Lexie Alford

মহানগর ওয়েব ডেস্ক: ‘মনে বিশ্বাস রাখুন, দেখবেন সব কিছু করা সম্ভব।’ এই মন্ত্রবলেই দুনিয়া জয় করে ফেলেছেন একুশ বছরের তরুণী। সবচেয়ে কমবয়সী হিসেবে ইতিমধ্যে ঘুরে ফেলেছেন বিশ্বের ১৯৬টি দেশ। বিরল কৃতিত্বের অধিকারিণী এই মার্কিন তরুণীর নাম লেক্সি অ্যালফোর্ড। সাকিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায়। তিনি স্বদেশীয় কাসান্দ্রা দে-পেকোলের ২৪ বছর বয়সে গড়া রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। পর্যটক-লেখিকা-সমাজকর্মী কাসান্দ্রা মহিলা হিসেবে প্রথম বিশ্বের সব দেশ ভ্রমণ করে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নিজের নাম লিখিয়েছিলেন।

Lexie Alfordগত ৩১ মে লেক্সি পা রাখেন উত্তর কোরিয়ায়। সেই সঙ্গে পৃথিবীর সব ক’টি দেশে ঘোরার রেকর্ডের দাবিদার হয়েছেন তিনি। এতদিন এই রেকর্ডের মালকিন ছিলেন কাসান্দ্রা। যদিও প্রথম মহিলা হিসেবে বিশ্বের সব দেশে ঘোরা কাসান্দ্রার কৃতিত্বকে অনেকে খাটো করতে চেষ্টা করেছেন এই বলে যে, তিনি নাকি গভীর ভাবে ঘুরে দেখেননি প্রতিটি দেশ। প্রায় একই রকম উক্তি অনেকে করেছেন নয়া রেকর্ডের অধিকারিণী লেক্সির ক্ষেত্রেও। যদিও সেই সমালোচনাকে বিশেষ পাত্তা দিতে রাজি নন লেক্সি অ্যালফোর্ড। ‘আমরা সবাই আলাদা আলাদা ভাবে ঘুরতে ভালবাসি। অনেকে একজায়গাতেই মাস বা বছর কাটাতে চান অল্প কয়েকটি দেশে। আবার অনেকে বিশ্বের প্রতিটি কোনাই ছুঁয়ে দেখতে চান। যেটাই করুন না কেন, কেউ না কেউ আপনার খুঁত ধরবেন।’

Lexie Alfordলেক্সি অ্যালফ্রেডের এই বিশ্বভ্রমণের শুরু শৈশবেই। তাঁর পরিবারের একটি ট্র‌্যাভেল এজেন্সি রয়েছে। ‘জ্ঞান হওয়া ইস্তক ভ্রমণ আমার জীবনের সঙ্গী’, বলেছেন লেক্সি। @LexieLimitless নামে ইনস্টাগ্রামে তাঁর একটি প্রোফাইল রয়েছে। সেখানেই তিনি জানিয়েছেন, ‘আমার অভিভাবকরা ছোট থেকেই আমাকে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছেন। তখন বছরে একবার তাঁরা আমাকে কয়েক সপ্তাহ বা মাসের জন্য স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আলাদা করে পড়ানোর বন্দোবস্ত করতেন।’ বড় হওয়ার পরও সেই ধারায় ছেদ পড়েনি। লেক্সির বয়ান, ‘আমার মা-বাবা আমাকে এভাবেই তৈরি করেছেন। আমার ইচ্ছে-পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে পৃথিবীর সর্বত্র জীবনের যে প্রকাশ, তা দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমি বরাবরই কৌতূহলী হয়ে অন্য দেশের মানুষের জীবনযাপন প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছি। জানতে চেয়েছি, কীভাবে তাঁরা সুখের সন্ধান করেন।’

Lexie Alfordবিশ্ব পরিক্রমার সময় লেক্সি আদতে রেকর্ড ভাঙার কথা ভাবেননি। শুধু মনখুলে ঘুরতে চেয়েছেন। ‘সত্যি বলতে কী, আমি শুধু নিজের সীমাটাকে প্রসারিত করতে চেয়েছি। যেটা আমি নিজের জীবনে করতে পারি এবং এই বিশ্বদর্শনের মাধ্যমে যতটা সম্ভব। ব্যাপারটা চ্যালেঞ্জিং না হওয়া পর্যন্ত আমার বোধ হচ্ছিল, এটা আমাকে ঘিরে থাকা মানুষজনদের বিশেষত অল্পবয়সী মেয়েদের অনুপ্রেরণা হতে পারি। তাদের সমর্থন আমাকে আরও সাহস যোগানোয় কঠিন পরিস্থিতিতেও আমি হাল ছেড়ে দিইনি। আমি সবাইকে দেখিয়ে দিতে চেয়েছি, জগতের সব মানুষ ভয়ঙ্কর নন, যতটা মিডিয়া আমাদের সামনে তুলে ধরে দেখায়। বিশ্বের সর্বত্র উদার ও মহৎহৃদয় মানুষের ছড়াছড়ি।’ ২০১৬-র পর লেক্সির মনে হতে থাকে, বিশ্বের ১৯৬টি দেশে ভ্রমণ সেরে ২০১৩-য় ২৪ বছর বয়সে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়া জেমস অ্যাসকুইথের
রেকর্ড ভাঙা সম্ভব।

Lexie Alfordকেমন করে আইডিয়াটা মাথায় এল? সবে ১৮-তে পড়েছেন। সে সময় লেক্সির মনে হল, ইতিমধ্যে ৭২টি দেশ ঘোরা হয়ে গিয়েছে। ‘সেই সময় প্রথম ভাবনাটা মনে এল। ততদিনে আমি স্কুলের গণ্ডি পার করে ফেলেছি। নতুন করে আর শিক্ষাঙ্গনে ফেরার চিন্তা ছেড়ে পুরোপুরি পৃথিবী ঘোরার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।’ এই পর্যটনের খরচ নিজেই যোগাড় করেছেন তিনি। বেশকিছু ব্র‌্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করেন এবং ফান্ডের জন্য প্রচার শুরু করেন। কোনও সরকারি স্পনসর পাননি। ‘আমি জানতাম আমাকে ঘোরার জন্য সময় বের করতে হবে। অনেক অর্থও প্রয়োজন। তাই কাজের ব্যাপারে বাছবিচার করিনি এবং সঞ্চয়ে মনোযোগী হয়েছি। ১২ বছর বয়স থেকে আমি ঘুরতে যাওয়ার জন্য পয়সা জমাচ্ছি।’

Lexie Alfordফোটোগ্রাফি, ব্লগিংয়ের পাশাপাশি নিজেদের পারিবারিক ট্র‌্যাভেল এজেন্সির কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছেন। ‘আমি এই ভ্রমণ নিয়ে রীতিমত পড়াশুনো করেছি। কোনও দেশে যাওয়ার আগে সেখানকার যাতায়াত, থাকাখাওয়া ও ঘোরার ন্যূনতম খরচ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেষ্টা করেছি। যাতে করে আমার বা আমার পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি না হয়, তার জন্য সব আতিশয্য ত্যাগ করেছি।’ বিদেশের ফোনের সিম কার্ড ব্যবহার করিনি। আমার যখন কোনও কিছু জানার প্রয়োজন পড়েছে, আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। ভ্রমণের পুরো সময়টা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। পাকিস্তান বা ভেনেজুয়েলার মত যে দেশগুলির বিপজ্জনক হিসেবে দুর্নাম আছে, সেখানেও মানুষের মধ্যে দেখেছি সহায়তা করার মানসিকতা। সেখানকার অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। কোনও প্রত্যাশা ছাড়াই গিয়েছি। পেয়েছি সীমাহীন আনন্দ।

Lexie Alfordভারতেও ঘুরে গিয়েছেন লেক্সি। পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় অসুবিধায় পড়েছেন ট্রিকি ভিসার কারণে। তাছাড়া পর্যটন পরিকাঠামোর অভাব, ভাষার বাধা এবং সুরক্ষিত ভ্রমণে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় রয়েছে। বিরাট অসুবিধার মুখে পড়তে হয়েছে উত্তর কোরিয়ায় আসতে গিয়ে। মার্কিনিদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেদেশে। পরে সেই সুযোগ পেলেও নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ঘোরার অনুমতি মেলে। ‘রাজনৈতিক কারণে আমি উত্তর কোরিয়া ভালমত ঘুরে দেখতে পারিনি। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে আবারও আসতে চাই এদেশে।’ পরের গন্তব্য কী? আপাতত গিনেসে নাম তোলার জন্য প্রায় ১০ হাজার তথ্য কর্তৃপক্ষকে জমা দিতে হবে। তরুণী ‘বিশ্বজয়ী’ এই সুদীর্ঘ যাত্রার ওপর একটি বই লিখছেন। প্রতিটি দেশ ভ্রমণের সময়কার অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি তাতে ধরা থাকছে। সেই বই লেখা শেষ হলে কিছুদিন বিশ্রাম নেবেন। তার পর ফের বেরিয়ে পড়বেন। পায়ের তলায় সর্ষে যে মেয়ের!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here