আনন্দাশ্রু! বর্ধমানে অচলায়তন ভেঙে দেবী বরণে মাতলেন ট্রান্সজেন্ডার ও বিধবারা

0
165
kolkata bengali news

নিজস্ব প্রতিবেদক, পূর্ব বর্ধমান:  ভাঙল অচলায়তন! এবছরের দুর্গাপুজোয় বর্ধমান শহরে সমাজ সংস্কারের বড়সড় দৃষ্টান্ত গড়ল বর্ধমান শহরের ‘ফুডিশ ক্লাব’ নামক এক সংস্থা। ২০১৯ সালে কার্যত নিঃশব্দে বিপ্লব ঘটে গেল বর্ধমান শহরে দশমীর দিন সকালে। এদিন পূর্ব বর্ধমান শহরে দেবী দুর্গাকে দশমীর দিন সিঁদুর দিয়ে বরণ করলেন ট্রান্সজেণ্ডার এবং বিধবারা। যা ঘিরে ইতিমধ্যেই সাড়া পড়ে গিয়েছে শহর তথা জেলা জুড়ে।

দীর্ঘদিনের সামাজিক অচলায়তনের সংস্কার ভেঙে এই দুই ধরণের মানুষকে ফের সামাজিক আচার ব্যবহারে যুক্ত করার যুগান্তকারী এই কাজ প্রথমবার করে দেখিয়েছিল কলকাতার সুরুচি সংঘ ২০১৭ সালে। আর দ্বিতীয়বার সেই কাজ করে দেখাল মফস্বল এই শহর। উদ্যোক্তা ক্লাবের সদস্য মৈনাক মুখার্জী জানিয়েছেন, অনেক দিন ধরেই তাঁরা এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিভিন্ন ধরণের বাধায় তাঁরা তা বাস্তবায়িত করে উঠতে পারেননি। সামাজিক কুসংস্কার, নিয়ম নীতির বাধা টপকাতে পারেননি। অথচ তাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই এই জ্বালা সহ্য করে যাচ্ছিলেন। কেন নারীরা স্বামীহারা হওয়ার পর সিঁদুর দিয়ে দুর্গাকে বরণ করতে পারবেন না? কেন তাঁদের সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে? এই যন্ত্রণাই তাঁদের কুরে কুরে খাচ্ছিল। তাঁরা বর্ধমান শহরের বড় বড় পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে গেছেন। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আবেদন করেছেন, আর পাঁচজন সাধারণ মহিলাদের মতই ট্রান্সজেণ্ডার এবং বিধবারা সিঁদুর দিয়ে দেবীকে বরণ করার জন্য এগিয়ে আসুক। মৈণাকবাবু জানিয়েছেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় বর্ধমানের কোনো পুজো উদ্যোক্তাই তাঁদের এই আবেদনে সাড়া দেননি। শেষ পর্যন্ত ফুডিশ ক্লাবের এই অচলায়তন ভাঙার আবেদন সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসেন কাঁটাপুকুর সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি।

আর কাঁটাপুকুরের এই মণ্ডপেই মঙ্গলবার বর্ধমান শহরের লবঙ্গ লতিকা হোম থেকে প্রায় ১১ জন ট্রান্সজেণ্ডার এবং বড়নীলপুরের বাসিন্দা বিধবা মীরা সিনহা, মমতা শিকদার সিঁদুর দিয়ে বরণ করলেন দেবী দুর্গাকে। শুধু তাই নয় একদিকে ট্রান্সজেণ্ডাররা জীবনে প্রথম সিঁদুর দিয়ে বরণ করলেন দেবী দুর্গাকে। অন্যদিকে, তাঁদের সঙ্গেই হাতে সিঁদুর আর দুচোখে জলধারা নিয়ে মাকে বরণ করলেন মীরাদেবীরা। এতটাই তাঁরা বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন যে কেমন লাগছে তা বলার মত অবস্থায় ছিলেন না। সামাজিক বেড়াজালকে ভেঙে আদপে জীবনে আর কখনও মাকে সিঁদুর দিয়ে যে বরণ করতে পারবেন এই আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন মমতাদেবীরা, ট্রান্সজেণ্ডাররা ভাবতেও পারেননি। প্রতিনিয়ত তাঁরা সমাজের কাছ থেকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যেরই শিকার হয়ে চলেছেন ও চলবেন একথাই মেনে নিয়েছিলেন। তাই সামাজিক যে কোনো শুভ কাজে তাঁরা পারতপক্ষে পা বাড়াতেন না। একইকথা মীরাদেবীদেরও। শুভ কাজে তাঁদেরও যেতে মানা। মঙ্গলবার সেই অচলায়তনই তাসের ঘরের মত ভেঙে দিলেন ফুডিশ ক্লাবের সদস্যরা। খুশি মীরা দেবীরা। খুশি রোজি, মধুরাও। জানিয়েছেন, তাহলে প্রতিবছরই তাঁরা মাকে এভাবেই বরণ করার অধিকার পাবেন। কাঁটাপুকুর সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির সম্পাদক বুদ্ধদেব সামন্ত জানিয়েছেন, যখন ফুডিশ ক্লাবের সদস্যরা তাঁদের কাছে এসে এই আবেদন রাখলেন তখন সত্যিই তাঁরা চমকে উঠেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে পুজো কমিটির সদস্যদের নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেই জানিয়ে দিয়েছিলেন এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হতে চায় কমিটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here