kolkata news

রাজেশ সাহা, কলকাতা: “গুড মর্নিং ফ্রেন্ডস….. তোমরা শুনছো রেডিও দমদম, আর সঙ্গে আমি আরজে মনুয়া। আজ তোমাদের সঙ্গে অনেক গল্প করবো ও তোমাদের মনের পছন্দের গান শোনাবো”। রোজ সকাল সাতটা নাগাদ রেডিওর স্পিকারে ভেসে আসা এই মৃদু কণ্ঠ শুনেই আজকাল ঘুম ভাঙছে আবাসিকদের। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই রেডিও জকি হিসেবে বেশ প্রশংসাও কুড়িয়েছেন আরজে মনুয়া। নামটা খুব চেনা ঠেকছে না? একদমই ঠিক ধরেছেন, এই সেই মনুয়া যে প্রেমিকের সঙ্গে ফন্দি করে নিজের স্বামীকে খুন করে রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল পুলিশের। কয়েক বছর আগেই এই খুনের নৃশংসতা শুনে শিউরে উঠছিল শহরবাসী। বারাসতের বাসিন্দা হাড় হিম করা সেই খুনের আসামিই আজ রোজকার সকালের ঘুম ভাঙানো রেডিও জকি।

তবে কোন বেসরকারি রেডিও স্টেশনে নয়, মনুয়া সম্প্রতি রেডিও জকি হিসেবে কাজ শুরু করেছে দমদম জেলের মধ্যেই। আর তাঁর স্রোতারাও সকলেই জেলবন্দি আসামি। গত সপ্তাহে দমদম সেন্ট্রাল জেল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে সংশোধনাগারের মধ্যে শুরু হয়েছে এমনই এক অভিনব রেডিও স্টেশন, যা এক প্রকার ‘ইন্টারনাল রেডিও সিস্টেম’। অর্থাৎ স্টুডিও থেকে স্রোতা সবটাই জেলের ভেতরে। আর পাঁচটা এফএমের মতো বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে বাইরে থেকে শোনা যাবে না এই রেডিও। “জেলবন্দী আসামিদের সামান্য মনরঞ্জনের উদ্দেশ্যেই এই অভিনব উদ্যোগ”, জানালেন দমদম সেন্ট্রাল জেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট শুভেন্দু ঘোষ। কর্তৃপক্ষের এমন উদ্যোগে খুশি অন্যান্য আবাসিকরাও। কারা বিভাগ সূত্রে খবর, দমদম সেন্ট্রাল জেলের ভিতরে প্রত্যেকটা ওয়ার্ড এবং সেলের ভেতরে বসানো হয়েছে রেডিও স্পিকার। সেখানেই দিনভর শোনা যাবে রকমারি অনুষ্ঠান। রোজ সকাল ৭টাই শুরু হবে অনুষ্ঠান, চলবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। নাম দেওয়া হয়েছে রেডিও দমদম। রেডিও স্টেশন চালু থেকে আরজে প্রশিক্ষণ, গোটা প্রক্রিয়ায় জেল কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করেছে কলকাতার একটি বেসরকারি রেডিও স্টেশন।

তবে শুধু বারাসতের মনুয়াই নয়, দমদম রেডিওতে জকির কাজ মিলেছে আরও চারজন যাবজ্জীবন সাজা প্রাপ্ত আসামির। মনুয়ার সহকর্মীদের মধ্যে রয়েছেন ব্যারাকপুরে তিন তিনটে খুন করে খবরের শিরোনামে উঠে আসা পীযূষ ঘোষ, স্ত্রীকে নৃশংস ভাবে খুন করে সাজাপ্রাপ্ত উত্তরবঙ্গের তুহিন রায়, কলকাতার বাসিন্দা খুনের আসামি জিনিয়া নন্দী এবং জয়ন্ত কুমার সিনহা। প্রত্যেকেই খুনের আসামি এবং যাবজ্জীবন সাজা প্রাপ্ত। রোজকার জেলবন্দি জীবনে রেডিও জকির কাজ পেয়ে আপ্লুত সকলেই। জেল সূত্রে খবর, এই উদ্যোগ নেওয়ার পর রেডিও জকির কাজের জন্য প্রাথমিকভাবে নাম বাছাই করা হয়েছিল দশ জনের। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ পর্বের পর দক্ষতা, উৎসাহের ভিত্তিতে তাঁদের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া হয় মোট পাঁচজনকে। তাঁদের চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় পাঁচ দিন। এরপরই যাত্রা শুরু করে রেডিও দমদম। সকাল সাতটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত পাঁচটি স্লট ভাগ করে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছেন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা।

কারা বিভাগ সূত্রে খবর, দমদম সেন্ট্রাল জেলে এই মুহুর্তে সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন মিলিয়ে প্রায় চার হাজারের বেশি বন্দি রয়েছে। তবে জেলের মধ্যে রেডিও এই প্রথম নয়। এর আগেই এমন রেডিও বসানো হয়েছে, তিহার জেল সহ পুণে, তামিলনাড়ু, আগ্রার বিভিন্ন জেলে। তবে পশ্চিমবঙ্গে এমন উদ্যোগ এই প্রথম। রাজ্যের কারামন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস মহানগরকে টেলিফোনে জানান, “দমদম জেলের এই রেডিওতে ভালো সাড়া পেলে ভবিষ্যতে রাজ্যের অন্যান্য সেন্ট্রাল জেলগুলিতেও একই উদ্যোগ নেওয়া হবে।” ডিজি (কারা) অরুণ গুপ্ত বলেন, “ইতিমধ্যেই আমরা ভালো রেসপন্স পাচ্ছি। জেলবন্দিদের মধ্যে এই নিয়ে উৎসাহও বেশ চোখে পড়ার মতো। ভবিষ্যতে অন্যান্য সেন্ট্রাল জেলেও একই ব্যাবস্থা করার পরিকল্পনা আছে”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here