স্বামী নায়ার: মনে রাখেনি, প্রিয় ক্লাবও মনে রাখেনি

0
79

সমীর গোস্বামী: ইস্টবেঙ্গল মানেই ভারতবর্ষের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্লাব। মোহনবাগানকে যেমন অনেকে জাতীয় ক্লাব হিসেবে মান্য করে, তেমনই ভারতীয় ফুটবলে ইস্টবেঙ্গলের অবদানও কম নয়। তবে সবথেকে বেশি যে ঘটনাটি আজও বহু মানুষের স্মৃতিতে রয়ে গেছে, তা কিন্তু বর্তমান ইস্টবেঙ্গল কর্মকর্তারা হয়তো মনে রাখেননি। সেটা হল ক্লাবের প্রাক্তন খেলোয়াড় স্বামী নায়ার, যিনি শৈলেন মান্নার সঙ্গেই ফুটবল খেলতেন। তিনি আজও কলকাতা ফুটবল লিগে এক মরশুমে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে অমর হয়ে আছেন। তাঁর ৩৬টি গোলের রেকর্ড (১৯৪৬) আজও কেউ ম্লান করতে পারেনি। মেওয়ালাল (এনার গোলেই ভারত এশিয়াডে সোনা পেয়েছিল) এবং আকবর অবশ্য পরে সেই রেকর্ড ভাঙার কাছাকাছি গিয়েছিলেন। আজকে সেই স্বামী নায়ারের কথা কেউ মনে রাখেনি।

আমার মনে আছে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব একবার একটা টুর্নামেন্ট করেছিল। সেই টুর্নামেন্টে অতিথি হিসেবে এসেছিলেন স্বামী নায়ার। তাঁকে সেই সময় কেউ চিনতেই পারেনি। আমি যখন তাঁর আসল পরিচয় দিই, তখন সবাই চমকে তাঁকে দেখেছিল। স্বামী নায়ার ও শৈলেন মান্না একই সঙ্গে এক অফিসে চাকরি করতেন। যেদিন বড় ম্যাচ থাকতো, সেদিন দু’জনে একসঙ্গেই আসতেন। মাঠে ঢোকার আগে শুধু তাঁরা যে যার অংশে চলে যেতেন। সেই সময় তো এক সঙ্গেই দুই ক্লাব ছিল পাশাপাশি। শৈলেন মান্না সেই সময় মোহনবাগানের সেরা খেলোয়াড়। আর স্বামী নায়ার ছিল ইস্টবেঙ্গলের ফরোয়ার্ড। ফলে তাঁরা যখন মাঠে নামতেন, তখন যেন বাঘ-সিংহর লড়াই হতো। স্বামী নায়ারের চেষ্টা থাকতো শৈলেন মান্নাকে টপকে গোল করার, আর শৈলেন মান্নার চেষ্টা থাকতো নায়ারকে আটকানোর।

সেই সময় এই দু’জনের লড়াই এত উপভোগ্য ছিল, দেখা যেন কোনও দল হারলে সেই দলের সমর্থকরা আর বাড়িই ফিরতেন না। মাঠেই রাত কাটাতেন। আবার প্লেয়ারদের ক্ষেত্রে দেখা যেত অন্য ছবি। যদি ইস্টবেঙ্গল জিতত, তাহলে স্বামী নায়ার গিয়ে শৈলেন মান্নাকে মিষ্টি খাওয়াতেন, আবার উল্টোটাও হতো। তাদের মধ্যে এতটাই হৃদ্যতা ছিল। তবে একথা বলতেই হয়, ইস্টবেঙ্গলের ক্ষেত্রেই এই স্পোর্টিং স্পিরিটটা একটু বেশি ছিল।

এই কারণেই বোধ হয় দেশ ও দেশের বাইরে ইস্টবেঙ্গলের জনপ্রিয়তা এতটা বেড়ে গিয়েছিল। এই জনপ্রিয়তার কারণেই জামশেদ নাসিরি, মজিদ বাসকারের মতো খেলোয়াড়রা ইই ক্লাবেই কিন্তু খেলতে এসেছিলেন। অবশ্য একটা সময় মোহনবাগানের নিয়ম ছিল কোনও বিদেশি খেলোয়াড় দলে না নেওয়ার।

স্বামী নায়ার ফুটবল খেলাটা শিখেছিলেন কিন্তু ব্রিটিশদের কাছ থেকে। ছোটবেলায় তিনি গোরাদের খেলা দেখতে যেতেন। মাঠের বাইরে বল চলে গেলে সেটা মেরে আবার মাঠে পাঠাতেন। এই ব্যাপারটা কিন্তু ইংরেজ ফুটবলারদের চোখে পড়ে। তখন তাঁকে ব্রিটিশরা খেলা শেখায়। তাঁর পায়ে কিন্তু দুর্ধর্ষ শট ছিল। এই কারণেই তাঁকে কমপ্লিট ফুটবলার বলা হতো। স্বামী নায়ার কিন্তু খুব গরিব ঘরের ছেলে ছিলেন। পার্ক সার্কাসের মেডিক্যাল কলেজের ঠিক পেছনে বিপি শ্রীরামপুর রোডে ছিল তাঁর বাড়ি।

এই স্বামী নায়ারকেই কিন্তু ইস্টবেঙ্গল ক্লাব মনে রাখেনি। শৈলেন মান্না বা গোষ্ঠ পালরা যে সম্মান পান, সেটা নায়ারেরও প্রাপ্য ছিল। এই বছর ইস্টবেঙ্গলের শতবর্ষ। কিন্তু দেখে খারাপ লাগলো নায়ারকে কেউ মনে রাখেনি। এছাড়া রাম বাহাদুরকেও ক্লাব সেইভাবে মনে রাখেনি। তিনি যে মাপের খেলোয়াড় ছিলেন, তাতে জোর দিয়ে বলতে পারি অন্যদেশে জন্মালে বিশ্বকাপ খেলতেই পারতেন। এছাড়া কাজল মুখার্জি, পিন্টু চৌধুরী (সমরেশ), সুবীর কর্মকার – এরা কিন্তু শুধু ইস্টবেঙ্গল নয়, ভারতীয় ফুটবলের রত্ন। কাজল মুখার্জির মতো এত বড় বল প্লেয়ার আর হয়নি। এরা সকলেই ইস্টবেঙ্গলের ঘরের ছেলে। আমার মনে হয়, বর্তমান ক্লাব কর্তাদের এদের নিয়ে কিছু করা উচিত। এখনকার অনেকেই এদের সম্পর্কে কিছুই জানেন না। ক্লাবের অতীত দিনের এই রত্নদের কৃতিত্বের কথা বর্তমান প্রজন্মকে জানানোর জন্য ক্লাব কর্তারা স্পোর্টস মিউজিয়াম গড়ার ভাবতেই পারেন। এই জন্য প্রশাসনের কাছেও আবেদন করা উচিত। আমাদের রাজ্যে কোনও স্পোর্টস মিউজিয়াম নেই, এটা ভাবতেও খারাপ লাগে। আমি আশা করব দেশের অন্যতম সেরা এই ক্লাব শতবর্ষে নিজের অতীত দিনের সেরা রত্নদের জন্যও কিছু করবে।

** ১৯৪৬ সালে কলকাতা লিগে ১৭ ম্যাচে ৩৬টি গোল করেছিলেন স্বামী নায়ার। করেছিলেন চারটি হ্যাটট্রিক। কাস্টমসের বিরুদ্ধে দুই লেগের ম্যাচেই চারটি করে গোল করেছিলেন।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here