আদমি।

হয়তো এই ছবিটা দেখতে হতো না, যদি না আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নাম হতো নরেন্দ্র দামোদর মোদী। সংসদীয় রাজনীতিতে প্রাপ্তবয়স্ক না হলেও, ভারতীয় রাজনীতির আগা ও মাথা দুইই যে তিনি গুলে আকণ্ঠ পান করেছেন, সেই সম্পর্কে দ্বিমতের অবকাশ নেই। জনপ্রিয়তা, ভোট রাজনীতি, আবেগে সুড়সুড়ি ও জ্বালাময়ী ভাষণ। প্রত্যেকটি সিলেবাসে তাঁকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা বর্তমান ভারতীয় রাজনীতিতে আর কোনও দ্বিতীয় পুরুষের নেই। সমস্ত কিছু সত্ত্বেও উপনির্বাচনে নিজের গড়েই ধাক্কা খাচ্ছে বিজেপি। কিন্তু একই মুদ্রার অন্য পিঠে, প্রায় একার হাতেই কর্ণাটক জয়ও নিশ্চিত করেই ফেলেছিলেন নমো। তাহলে উপনির্বাচনে হলো টা কী?

অবশ্যই কোনও রকেট সাইন্স কাজ করেনি বিরোধীদের এই জয়ের নেপথ্যে। কাজ করেছে সব সরু কঞ্চিদের (পড়ুন আঞ্চলিক দল) একজোট হওয়া। আর একজোট হওয়ার মহিমা এমনই, যে মোদী-শাহের ধুরন্ধর মগজও ভেদ করে উঠতে পারেনি এই চক্রব্যূহ।

২০১৪ সালে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও, লোকসভার আসন সংখ্যা কমতে কমতে ম্যাজিক ফিগার ২৭২-এর নীচে নেমেছে তা। ফলে সরকার উল্টে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি না হলেও, প্রশ্নের পর প্রশ্ন যে ধেয়ে আসবে তা অবশ্যম্ভাবী। এই উপনির্বাচন কি ২০১৯-এ মোদীর পতনের পথ প্রশস্ত করলো? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বসে তখনই শৈশবের ছবিটার কথাই প্রথম মনে আসে।

মোদী জমানায় এনডিএ সরকারের ভোট ম্যানেজার অমিত শাহের ‘চাণক্য নীতি’ যে অপরাজেয় না, তা প্রমাণের জন্য উপনির্বাচনে জয়ের ফলাফলই যথেষ্ট। এই উপনির্বাচনের ফলাফলই বিরোধীদের মনেও এই বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে যে, মোদীর তুলনায় তারা চুনোপুঁটি হলেও, সবাই একসুতোয় নিজেদের বাঁধলে জয় সম্ভব। কর্ণাটকের পর কংগ্রেসও যেমন আঞ্চলিক দলের ক্ষমতা টের পেয়েছে। তেমনই ৩১শে মে’র পর মোদী-শাহকেও নতুন করে নীল নকশা আঁকতে বসতে হবে। কারণ, একের বিরুদ্ধে এক ফর্মুলায় হারের এই কাঁটায় বিদ্ধ হয়ে অল্প হলেও রক্তক্ষরণ হয়েছে যে।

ফলে বিশেষ হিসেব নিকেশ যে ছাড়াই সমীকরণ দাঁড়াচ্ছে তা হল; সকল বিজেপি বিরোধী জোট বনাম নরেন্দ্র মোদী। টুকরো টুকরো আঞ্চলিক শক্তিগুলি যদি নিজেদের মতানৈক্য এবং বিভেদ শিকেয় তুলে কেবল মোদী বিরোধিতার এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নামতে পারে, তবেই থামানো সম্ভব হবে এই অশ্বমেধের ঘোড়া। শেষমেশ যদি তাই হয়, তবে ২০১৯ সালে স্বাধীন গণতন্ত্রের বৃহত্তম যুদ্ধ দেখবে ভারত। এমন এক যুদ্ধ যা আগে কখনও দেখা যায়নি। এই যুদ্ধে একদিকে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অপরপ্রান্তে যারা থাকবেন তাদের নামের তালিকা লেখা শুরু করলে শেষ হতে অনেক সময় লাগবে।

একের বিরুদ্ধে সকলের এই লড়াই অবশ্য আগেও দেখা গিয়েছিল। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর শাসনকালে জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পরবর্তী সময়ে। কিন্তু তখন জরুরি অবস্থাকে ঘিরে জনরোষও ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজনীতির বিরোধী শক্তিগুলি সেই ফায়দা তুলতে একটুও সময় লাগায় নি। তবে এই যুদ্ধ বৃহত্তম কেন? কারণ এর আগে সোশ্যাল নেটওর্য়াক নামক হাতিয়ারটি ছিল না। তখন যুদ্ধ দেখা গিয়েছিল কেবল ব্যালট বাক্সে। ভাষণ শোনা গিয়েছিল কেবল রাজনীতির সুবিশাল স্তম্ভদের। কিন্তু এবারের লড়াই শুধু ইভিএম বুথে বা নেতাদের ভাষণে আটকে রইবে না। কোনও এক বিশেষ কোম্পানির কৃপায় ডেটাগিরির যে সিংহদুয়ার দেশে খুলে গিয়েছে, তার ফলে এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কের জালে আটকে থাকা প্রতিটি ব্যক্তি এই নির্বাচনে অংশ নেবেন। শুধুমাত্র ভোট দিয়ে নয়। নিজেদের স্বাধীন মতামতের বেলুন আকাশে উড়িয়ে হোক, বা কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দলের আইটি সেলের কাজ করে (নিজের অজ্ঞাতেই)। তাই ২০১৯-এর যুদ্ধকে স্বাধীন গণতন্ত্রের বৃহত্তম যুদ্ধ বললে মনে হয়না খুব একটা ভুল হবে বলে।

গণতান্ত্রিক এই মহাযুদ্ধে শেষ হাসি কে হাসে তা অবশ্যই সময় বলবে। কিন্তু বেলাশেষে মনে রাখতে হবে, যার বিরুদ্ধে সকলের লড়াই সেই লোকটির নাম নরেন্দ্র দামোদর মোদী। স্লগ ওভারে ব্যাট করতে নেমে চোখের নিমেষেই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারেন যেই ব্যক্তি। প্রতিপক্ষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাশ নিজের হাতে নিয়ে নেন। অনেকটা ক্রিকেটের প্রাক্তন অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো। পার্থক্যটা কেবল দু’জনের খেলার ময়দান এবং ‘মানসিকতায়’।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here