দেবী দুর্গার মধ্যেই হারানো গণেশকে খুঁজে বেড়ান জীবনযুদ্ধে হার না মানা মৃৎশিল্পী অর্পিতা

0
156
kolkata bengali news
নিজস্ব প্রতিবেদক, উঃ দিনাজপুর: সে এক সময় ছিল, গণেশ পালের কাদামাখা হাতের ছোঁয়ায় একে একে রূপ পেত দুর্গা, লক্ষ্মী, কালি, গণেশের মতো দেবদেবীরা। যশ খ্যাতিও ছিল ভালোই। ডাক আসত আশপাশের একাধিক জেলা থেকে। কখনও সখন স্বামী বাড়ি থাকলে পাশে বসে তন্ময় হয়ে মৃৎশিল্পী স্বামীর সেই শিল্পকলা দেখতেন স্ত্রী অর্পিতা দেবী। কখনও বা হাত বাড়িয়ে টুকিটাকি সাহায্যও করে ফেলতেন স্বামীকে। তবে কে জানত স্বামীর অবর্তমানে এই টুকিটাকি সাহায্যই গুরুভার হয়ে দাঁড়িয়ে পড়বে অর্পিতার কাঁধে। একদিকে অর্থের টান, তো অন্যদিকে মৃত স্বামীকে স্মৃতির অন্দরে চিরন্তন বাঁচিয়ে রাখার এক তাগিদ। আর সেই তাগিদ থেকেই সব লোকলজ্জা ভয়কে দূরে ঠেলে দশভুজার মুর্তি গড়ে জীবন যুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জের ‘দশভুজা’ অর্পিতা পাল।
আয়ু হয়ত আর বেশিদিন নেই, আগেই অনুমান করতে পেরেছিলেন গণেশ পাল। এদিকে স্ত্রীর ইচ্ছা দেখে পাশে বসিয়ে মুর্তি গড়ার কাজটা হাতে কলমে শিখিয়ে গিয়েছেন স্ত্রীকে। কিন্তু আজ আর তিনি নেই। তবে গণেশ বাবুর অবর্তমানে তার কারখানার হাল ধরেছেন তার স্ত্রী অর্পিতা পাল। স্বামীর কাছে শেখা বিদ্যে দিয়েই স্বামীর মৃত্যুর পর চারবছর ধরে নিজেই বানিয়ে চলেছেন দশভুজার প্রতিমা। পুজোর মরশুম এলে পূর্ব স্মৃতি মনে পড়ে অর্পিতা দেবীর। ১৯৯৪ সাথে বিয়ে হয় তার। বাপের বাড়ী রায়গঞ্জের সুভাষগঞ্জ পালপাড়ায় হলেও স্বামীর ঘরে এসেই প্রতিমা তৈরীর সাথে যুক্ত হন অর্পিতা দেবী। মৃৎশিল্পী স্বামী গণেশ পালের খ্যাতি ছিল দুই দিনাজপুর জুড়ে। শুধু রায়গঞ্জ নয়, ইসলামপুর, বালুরঘাট, গঙ্গারামপুর, কালিয়াগঞ্জ এমনকি মালদা জেলার বহু দুরপ্রান্ত থেকে মুর্তি গড়ার ডাক আসত। এই বাড়িতে এসে অর্পিতা এসে শুনেছেন, যৌবন কালে দুরদুরান্তে গিয়ে মুর্তি গড়ে আসতেন গণেশবাবু। কিন্তু বছর কুড়ি আগে কুমোড়পাড়া লেনে নিজের বাড়ীতেই কয়েকজন কারিগরদের নিয়ে প্রতিমা তৈরীর কারখানা গড়ে তোলেন তাঁর স্বামী।
তবে সে সুখ চিরস্থায়ী হয়নি। মাত্র কয়েক বছরের দাম্পত্য জীবনের সব আনন্দ শেষ হয়ে যায় ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে। মাত্র ৫৯ বছর বয়সী স্বামী গণেশ পালের দেহাবসানের পর তাদের একমাত্র ছেলে কলকাতায় একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বি-টেক করছে। কিন্তু ছেলের এই পৈতৃক পেশায় তেমন আগ্রহ নেই বলেই জানালেন অর্পিতা দেবী। তবে নিজেকে জীবনযুদ্ধে টিকিয়ে রাখতে আর্থিক সংকট সত্ত্বেও স্বামীর স্মৃতিকে আগলে রেখেছেন অর্পিতা দেবী। এদিন এই প্রসঙ্গে অর্পিতা দেবী বলেন, “উনি চলে গেছেন। কিন্তু আমায় তো শিখিয়ে গেছেন ওনার বিদ্যে। প্রতিমা গড়া ওনার পেশার থেকে নেশায় পরিনত হয়েছিল। তাই মুর্তি বানানো বন্ধ করিনি। যতদিন পারব এভাবেই আমার স্বামীর স্মৃতি ধরে রাখবো।” সেই সঙ্গে তিনি আরো বলেন, “এ কাজে আমি আমার স্বামীকেই খুঁজে পাই। এখনো মনে হয় যেন উনি আমাকে হাত ধরে শিখিয়ে দিচ্ছেন।”
আর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা দিন বাকি। তাই দিনরাত এক করে দেবী দশভুজার মুর্তি তৈরীতে ব্যস্ত অর্পিতা দেবী বলেন, স্বামীর রীতি মেনেই এবারেও বৈশাখ মাস থেকেই দুর্গা প্রতিমা তৈরীর কাজ শুরু করে দিয়েছেন বলে তিনি জানান। তবে ৪৭ বৎসর বয়সী অর্পিতা দেবীর নিজের শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয় বলে ৯টি বড় ও ৩টি ছোট প্রতিমা তৈরীতে এবারেও বেথুয়াডহরী থেকে কারিগর এনেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে স্বামীর স্মৃতিকে ধরে রাখতে এভাবে স্ত্রীর এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শহরের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। অর্পিতা দেবীর হাতে তৈরী মৃন্ময়ী মুর্তিতে চিন্ময়ী দেবী রূপে এবারেও রায়গঞ্জ সহ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে পুজিতা হবেন দশভুজা। এখন জেলার একমাত্র মহিলা মৃৎশিল্পীর হাতের কারুকার্য্য দর্শকদের কাছে কতটা গ্রহনযোগ্য হয় সেটাই দেখার।


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here