ধারাবাহিক।। হিমালয়ের চেয়েও প্রাচীন বলে ধরা হয় শুশুনিয়া পাহাড়ের বয়স

0
144
shushunia

শিবানন্দ পাল: শুশুনিয়া পাহাড়ের বয়স ধরা হয় হিমালয়ের চেয়েও প্রাচীন… সেই আর্কিয়ান যুগে এর জন্ম। তারপর  ১০০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে এই এলাকায় গড়ে উঠেছিল মানবসভ্যতা। সেই সব মানুষরা ছিলেন দ্রাবিড় গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। দ্বারকেশ্বর নদের উত্তর তীরবর্তী ঘন পাহাড়-জঙ্গলের পরিবেশকে তারা বসবাসের উপযুক্ত স্থান বলে বিবেচনা করেছিলেন। পাহাড়ের ঝর্না এবং পাহাড় সংলগ্ন ঘন বন তৃণভোজী ও মাংসাশী পশুদের বিচরণক্ষেত্র ছিল। জঙ্গল ছিল তাদের আশ্রয়। তাই প্রাচীন প্রস্তরযুগের এবং পরবর্তী মধ্য, শেষ ও নব্য প্রস্তরযুগের মানুষ শুশুনিয়া পাহাড়কে নিজেদের আবাসস্থল হিসাবে নির্দিষ্ট করেছিলেন।

জাতক মতে, গৌতমবুদ্ধ তাঁর পূর্বজন্মে শিবিরাজপুত্র বেসসন্তর রূপে এই পাহাড়ের শীর্ষদেশে একটি গুহায় আশ্রম গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর খুল্লতাত অমৃতোদনশাক্যর পুত্র কৌলীয়রাজ পাণ্ডুশাক্য বিশেষ কারণে কপিলাবস্তু থেকে উৎখাত হয়ে রাঢ়দেশের বন-জঙ্গলে আত্মগোপনে বাধ্য হয়েছিলেন। পরবর্তী কালে পাণ্ডুশাক্য রাঢ়বঙ্গে পাণ্ডুরাজ্য প্রতিষ্ঠা করে হুগলি জেলার পাণ্ডুয়াতে রাজধানী স্থাপন করেন। তাঁর নাম অনুসারে স্থানের নাম হয় পাণ্ডুয়া। তিনিই আবার শুশুনিয়া গিরিশীর্ষে অবস্থিত বেসসন্তরের আশ্রমকে আপৎকালীন অবস্থায় আত্মরক্ষার্থে কোকনদ প্রাসাদে রূপান্তরিত করেন। কারণ তাঁর ভয় ছিল, কপিলাবস্তুর বন্ধুরা হয়তো একদিন তাঁর ছদ্মপরিচয় জানতে পেরে যাবেন। শুশুনিয়া পাহাড়ে বেসসন্তরের আশ্রম ছিল। বৌদ্ধজাতকে শিবিদেশের রাজপুত্র বেসসান্তরের কথা বলা হয়েছে। কপিলাবস্তুর শাক্যদের কাছে গৌতমবুদ্ধ তাঁর পূর্বজন্মে শিবিরাজপুত্র বেসসন্তরের নামে জন্মগ্রহণের কাহিনি বিবৃত করেছিলেন। ইতিহাসবিদ ড. অতুল সুর বাঁকুড়া জেলার শুশুনিয়া পাহাড়ে শিবিরাজপুত্র বেসসন্তর আশ্রম ছিল স্বীকার করেছেন। (পড়ুন চতুর্থ পর্ব)

খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ সময়ে হিমালয়ের তরাই অঞ্চলে প্রবাহিত রোহিণী নদীর দুই তীরে শাক্য ও কৌলীয় রাজ্যের অবস্থান ছিল। রোহিণী নদী দুই রাজ্যকেই সমৃদ্ধ করেছিল। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ বা ভারত-পাকিস্তান বা ভারত-চিন বা ভারতের মধ্যে দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে যেমন নদীর জল নিয়ে চরম বিবাদ হয়, তেমনি শাক্য ও কৌলীয় রাজ্যের মধ্যে বিবাদ ছিল। গৌতমবুদ্ধ নদীর এই জল নিয়ে বিবাদের মীমাংসা করতে চেয়েছিলেন। কারণ একদিকে শাক্যরাজা শুদ্ধোধন যেমন ছিলেন তাঁর পিতা, অন্যদিকে কৌলীয়রাজ পাণ্ডুশাক্য ছিলেন তাঁর খুল্লতাত অমৃতোদনশাক্যর পুত্র। এছাড়া নদীর একদিকে ছিল বুদ্ধের অন্যতম প্রিয় শিষ্য আনন্দের পিতৃবংশ আর তার অন্যদিকে মাতৃবংশ। ইতিমধ্যে শাক্যবংশ ধ্বংস করার ঘটনায় রাজা বিড়ঢ়ভ যুক্ত হয়ে পড়েন। বুদ্ধ শাক্যদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানতে পারেন, রোহিণী নদীতে বিষ দেওয়া হয়। তার‌ই ফল শাক্যবংশ ধ্বংস। এই কারণে পাণ্ডুশাক্যকে কপিলাবস্তু ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। পাণ্ডুশাক্য রাঢ়দেশের পাহাড়-জঙ্গলে আত্মগোপন করতে নেমে আসেন। এজন্য অনেক ঐতিহাসিকের অনুমান, পাণ্ডুশাক্য পরবর্তীকালে পাণ্ডু রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে হুগলি জেলার পাণ্ডুয়াতে রাজধানী স্থাপন করেন। তিনিই শুশুনিয়া গিরিশীর্ষে অবস্থিত বেসসন্তরের আশ্রমকে কোকনদ প্রাসাদে রূপান্তরিত করেছিলেন।

রোহিণী নদীর বর্তমান অবস্থান উত্তর-ভারতের দিল্লি সংলগ্ন অঞ্চল। অবশ্য নদী এখন নালায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তার নাম ‘কোহন নদী’। বিষপ্রয়োগের ঘটনার পর এই নদী ‘খুনি নদী’ নামে পরিচিত হয়। এখন‌ও লোকে ওই নদীকে ‘খুনি নদী’ বলেই ডাকে। অবশ্য এমনিতেই এই নদীর অবস্থা বিপজ্জনক। দিল্লি সংলগ্ন অঞ্চলের দুনিয়ার বর্জ্য পদার্থ তার উপর নিক্ষিপ্ত হয়ে হয়ে, প্রতিদিন তার গয়াপ্রাপ্তি ঘটছে। পরিবেশবিদ বা নদী সংরক্ষণ নিয়ে যাঁরা ভাবিত, এই নদী তাঁদের বিবেচনাধীন নয়। তাই সে পঞ্চত্বপ্রাপ্তির দিকেই এগিয়ে চলেছে।

shushuniaশুশুনিয়া পাহাড়ের গুহাকে পরবর্তীকালে সমুদ্রগুপ্তের প্রতিপক্ষ পুষ্করণাধিপতি চন্দ্রবর্মা চক্রস্বামী বা বিষ্ণুর মন্দির হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। দুর্গ গড়ে তোলাও অসম্ভব কিছু নয়। স্থান এবং পরিবেশ সেই কথাই বলে। বাঁকুড়ার এক লেখক শ্যামসুন্দর দে সুহ্মভূম, বরাহমিহিরের বৃহত্সংহিতা-র উল্লেখ করে তাঁর বইয়ে লিখেছেন, চতুর্থ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে সুদূর রাজপুতনার পোখরান থেকে আর্যসভ্যতাপুষ্ট এবং স্থিতিদেবতা চতুর্ভূজ চক্রধারীর উপাসক রাজা সিংহবর্মা এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র মহাপরাক্রমশালী মহারাজা চন্দবর্মা সৈন্যসামন্ত নিয়ে ভারতবিজয়ের লক্ষ্যে এখানে এসেছিলেন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে তাঁরা উপস্থিত হন বনবাদাড় ঘেরা আদিবাসী, কুতরা, মনসার সেবক তেঁতুলে বাগদি অধ্যুষিত শুশুনিয়া পাহাড়ের পাদদেশে। এখানে উভয়পক্ষে ভীষণ যুদ্ধ হয়। সারা সুহ্মভূমের আদি রাজারা একজোট হয়ে যুদ্ধ করেও মহারাজা চন্দ্রবর্মা-র কাছে পরাজিত হন। জয়লাভ করে চন্দ্রবর্মা শুশুনিয়া পাহাড়ের মাথায় শিলালিপি উৎকীর্ণ করেন।

খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর এই ঘটনার সাক্ষ্য দেয় আজকের পোখান্না– পুষ্কর্ণা গ্রাম। শুশুনিয়া থেকে যার দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। শুশুনিয়া পাহাড়ের মাথায় চন্দ্রবর্মা-র শিলালিপি থেকে জানা গেল, রাজা চন্দ্রবর্মণের রাজধানী ছিল দামোদর নদের দক্ষিণ তীরবর্তী বাঁকুড়া জেলার পোখরন, পোখরনা, পুষ্করণ বা পুষ্করণা গ্রাম। চন্দ্রবর্মা বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন। লিপিতে খোদিত চক্র জানান দেয় চক্রটি বিষ্ণুর প্রতীক। রাজা চন্দ্রবর্মণ বিষ্ণুর উপাসনার জন্য ‘ধোসাগ্রাম’ দান করেছেন। এসব থেকেই ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেছেন, চন্দ্রবর্মণ দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার একজন স্থানীয় শাসক ছিলেন। ঐতিহাসিকদের আরও অনুমান, চন্দ্রবর্মার রাজত্ব বাঁকুড়া থেকে অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ফরিদপুরের কোটালিপাড়ায় চন্দ্রবর্মকোট নামে যে দুর্গ পাওয়া গিয়েছে, সেটি তাঁর নামেই স্থাপিত।

বাংলাদেশের উইকিপিডিয়ায় জেসমিন সুলতানা লিখেছেন, কোটালিপাড়া প্রাচীন স্বাধীন বঙ্গ রাজ্যের একটি দুর্গ নগর; চন্দ্রবর্মণকোট নামেও এর পরিচিতি ছিল। বর্তমান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলা শহরের ২৮ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে ঘাগর নদীর তীরে অবস্থিত এ দুর্গ নগর সমাচারদেবের ঘুঘ্রাহাটি গ্রামে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে উল্লিখিত হয়েছে চন্দ্রবর্মণকোট নামে। জেমস ওয়াইজ কোটালিপাড়াকে গ্রিক বিবরণীর গঙ্গারিদাই রাষ্ট্রের রাজধানী বলে মনে করেছিলেন। তবে স্বাধীন বঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে এর সম্পৃক্ততা অধিক যুক্তিসঙ্গত। সাত শতকে দক্ষিণবঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গের একাংশ এবং পূর্ববঙ্গ নিয়ে স্বাধীন ও পরাক্রমশালী বঙ্গ রাজ্যের উদ্ভব ঘটেছিল।

কোটালিপাড়ায় প্রাপ্ত পাঁচটি এবং বর্ধমান অঞ্চলে আবিষ্কৃত একটি সহ মোট ছয়টি তাম্রশাসন-এ পরবর্তীকালের তিনজন স্বাধীন রাজার নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন  গোপচন্দ্র (আনু. ৫৪০ খ্রি.), ধর্মাদিত্য (আনু. ৫৭০ খ্রি.) এবং  সমাচারদেব (ছয় শতকের শেষভাগ)। আবিষ্কৃত তাম্রফলকগুলি এবং কুরপালা গ্রামে প্রাপ্ত কয়েকটি স্বর্ণমুদ্রা হতে জানা যায় যে, এঁরা সকলেই মহারাজাধিরাজ, নৃপাধিরাজ, অধিমহারাজ ইত্যাদি উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। কোটালিপাড়া এই রাজাদেরই শাসনকেন্দ্র ছিল। বর্তমানে কোটালিপাড়া দুর্গ প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। জানা যায়, বিস্মৃতপ্রায় চন্দ্রবর্মণকোট অতীতে দু’টি অংশে বিভক্ত ছিল; প্রথমটি মূল দুর্গনগর এবং দ্বিতীয়টি উপনগর। মূল দুর্গটি আয়তাকারে নির্মিত এবং এটি প্রায় ১৭.৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এটি দৈর্ঘ্যে ছিল প্রায় ৪.৭৫ কিমি এবং প্রস্থে ৪ কিমি। দুর্গের বাইরের প্রাচীর ঘিরে যে কৃত্রিম প্রতিরক্ষা পরিখা ছিল, তা আজও দৃশ্যমান। চন্দ্রবর্মণকোটের উপনগরটি খুব সম্ভব দুর্গনগরীর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ঘাগর নদীর তীর-ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল। এ অঞ্চলে গুগ্রাহটি, কুরপালা, গুয়াখোলা এবং মাঝবাড়ি নামক গ্রামগুলি থেকে উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। অধুনা বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলাধীন কোটালিপাড়া অঞ্চলকে ছয় শতকের একাধিক তাম্রশাসনে ‘নব্যাবকাশিকা’ (নবসৃষ্টভূমি) বলে অভিহিত করা হয়েছে। ছয় শতকে এ ‘নব্যাবকাশিকা’ সমৃদ্ধ জনপদ এবং নৌবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল বলে মনে করা হয়।

গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (আনু. ৩৮০ খ্রি.) এবং স্কন্ধ গুপ্তের (আনু. ৪৫৫-৪৬৭) কতকগুলি স্বর্ণমুদ্রা কোটালিপাড়ার গুয়াখোলা গ্রামের সোনাকান্দি মাঠে ১৯০৮ সালে ভূমি জরিপের সময় পাওয়া যায়। কোটালিপাড়ায় কৃষিকাজের অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায় এবং এটি ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল বলে অনুমিত হয়। কোটালিপাড়ায় প্রাপ্ত ছয় শতকের দু’টি তাম্রশাসনে নৌদণ্ডক, নবাতক্ষেণী, নৌযান, নৌঘাট প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার এখানে নৌবাণিজ্যের একটি কেন্দ্র ছিল, এরই ইঙ্গিত মেলে। স্থানীয়ভাবে এখানে নৌ-ব্যবসায়ী শ্রেণির প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায় এখনও। এছাড়া কোটালিপাড়ায় একটি সূর্যমূর্তি-ও পাওয়া গিয়েছে। কিছু কিছু প্রাচীন সাহিত্যকর্মে এর উল্লেখ‌ দেখা যায়। কোটালিপাড়া তথা চন্দ্রবর্মণকোট সম্পর্কে সকল তথ্য এখনও সম্পূর্ণভাবে উদঘাটন করা যায়নি। তবে প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রী এই অঞ্চলের সুপ্রাচীনতার যে সাক্ষ্য দেয়, তার ফলে নিঃসন্দেহে বলা যায় চন্দ্রবর্মণের সময়ে এই এলাকা গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। (পড়ুন ষষ্ঠ পর্ব)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here