নিজস্ব প্রতিবেদক, রানাঘাট: খেলার ছলে কলা বাগানে ঢুকে ওরা পাঁচজনে গাছ পাকা কলা খেয়েছিল বাগানের মালিকের বিনা অনুমতিতে। অপরাধ যদি বলতে হয়ে সেটা শুধু ওইটুকুই। কিন্তু গ্রাম মোড়লদের চোখে পাঁচ কিশোরদের সেই অপরাধ হয়ত বেশি গুরুতরই ছিল। তাই সেই অপরাধের মাসুল চরম অত্যাচার সয়েই গুণতে হল ওই স্কুলছাত্রদের। শাস্তিটা কিছু কম নয়, পাঁচ স্কুল ছাত্রকে বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে উল্টো করে গাছে বেঁধে বেধড়ক মারধর করে মাথার চুল ,ভুরু কেটে দেওয়া হল। তাতেও মন ভরল না সমাজপতিদের। পাঁচ ছাত্রের প্যান্টের ভিতর লাল বিষাক্ত পিঁপড়ে ছেড়ে দিয়ে খেজুর গাছের কাঁটা দিয়েও চলে তাদের দ্বিতীয় পর্বের মারধর। খবর পেয়ে বাড়ির লোকেরা তাদের ছাড়াতে গেলে মোড়লরা পাল্টা নিদান দিলেন, মাথাপিছু ২ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ না দিলে ছাড়া হবে না তাদের। সেই টাকা পাওয়ার আশ্বাস পাওয়ার পর তবেই ছাড়া হয় পাঁচ স্কুলছাত্রকে।

এটা জাতপাত প্রথায় শত বিভক্ত বিহার, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানার ঘটনা নয়। এ ঘটনা আমাদের বাংলার। যে ঘটনার সাক্ষী রইল নদীয়ার রানাঘাট মহকুমার ধানতলা থানার বঙ্কিমনগর গ্রামের বাসিন্দারা। আর স্যোসাল সাইট থেকে সংবাদমাধ্যমের দৌলতে সেই ছবি ঘরে বসে টিভির পর্দায় দেখে শিউরে উঠল গোটা বাংলা। শুধু শিউরে ওঠাই নয়, ধানতলার এই ঘটনা সাম্প্রতিক কালের চরম নির্মমতা ও অমানবিকতার নিদর্শন হয়ে রয়ে গেল। মূল ঘটনাটি ঘটে গত
বুধবার দুপুরে। সেদিন বঙ্কিমনগর এলাকার ৫ স্কুলছাত্র দশম শ্রেণীর বাপি রায়, সাগর বিশ্বাস, লোকেশ বিশ্বাস, নবম শ্রেনীর শুভ চক্রবর্তী এবং ষষ্ঠ শ্রেণীর জয়ন্ত বিশ্বাস তাদের গ্রামের উত্তরপাড়া এলাকায় একটি কলা বাগানে গিয়ে খেলার ছলে গাছ থেকে বেশ কয়েকটি কলা পেড়ে খায়। অভিযোগ, সেই সময় বাগানের মালিক তাদের তাড়া করলে পালিয়ে যায় ওই কিশোররা। এর পর বাড়িতে এসে তারা কলা খাওয়ার কথা বললে তাদের পরিবারের লোকজন গিয়ে কলা বাগানের মালিকের কাছে ক্ষমা চেয়ে বিষয়টি মিটিয়ে আসেন। বাড়ির লোকেরা ভেবেছিল বিষয়টা মিটে গেছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার বেলা গড়াতেই বোঝা গেল কিছুই মেটেনি।

সেদিন দুপুরেই উত্তরপাড়া এলাকার কয়েকজন মাতব্বর মোটরবাইকে চেপে এসে ওই ৫ ছাত্রকে তুলে নিয়ে গিয়ে নিমতলা বলে একটি জায়গায়,গাছের সঙ্গে উল্টো করে বেঁধে মারধর করে। কেটে দেওয়া হয় মাথার চুল আর ভুরু। তাতেও ক্ষান্ত না হয়ে পাঁচ ছাত্রের প্যান্টের ভিতর লাল বিষাক্ত পিঁপড়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর চলে খেজুর গাছের কাঁটা দিয়েও আরেক প্রস্ত মারধর। পরে ওই পাঁচ ছাত্রের পরিবারের লোকেরা সন্ধ্যার সময় তাদের ছাড়াতে গেলে মাতব্বরেরা মাথাপিছু ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে। সেই ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিলে তবেই ৫ ছাত্রকে ছেড়ে দেয় অভিযুক্তরা। ঘটনার পরেই গুরুতর আহত ৫ জনকেই শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে বাপি রায়কে কল্যাণী জওহরলাল নেহেরু মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার জেরে গোটা বঙ্কিমনগর এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ঘটনায় ধানতলা থানায় ওই মাতব্বরদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন আক্রান্ত ছাত্রের পরিবারের লোকেরা। ঘটনার পর থেকেই অবশ্য পলাতক ওই মাতব্বরেরা। তাদের সন্ধান শুরু করেছে পুলিশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here