bedroom

বল্লাল সেন: আরব্যরজনী রূপকথা বাঙালির মনে কতখানি ছায়া ফেলেছে, তা দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার (১৮৭৭-১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ) মহাশয়ের ‘ঠাকুমার ঝুলি’র গল্পগুলোর জনপ্রিয়তা দেখলে বোঝা যায়। এই গল্পগুলো অদ্ভুত ভাবে কোনও না কোনও রাজকন্যার শোবার ঘরের পটভূমিকায়– আর শোবার ঘর কোনও না কোনও গল্পের স্তর। রাজকন্যা তার সোনার খাটের উপর শুয়ে, অন্য কোনও দেশের এক রাজপুত্র কীভাবে রাজকন্যার শোবার ঘরে প্রবেশ করল কে জানে– প্রবেশ করে রুপোর কাঠি দিয়ে রাজকন্যার খাটে ঠেকাল, রাজকন্যা জেগে উঠল, চোখে চোখে দৃষ্টি বিনিময়– থেকে প্রণয়– প্রণয় থেকে– আরও কত কী।

মহাভারতের গুপ্ত আলোচনা হত শোবার ঘরেই। আর কৃষ্ণের চালাকি, ধর্মযুদ্ধে কোন দিকে তিনি থাকবেন– ঠিক হল সেই শয়নকক্ষে। প্রথম চোখ খুলে তিনি যাকে দেখবেন, তার দিকেই তিনি ঢলবেন। যুধিষ্ঠির বসলে কৃষ্ণের পায়ের নিচে গিয়ে আর দুর্যোধন মাথার দিকে। চোখ মেলেই প্রথমে চোখের সামনে দেখলেন যুধিষ্ঠিরকে, সুতরাং কৃষ্ণের দায়বদ্ধতা রইল পাণ্ডবদের দিকে। কিন্তু মজার কথা, রামায়ণে শুধুমাত্র কুম্ভকর্ণের ঘুমোনো ছাড়া আর কারও শোবার ঘরের বিশ্লেষণ পাই না। এখানে একটা প্রশ্ন অবশ্যই আসে, অশোকবনে সীতাকে যে রাখা হয়েছিল, সীতার শোবার ঘর ছিল কোনটা?

শিব্রাম চক্কোবত্তি একবার বলেছিলেন, শোবার ঘরে স্বামী ও স্ত্রীর প্রণয়ের প্রথম বছর স্ত্রীর কথা বিগলিতচিত্তে শোনে স্বামী। পরের বছর সেই শোবার ঘরে স্ত্রীর বাড়ি থেকে পাওয়া খাটের ওপর শুয়ে স্ত্রী শোনে স্বামীর বাস্তবের সঙ্গে হরেক রকম কল্পনা মিশেল কথা। তার পর তৃতীয় বছর দু’জনের কথা কেউ শোনে না– শোনে তাদের প্রতিবেশীরা। চক্কোবত্তি মহাশয়ের দর্শনে বাঙালির শোবার ঘরের নিভৃত-প্রণয় বেশ ভাল রকম ক্ষণস্থায়ী।

আগে যৌথ পরিবারের দম্পতিদের ভাগ্যে জুটত একটা ঘর। সেখানে প্রবেশ করত যৌতুকে পাওয়া শোয়ার খাটটি। তার পর প্রণয়যুগলের সন্তানচর্চা আরম্ভ হলে যুক্ত হত একটি বেঞ্চি। আর খাটের মশারির ছতরিগুলোতে আশ্রয় নিত শিশুসন্তানের জামা, কর্তার ধুতি আর গৃহিণীর দৈনিক পরা শাড়ি। শোবার ঘর আর ছিমছাম থাকে না, হয়ে ওঠে কেমন ন্যাড়া-জোবড়া।

বাংলা সাহিত্যে, বাংলা চলচ্চিত্রে কিংবা বাংলা সংস্কৃতিতে শোবার ঘরের বর্ণনা কোনও জায়গাতেই খুব একটা খারাপ নয়। ধরা যায়, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে সূর্যমুখীর শোবার ঘরটি। যথেষ্ট পরিপাটি, রূপকথার রানকন্যার মতো না হোক, তবে তার চাইতে কোনও দিক থেকে কিছু কম নয়। পুরাণের আদর্শ নিয়ে নিজের হাতে সুতো দিয়ে শিল্প তৈরি করে ফ্রেমে বাঁধানো ‘পতি পরম গুরু’ (যা বিয়ের সময় তত্ত্বে পাঠানো হয়েছিল)। মনে আসছে, রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড় ছোটগল্পের চারুলতা চলচ্চিত্রে চারুর সঙ্গে দেখা অমলের এই শোবার ঘরে। টানটান করে চাদর পাতা, মাথার বালিশের ওপরে ঝাড়নটাতে হাতের কাজ আর পাশবালিশটা পাশে শোয়ানো আছে। চারু এখানে অমলকে হাতেবোনা ‘অ’ লেখা একটা রুমাল দেবে।

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে যখন বাবু ঘরানা মোটামুটি ভাবে বাঙালি সমাজের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, বাইজি নাচ, সোনাগাছি বেশ্যাপল্লিতে যাওয়া সমাজের পক্ষে একনম্বর কাজ, নিজের বাড়িতে নিজের বউয়ের সঙ্গে রাত্রিযাপন অশ্লীলতার পর্যায়ে পড়ে। হরিপদ চক্রবর্তী তাঁর গ্রন্থ ‘সীতা অন্বেষণে’ লিখেছেন, ‘সতীদের অন্ন জোটে না, বেশ্যাদের জড়োয়া গহনা/ পণ্ডিতে চণ্ডী পড়ে দক্ষিণা পান চারটি আনা।’ এই সঙ্গে বাবুচরিত্রের একটা ছবি কালীঘাট পটে কেমন ছিল দেখা যাক। ‘মাথায় তরঙ্গায়িত বাবরি চুল, পরিধানে ফিনফিনে কালা পাড়ে ধুতি, চুনট করা উড়ানী ও পায়ে পুরু বগলস সমন্বিত কালো জুতো। কখনও বাবু বীণা বাজাচ্ছেন, কখনও বাবু বাড়ির বাইরে যাবেন স্ফূর্তি করতে, নিরাভরণা ক্রন্দনরতা স্ত্রী পায়ের কাছে লুটিয়ে, আবার কখনও বাবু তার প্রেয়সীর সঙ্গে মদ্যপানরত।’ তখন স্ত্রীর শোবার ঘরে রাত্রে স্বামীর মুখ দেখার কোনও রকম সুযোগই থাকত না। সারাদিন ঘরের কাজ করে বিভিন্ন ভাবে পরিবার সামলে রমণী শুয়ে পড়ত তার নির্দিষ্ট শোবার ঘরে। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে সন্তানচর্চার কোনও কমতি থাকত না। সেই সময় বঙ্গ রমণীকুল নিজের একাকীত্ব, নিজের মনের ব্যথা নিয়েই শোবার ঘরে গুমরে গুমরে জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছত।

বাঙালির যৌথ পরিবার ভেঙে ভেঙে অণু-পরমাণুর মধ্যে নিজেদেরকে নিয়ে এসেছে। কিন্তু শয়নকক্ষ সম্বন্ধে আজও তার একটা বিলাসিতা রয়ে গিয়েছে– এই কক্ষ হবে একটু অন্য রকম, একটু অন্য ধরনের, একটু আলাদা, একটু বিলাসভোগ্য। শয়নকক্ষ মানেই শুধুমাত্র সন্তানচর্চা নয়, এখন এই চর্চা বেশ রাশটানা পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বিজ্ঞানসম্মত মনঃস্তত্ত্বে সাধ্যবোধে উত্তীর্ণ এই চর্চা সংগঠিত হয়। শয়নকক্ষ মানেই দম্পতির বেহায়াপনা নয়– যা হয়ে উঠেছে শয্যাসৌখিন।

আরও পড়ুন… উপার্জনের চিন্তা বাঙালি-চরিত্রে সম্ভবত ধাতুগত ভাবেই অনুপস্থিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here