Home Featured রূপকথা কিংবা কমিক নয়, ‘হসপিটালম্যান’ বাস্তবের, অসহায় মানুষের ভরসার এক নাম

রূপকথা কিংবা কমিক নয়, ‘হসপিটালম্যান’ বাস্তবের, অসহায় মানুষের ভরসার এক নাম

0
রূপকথা কিংবা কমিক নয়, ‘হসপিটালম্যান’ বাস্তবের, অসহায় মানুষের ভরসার এক নাম
Parul

নিজস্ব প্রতিবেদন: ডাক্তার আশ্বাস দিয়েছেন। ধীরে ধীরে ভালো হয়ে উঠছে ছেলে। আর হয়তো কয়েক দিনের অপেক্ষা। অনেক দিন ফেরা হয়নি বাড়ি। নিশ্চই প্রচুর ধুলো জমেছে বাড়ির উঠোনে। ঝুল জমেছে দেওয়ালে। সাফ করতে হবে। এরকম আরও কতো কথা ভাবতে ভাবতে হাসপাতালের বাইরে এসে বসল সালেমা বিবি (প্রতীকি নাম)। একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে নিল আকাশের দিকে। স্মরণ করে নিল সর্বশক্তিমানকে। নাহ্, আজকের রাতটা না খেয়ে থাকলেও চলবে। আর ক’টাতো দিন। চালাতে হবে বাকি পয়সাতেই।

গত প্রায় চার সাড়ে চার বছরে এরকম বহু অভিজ্ঞতার সাক্ষী থেকেছেন কালীঘাটের পার্থ কর চৌধুরী। কলকাতার বহু হাসপাতাল ঘুরেছেন। দেখেছেন বহু মানুষকে। রুটির জন্য লড়াই কাকে বলে তা বুঝেছেন ক্রমে। অতিমারি পরিস্থিতির সময়ে হোক কিংবা আগে, শহরের হাসপাতালে তিনি খুঁজে পেয়েছেন কিছু মুখ। যারা অসহায়। হয়তো ইতিমধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন শেষ সম্বলটুকু। দূর কোনও গ্রাম কিংবা অন্য কোথাও তাদের বাড়ি। এই শহরে তারা একলা। চিকিৎসার খরচ যোগাতেই হিমশিম দশা। নিজেদের জন্য আর ভাত, ডালের বন্দোবস্ত করতে পারেন না অনেকে। ৫১ বছরের পার্থবাবু নিজে একবার ভর্তি হয়েছিলেন হাসপাতালে। তখনই দেখেছিলেন ঘরছাড়া এমন বহু মানুষ। যাদের প্রয়োজন একটু সাহায্য।

কোনও কমিক বই বা কার্টুন চরিত্র নয়। কলকাতার ‘হসপিটালম্যান’ রক্ত-মাংসের এক মানুষ। ইনিই পার্থ কর চৌধুরী। সহায়হীন মানুষের পাশে থেকেছেন রাতের পর রাত। এখনও আছেন। আগামী দিনেও তিনি থাকবেন এই তাঁর প্রতিজ্ঞা। আগে পুল-কারের ব্যবসা ছিল। এখন ভরসা বলতে জমানো কিছু টাকা। সহৃদয় অনেককে পাশেও পেয়েছেন তিনি।

“আগে যা ছিল এখনও তাই। ওদের আগেও টাকা পয়সা বলতে কিছু ছিল না। এখনও নেই। অতিমারি খুব বেশি তফাৎ করতে পারেনি।” হাসপাতালের ওই রোগীর পরিজনদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন পার্থবাবু। “শহরের হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য দূর দূরান্ত থেকে আসে মানুষজন। বেশিরভাগই গ্রামের মানুষ। যে পুঁজি নিয়ে তারা শহরে পা রাখে, অচিরেই শেষের কিনারে পৌঁছে যায়।”

কথায় কথায় একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে যায় পার্থ কর চৌধুরীর, “একবার এক পরিবারের সঙ্গে দেখা। রোজকার অভ্যাস মতো আমি হাসপাতালে হাসপাতালে যেতাম খাবার দিতে। একটি ছেলে এসে আমাকে বলে ‘কাকু আমি দেখতাম তুমি ওদের খাবার দিচ্ছ’। আমি আগে তোমার কাছে আসতে পারিনি। পার্থবাবু পরে জানতে পেরেছিলেন, কলকাতায় আসার সময় প্রায় ৭ লক্ষ টাকার পুঁজি ছিল ওই পরিবারের কাছে৷ ক্রমে তা ফুরিয়ে আসছে থাকে। কীভাবে দু’বেলার খাবার জুটবে এক সময় সে বিষয়ে নিশ্চয়তা চলে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ওই ছেলেটি আসে তাঁর কাছে।

চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হসপিটাল, শম্ভুনাথ পণ্ডিত, পিজি ইত্যাদি বহু হাসপাতালেই নিজের পায়ে হেঁটে যান পার্থ। সঙ্গে থাকে খাবারের কিছু প্যাকেট। মূলত রাতের খাবারের বন্দোবস্ত তিনি করেন। শহরের কিছু খাবারের দোকান রেস্তোরাঁ ইত্যাদি বাড়িয়ে দিয়েছিল সাহায্যের হাত। বিক্রি না হওয়া খাবার ফেলে না দিয়ে দোকানিরা তুলে দিতেন পার্থবাবুর হাতে।

অতিমারি, লকডাউনের ফলে বন্ধ থেকেছে বহু দোকান। লোকসানের মুখ দেখেছে ব্যবসায়ীরা। খাবার যোগাড় করতে সমস্যার মধ্যে পড়ে ছিলেন পার্থ। তবু তিনি থামাননি নিজের কাজ। অন্যান্য দিনের মতোই তিনি অতিমারির সময়ে পৌঁছে গিয়েছেন রোগীর পরিজনদের কাছে। চিঁড়ে, মুড়ি ইত্যাদি দিয়েই সাহায্য করেছেন। কালীঘাটের নিজের এলাকায় শুরু করেছেন বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা। ওষুধের যোগানও দেন নিজেই। অনুদানেও আসে অনেকটা। তথাকথিত গরীব মানুষরা যাতে চাল, ডাল থেকে বঞ্চিত না হন সে’জন্য নিজে থেকে শুরু করেছেন রেশনের ব্যবস্থা। চালু করেছেন ‘হসপিটালম্যান কার্ড’। কথোপকথনের শেষে বিনীত কন্ঠে তিনি বললেন, “বিশ্বাস করুন দাদা কারও কাছ থেকে কোনও দিন একটা টাকাও আমি চাইনি।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here