charu majumdar

বিশেষ প্রতিবেদন: নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, ১৯৬৯ থেকে ৭২-এর নকশাল আন্দোলন বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক চালচিত্রে এক চরম আঘাত। সময়টা ছিল নতুনভাবে, নতুনরূপে পথচলার এক চরম পরীক্ষা। এই পরীক্ষার নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড চারু মজুমদার। এ বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ এবং ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। ‘‘মনুমেন্ট ময়দানে বাস গুমটি ছাড়িয়ে একটু এগুতেই এক জটলা থেকে গান ভেসে এল। ‘মুক্ত হবে প্রিয় মাতৃভূমি,/ সেদিন সুদূর নয় আর–/ দেখো লাল সূর্যের আলোয় লাল পূর্ব দিগন্তের পার।/ সে আলো ছড়ায় দিক্ বিদিকে কেটে যায় রাতের অন্ধকার।’’

১৯৬৭ সালের ২৪ মে নকশালবাড়ির কৃষকদের ওপর গুলিচালনার ঘটনায় শহিদ ৯ জন। কৃষকরমণী সহ দু’জন শিশু। আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন কানু সান্যাল ও জঙ্গল সাঁওতাল। বাংলার বুকে অবশ্যই এক ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’। উত্তরবঙ্গের এই ছোট অজানা গ্রাম লোকচক্ষুর সামনে এসে গেল। বাংলায় জনসমাজে এই আন্দোলন অর্থনৈতিক, সমাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক জীবনে এক চরম আঘাত দিয়েছিল কোনও সন্দেহ নেই। পরে অবশ্য এই আন্দোলনের বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ একটু অন্যরকম হল। সে তর্কে যাচ্ছি না। চিন-ভারত যুদ্ধ আরম্ভ হল ১৯৬২-তে। এই যুদ্ধ, সে সময়ের শাসক কংগ্রেসের বাম ও ডান অংশকে সমর্থন ইত্যাদি প্রশ্নে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই) ভাঙল ১৯৬৪-তে। সিপিআই ছেড়ে যাঁরা বেরিয়ে গেলেন, তাঁরা তৈরি করলেন কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া মার্কসিস্ট (সিপিআইএম)। আবার ১৯৬৯ সালে সিপিআইএম ভাঙল। তৈরি হল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া মার্কিসিস্ট-লেনিনিস্ট (সিপিআই এমএল)। নেতৃত্বে চলে এলেন ১৯৩৮ থেকে বামপন্থী আন্দোলনে যুক্ত চারু মজুমদার। পিতা ছিলেন জমিদার বীরেশ্বর মজুমদার। আদ্যোপান্ত কংগ্রেস। চারু মজুমদার পড়াশোনা করেছেন বর্তমান বাংলাদেশের পাবনা জেলার এডওয়ার্ড কলেজে। পড়াশোনা ছেড়ে চা-বাগানের শ্রমিকদের সংগঠিত করতে লাগলেন।

charu majumdar১৯৭০ সালে তৈরি হল সিপিআই এমএল-এর কুড়িজনের এক কমিটি। সম্পাদক হলেন চারু মজুমদার। অনেকে বলতে আরম্ভ করলেন, এই গ্রামীণ নকশালবাড়ির আন্দোলন ভারতের বুকে স্বাধীনতার পর এক উজ্জ্বল অস্তিত্ব। যুক্ত হল অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেঙ্গানা, শ্রীকাকুলাম, বাংলার মেদিনীপুরের গোপীবল্লভপুর ইত্যাদি। প্রচণ্ড আশা, প্রচণ্ড সংগ্রামের ছক, স্বপ্নের পাহাড় নিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হল বাংলার তথা অন্ধ্রের বুকে কৃষকদের সম্মিলিত সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি। এ যেন ১৯৪৬-এর তেভাগা আন্দোলনকেও ছাড়িয়ে গেল। ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’, ‘সত্তরের দশক মুক্তির দশক’, ‘যে স্বপ্ন দেখতে পারে না, অন্যকে স্বপ্ন দেখাতে পারে না, সে বিপ্লবী হতে পারে না’- স্লোগানে তখন গ্রাম থেকে শহর মুড়ে ফেলেছে। সিপিআই এমএল হয়ে গেল ‘নকশাল আন্দোলন’। চারু মজুমদারের নিজস্ব এক নির্দিষ্ট চিন্তা ছিল। অশোক মুখোপাধ্যায় ‘আটটা-ন’টার সূর্য’ উপন্যাসে এঁকেছেন দারুণ ভাবে। হাঁপানি, বুকের অসুখ নিয়েও তাঁর বাংলার গ্রামে-গ্রামে ছুটে চলা, প্রান্তিক এবং জমিহীন কৃষকদের নিয়ে সংগঠন গড়ার কাজ, তাঁদের শিক্ষা দেওয়া গেরিলা যুদ্ধের জন্য। ভাবতে আরম্ভ হয়েছে মাও জে তুং যেভাবে চিনের কৃষকদের নিয়ে ‘গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড’ করেছিলেন, এঁদেরও সেই ভাবে নিয়ে যেতে হবে মুক্তিসংগ্রামে। সর্বহারা শ্রেণিকে গ্রাম থেকে শহর ঘিরতে হবে। গ্রামের আন্দোলন শহরে চলে এল। দেখা দিতে লাগল বিভিন্ন ফাঁকফোকর। শ্রেণিশত্রু নিধনের নামে চলল সর্বনাশা ধ্বংসের লীলা। মধ্যবিত্ত সমাজ প্রত্যক্ষ ভাবে এই নকশাল আন্দোলনের সমর্থন করলেও, শেষে পিছিয়ে গেল। খুন হতে লাগলেন মেধাবী যুবক-যুবতী। পার্টির মধ্যে তৈরি হতে লাগল রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাত, তৈরি হতে লাগল গোষ্ঠী, দুর্বল হতে লাগল সংগঠন। যখন যৌথ কমিউনিস্ট পার্টি ছিল, জমিদার বংশের চারু মজুমদারকে চরম সংশোধন-বিরোধী এবং উগ্র চিন সমর্থক বলে পার্টির অভ্যন্তরে তাঁর প্রতিষ্ঠা ছিল।

১৯৬৩-তে শিলিগুড়ি বিধানসভাতে তিনি সিপিআইয়ের প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন। এবং খুব সামান্য ভোট পান। না দমে বলেন, এঁরাই হচ্ছেন আসল চিন সমর্থক। এঁদের নিয়েই আমি আন্দোলন করব। তাঁর শেষকথা ছিল, সশস্ত্র বিপ্লবই দেশের মুক্তির পথ। ১৯৭০। দলের সব মুখপত্র ‘দেশব্রতী’, ‘দেশহিতৈষী’, ‘লিবারেশন’ প্রকাশনা বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হল। চারু মজুমদার গা-ঢাকা দিয়েছেন। সেখান থেকে সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ১৯৭২-এর ২৬ জুলাই কলকাতার একটি বাড়ি থেকে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। দীর্ঘদিনের অন্তরাল, পালিয়ে বেড়ানো, শারীরিক দুর্বলতা ও অসুস্থতা আরও বাড়িয়ে দেয়। হাসপাতালে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয়। সরকারি চিকিৎসা নিতে তিনি অস্বীকার করেন। পরদিন ২৭ জুলাই তিনি মারা যান। শোষণমুক্তির অভ্যুত্থান এই আন্দোলনকে নিয়ে আশা ছিল। কিন্তু গড়ে ওঠার সম্ভাবনার আগেই বিপ্লবের ট্র‌্যাজিক মৃত্যু হল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here