ডেস্ক: ‘উপর মত আনা, ম্যায় সামাল লুঙ্গা’ এনএসজি কম্যান্ডর মেজর সন্দিপের মুখ থেকে শেষবারের জন্য এটাই শুনেছিলেন সুনীল, বাবুলাল সহ তাঁর আরও দুই সঙ্গী। ততক্ষণে জঙ্গিদের গরম সীসার বুলেট বিদ্ধ করেছে তাঁর হাত। সেই অবস্থায় একাই জঙ্গিদের খোঁজে তাজ হোটেলের একের পর এক ফ্লোর পার করে চলেছেন ভারতের বীর জওয়ান মেজর সন্দীপ উন্নিকৃষ্ণাণ। ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর দিনটা ভারতের বুকে খোদাই করা এক অভিশপ্ত দিন হিসাবে। মুম্বইয়ের ছত্রপতি শিবাজি স্টেশন, নরসিমা রাও বিল্ডিং, তাজ হোটেল জঙ্গি হামলায় তখন মৃত্যু হয়েছে শতাধিক মানুষের। দেশের এমন চরম বিপর্যয়ের মুখেই ডাক পড়ে ভারত মায়ের সেরা বীর যোদ্ধাদের। বেলাগাম পরিস্থিতির মাঝে ২৮ নভেম্বর ডাক পড়ে সারা দেশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপের ১৪ জন বীর যোদ্ধার। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মেজর সন্দীপ উন্নিকৃষ্ণাণ।

সেদিন রাত ১১ টা নাগাদ বাবাকে ফোন করে সন্দীপ জানান, ‘মুম্বইতে খুব খারাপ কিছু ঘটেছে আমাকে এখুনি বেরোতে হবে।’ পরিবারের সঙ্গে ওটাই ছিল তাঁর শেষ কথা। সেনা জওয়ানদের সঙ্গে তাজ হোটেলের সামনে যখন তিনি পৌঁছন তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ। কত জন জঙ্গি হোটেলে রয়েছে তার কোনও সঠিক তথ্য নেই সেনার কাছে। নেই তাজ হোটেলের কোনও ম্যাপও। এদিকে হোটেলের ভেতর নিরীহ মানুষকে লক্ষ্য করে একের পর এক হত্যা লীলা চালিয়ে যাচ্ছে জঙ্গিরা। একইসঙ্গে নিজেদের স্থান জানতে না দেওয়ার জন্য হোটেলের ভেতর লাগাতার স্থান পরিবর্তন করে চলেছে জঙ্গিরা। ওই অবস্থার মধ্যেই নিজের সঙ্গিদের সঙ্গে তাজ হোটেলের প্রথম তলায় যান মেজর। সেখান থেকে উদ্ধার করেন ১৪ জন পণবন্দীকে। সেখান থেকে বেরিয়ে তাঁদের টিম যখন দ্বিতীয় তলার উদ্দেশ্যে এগোচ্ছে তখনই অতর্কিতে গুলি ছোঁড়ে জঙ্গিরা। কোনওমতে নিজেকে বাঁচান মেজর। কিন্তু গুলি লাগে তাঁর সঙ্গী সুনীলের গায়ে, ওই অবস্থার মধ্যেই জীবন হাতে করে উপরে উঠতে থাকেন সন্দীপ। উপরে কাউকে না আসার নির্দেশ দিয়ে তিনি একাই উঠতে থাকেন উপরে। ততক্ষণে তিনি বুঝে গিয়েছেন জঙ্গিদের অবস্থান কোথায়। ৪ তলায় তিনি যখন পৌঁছন তখন তাজহোটেলের ছাদ থেকে সেখানে এসে পৌঁছেছে স্পেশাল কম্যান্ডর রাজবীর সিংয়ের টিম। খবর ছিল, সেখানে একটি গেস্টরুমে বন্দী হয়ে আছেন বহু মানুষ। তাঁদের সেখান থেকে বের করার সময় হঠাৎই সেনার উপর আক্রমণ করে সেই ঘরেই লুকিয়ে থাকা এক জঙ্গি। ওই ঘরে যে জঙ্গি লুকিয়ে আছে তেমন কোনও খবর ছিল না সেনার কাছে। হঠাৎ এই আক্রমনের ঠিক সামনে পড়েন সন্দীপ। তবে এক মুহূর্তের জন্য বুদ্ধি লোপ পায়নি তাঁর। সেই অবস্থার মধ্যেই নিজে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে বাকিদের বাকিদের প্রাণ বাঁচান তিনি। একে ৪৭- এর একের পর এক গুলি ততক্ষণে বিদ্ধ করে চলেছে তাঁর গোটা শরীর। ইনিই মেজর সন্দীপ উন্নিকৃষ্ণাণ। নিজের বীরত্বের জন্য তিনি পেয়েছেন ভারত সরকারের সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধার সম্মান অশোক চক্র।

জন্ম ১৫ মার্চ ১৯৭৭ কেরালায়। বাবা ছিলেন রিটায়ার ইসরো(ISRO) অফিসার কে. উন্নিকৃষ্ণান, মা ধনলক্ষ্মী উন্নিকৃষ্ণান। ছোট থেকেই সেনা জওয়ান হওয়ার স্বপ্ন ঘিরে রাখত তাঁকে। তাঁর ছাত্র জীবনেও তাঁর আচরণ ছিল একজন মিলিটারি জওয়ানদের মতো। মিলিটারিদের মতো চুল রাখা, হাটা চলা, কথাবার্তা সমস্ত জায়গাতেই তাঁর আচরণ ছিল একজন সেনার মতোই। সেই স্বপ্ন সফল হয় ১৯৯৫ সালে পুনে, মহারাষ্ট্রের ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন সন্দীপ। এরপর ১৯৯৯ সালের ১২ জুলাই তিনি যোগ দেন বিহার রেজিমেন্টের ৭নং ব্যাটেলিয়ানে। এরপর সেনা জওয়ান হিসাবে জম্মু কাশ্মীর ও রাজস্থানেও কাটিয়েছেন বহুদিন। তাঁর একরোখা মানসিকতা ও যোগ্যতার জন্য তাঁকে নির্বাচিত করা হয় ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (NSG)-এর জন্য। সেখান থেকে ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে স্পেশাল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তাঁকে নির্বাচন করা হয় এনএসজির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ(SAG)-এর জন্য। যা ভারতীয় সেনার সেরা সৈনিকদের একটি টিম। ১৯৯৯ সালের অপারেশন বিজয়েও অংশ নিয়ে সেখানে নিজের বীরত্ব দেখিয়েছিলেন মেজর সন্দীপ।

এরপর তাঁর দ্বিতীয় যুদ্ধ ছিল ২৬/১১ মুম্বই হামলায় জঙ্গিদের খতম করে পণবন্দীদের উদ্ধার করা। নিজের দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন মেজর। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। নিজের সঙ্গি ও পণবন্দীদের বাঁচাতে বুক চিতিয়ে সামনে দাড়ান ভারতীয় সেনার এই বীর যোদ্ধা। জঙ্গির গুলিতে তাঁর শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেও নিজের কর্তব্য এক মুহূর্তের জন্য ভোলেননি শহিদ মেজর সন্দীপ উন্নিকৃষ্ণাণ। ভারতের এই বীরযোদ্ধার জন্ম দিবসে তাঁকে শ্রদ্ধা জানায় মহানগর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here