বাঙালি শ্রমিকদের দ্রুত রাজ্যে ফিরিয়ে আনার দাবিতে সোচ্চার বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চ

0
murshidabad
কাশ্মীরে নিহত শ্রমিকের শোকস্তব্ধ পরিবার।

সৌম্য সাহিন: পাঁচজন বাঙালি শ্রমিক-হত্যার ঘটনার পর অন্যান্য শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং পরিবারের কথা মাথায় রেখে তাদের কাশ্মীর থেকে দ্রুত রাজ্যে ফিরিয়ে আনার দাবিতে সোচ্চার হয়েছে বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চ। পাশাপাশি, জঙ্গিহানায় নিহত শ্রমিকদের মৃতদেহ ফিরিয়ে আনতেও উদ্যোগী হয়েছে। নিহতদের পরিবারপিছু ন্যূনতম ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ও প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার থেকে একজনের সরকারি চাকরির দ্রুত ব্যবস্থার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। তারা চাইছে, এ বিষয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপ করুক রাজ্য সরকার।

কাশ্মীরে জঙ্গিহানায় পাঁচ বাঙালি শ্রমিক নিহতরা সবাই মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি অঞ্চলের বাহালনগর গ্রামের বাসিন্দা। গোটা অঞ্চলে আপাতত শোকের আবহ ছড়িয়েছে। মৃতদের নাম কামরুদ্দিন শেখ, রফিকুল আহমেদ, মুরসালিন শেখ, নইমুদ্দিন শেখ এবং রফিক শেখ। এছাড়াও গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন জহিরউদ্দিন শেখ নামে এক যুবক। বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের সভাপতি অধ্যাপক সামিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘মোট চারজন বাঙালি শ্রমিকভাইয়ের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে, যারা এইমুহূর্তে কাশ্মীরে আটকে আছেন। বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের তরফ থেকে তাদের পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে। পরিবারগুলো আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে রয়েছে। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, কাশ্মীর যোগাযোগ করে দ্রুত তাদে পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনা হোক। এছাড়াও নিহত শ্রমিকদের পরিবারপিছু ন্যূনতম ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ও প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার থেকে একজনের সরকারি চাকরির দ্রুত ব্যবস্থা করতে হবে।’

শ্রমিকদের ওপর এই নির্মম আক্রমণ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের বক্তব্য, ভারতবর্ষে এইমুহূর্তে চরম অর্থনৈতিক দুর্দশা চলছে। বিগত পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে বেকারত্বের হার সর্বাধিক। নোটবন্দি, জিএসটির মত আত্মঘাতী সরকারি নীতির ফলে অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছে। অভিযোগ, এই দুরবস্থা থেকে সাধারণ মানুষের নজর ঘোরাতে শাসকদল উগ্র জাতীয়তাবাদী জিগির তুলছে। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার অবলুপ্তির পর থেকে আশি দিন হয়ে গেল, এখনও জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে রয়েছে। রাজ্যের তিন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সহ বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের আটক করে রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার। এমনকী দেশের নির্বাচিত সাংসদদের সেখানে প্রবেশ করতে প্রশাসনিকভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মহলে কাশ্মীর ইস্যুতে যথেষ্ট চাপের মধ্যে রয়েছে ভারত সরকার। রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার হাইকমিশন উপত্যকার পরিস্থিতি নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই উত্তপ্ত অবস্থায় ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একদল কট্টর দক্ষিণপন্থী সদস্যকে কাশ্মীরে এনে সদর্থক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গোটা উপত্যকাকে মুড়ে দেওয়া হয়েছিল নিরাপত্তার চাদরে। কিন্তু তার মধ্যেই এই সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল যে, কাশ্মীরে রুটি-রুজির সন্ধানে যাওয়া শ্রমজীবী মানুষেরা পর্যন্ত এখন আর নিরাপদ নন। এই অবস্থার দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান না হলে, অচিরেই এই আগুন কিন্তু ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা থাকছেই।

প্রতি ১১ জন কাশ্মিরি-পিছু একজন করে সেনা মোতায়েন রয়েছে কাশ্মীরে। নিরপত্তার এত বজ্র আঁটুনি সত্ত্বেও পাঁচজন পরিযায়ী শ্রমিককে জঙ্গিরা হত্যা করে চলে গেল। এই ঘটনায় নানারকমের সম্ভবনার কথা উঠছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, যারা বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতি করে ভোট বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করে, তাদের কাছে অসম্ভব নয় জঙ্গি কার্যকলাপের জিগির তুলে অবশিষ্ট ভারতীয়দের মনে কাশ্মীরি বিদ্বেষ জাগিয়ে তোলা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে ‘জঙ্গি কার্যকলাপের’ জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপনের লক্ষ্যে পাঁচ পরিযায়ী শ্রমিককে গিনিপিগ বানানোর সম্ভাবনার কথাও টানছেন কেউ কেউ। প্রসঙ্গত, যে কুলগামে পাঁচজন বাঙালি শ্রমিককে হত্যা করা হল, সেখানকার নির্বাচিত বিধায়ক সিপিআইএমের মোহাম্মদ ইউসুফ তারিগামী। তবে মতামত যাই হোক, দীর্ঘ তিনমাসের লক-ডাউন কাশ্মীরের পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক করে তুলতে পারেনি, এই ঘটনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here