ঋদ্ধীশ দত্ত: স্টিফেন কোর্ট হোক, নন্দরাম মার্কেট, বা হাতিবাগান। শহর যখনই আগুনের কবলে পড়েছে, তখনই রক্ষার্থে এগিয়ে এসেছে দমকল। হয়েছে বহু দুর্ঘটনার ‘সেভিয়ার’। ভয়ানক অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে যুঝতে শহরের দমকল বিভাগের অভিজ্ঞতাও কম নয়। তা সত্ত্বেও আগুন নেভানোর কাজে গিয়ে বারংবার বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে এসেছে দমকল। কিন্তু যে পরিকাঠামো বর্তমানে মজুত রয়েছে, বিধ্বংসী আগুন লাগলে তা যে একেবারেই যথেষ্ট নয়, সেই বিষয়টাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বাগরি মার্কেটের অগ্নিকাণ্ড।

স্থানীয় সূত্রে খবর, শনিবার রাত ২:৩০ নাগাদ প্রথম চোখে আসে বাগরি মার্কেটের এই আগুন। প্রতিবেদনটি লেখার সময় আগুন লাগার পর থেকে কেটে গিয়েছে ১২ ঘন্টা। কিন্তু আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার কোনও নাম-গন্ধ দেখা মিলছে না। দমকলের পক্ষ থেকে অবশ্য সকালেই জানিয়ে দেওয়া হয়, পারফিউমের বোতল থেকে ছড়িয়েছিল এই আগুন। তবে বিধ্বংসী এই আগুনে বাগরি মার্কেট পরিণত হয়েছে জতুগৃহে। যেভাবে ক্রমশ আগুন ছড়াচ্ছে তাতে বাগরি মার্কেটও ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। মার্কেটের ভিতরে প্লাস্টিক ও প্রসাধনির দ্রব্য প্রচুর পরিমাণে মজুদ থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হচ্ছে দমকল কর্মীদের। তবে আগুন লাগার ১২ ঘন্টা পরেও তা নিয়ন্ত্রণে কেন আনা গেল না, তা খুঁজতে বসে উঠে আসছে দমকলের বেশ কিছু মিসিং লিংক ও দুর্বতলতার পয়েন্ট।

১. এই নিয়ে বেশ কয়েকবার বিধ্বংসী আগুনের সম্মুখীন হল শহর। কিন্তু বাগরি মার্কেটে আগুন নেভানোর সময় বারবার জল শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রতিবারই ১০-১৫ মিনিটের জন্য আটকে পড়ে আগুন নেভানোর কাজ। মনে করিয়ে দেওয়া যাক, নন্দরাম মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের সময়ও একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল দমকল। এখানেই প্রশ্ন ওঠে, বড় অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে লড়াই করার জন্য আদৌ কতটা প্রস্তুত থাকে দমকল? পর্যাপ্ত পরিমাণ জলই বা মজুদ থাকে না কেন?

২. ২০১৮ সালে বাস করছি আমরা। প্রযুক্তির এমন একটা সময় যখন একটা বোতাম টিপলেই অনেক অসাধ্য সাধন হয়। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে বাগরি মার্কেটের আগুন নেভানোর সময় ৩ তলার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিলেন না দমকল কর্মীরা। কারণ তিনতলার উচ্চতায় ওঠার মতো সিঁড়িই ছিল না দমকলের কাছে। কেন?

৩. বাগরি মার্কেট চত্বরের রাস্তাঘাট ঘিঞ্জি। সেই কারণে আগুন নেভানোর কাজেও একাধিক সমস্যা হচ্ছিল। আগুন আয়ত্তে এলেও ধোঁয়া বেরোনো বন্ধ হচ্ছিল না। আর যখনই জল শেষ হয়ে যাচ্ছিল তখনই ফের উঁকি মারা শুরু করেছিল আগুনের লেলিহান শিখা। কারণ জলের সমস্যার কারণেই আগুন নেভানোর কাজ ১০-১৫ মিনিটের জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। প্রশ্ন এটাও উঠছে, লাগাতার জল সাপ্লাই দেওয়ার প্রযুক্তি কি এখনও নেই দমকল বাহিনীর কাছে? ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মাঝে জলের অভাবের জন্য কেন বারবার বন্ধ থাকবে আগুন নেভানোর কাজ?

৪. সূত্রের খবর, আগুন লাগে মাঝরাত ২:৩০ নাগাদ। কিন্তু স্থানীয় মানুষদের অভিযোগ, দমকল এসে পৌঁছতে বেজে যায় ভোর ৪টা। বাগরি মার্কেট ঠিক যেখানে অবস্থিত, তার থেকে ১০ মিনিট দুরত্বেই অবস্থিত দমকল অফিস। একটি নয়; তিন তিনটি। মহম্মদ আলি পার্কের পাশেই একটি, লালবাজারের পাশে একটি ও সেন্ট্রাল এভিনিউতে আরেকটি। এত কাছে তিনটি স্টেশন থাকা সত্ত্বেও কেন দেড় ঘণ্টা সময় লাগবে দমকলের এসে পৌঁছতে?

৫. সূত্র মারফৎ এমন তত্ত্বও উঠে এসেছে যে, মাসখানেক আগেই আগেই বাগরি মার্কেটের এই বিল্ডিংকে ‘ফিট’ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল দমকলের পক্ষ থেকে। যদি তেমনই হয়ে থাকে, তবে আগুন লাগার ফলে এই বিরাট পরিমাণ সম্পত্তি ক্ষয়-ক্ষতির দায়িত্ব কার ঘাড়ে গিয়ে উঠবে?

আগুন লাগার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। দমকল কর্মীদের কাজের প্রশংসা করেন তিনি। অবশ্যই দমকল কর্মীদের সাহসিকতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন এখানে তোলা হচ্ছে না। প্রশ্ন তোলা হচ্ছে প্রযুক্তির ব্যবহার ও পরিকাঠামো নিয়ে। দমকল কর্তারা আবার জানিয়েছেন ৪৮ ঘণ্টা কাটার আগে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার সম্ভাবনা নেই। ফলে প্রশ্নটা একই রয়ে যাচ্ছে যে, ২০১৮ সালে দাঁড়িয়ে এমন ভঙ্গুর প্রযুক্তি নিয়ে আগুনের হাত থেকে কতটা সুরক্ষিত থাকছে আমাদের শহর?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here