‘মিম’-কে দিয়ে তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে সিঁধ কাটতে চাইছে বিজেপি! সাবধান সংখ্যালঘুরা

0
kolkata news

সিরাজুল ইসলাম: এই রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোট যাদের সঙ্গে আছে, ক্ষমতা তাদের সঙ্গেই থাকে। বামেদের শাসনকাল ৩৪ বছর দীর্ঘায়িত হয়েছিল বেশ কিছু কারণের জন্য। তবে সেই সব কারণের অন্যতম হল সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক নিজেদের দিকে অটুট রাখা। আর সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের রাশ একটু আলগা হতেই ২০১১ সালে রাজ্য থেকে বিদায় নিতে হয় বামেদের। সেই সংখ্যালঘু ভোটের সিংহভাগ আজ তৃণমূলের দিকে আছে। আপাতত সেই ভোটব্যাঙ্ক অন্য কোনও দিকে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

kolkata news

যদিও, শেষ লোকসভা ভোটে তৃণমূলের শোচনীয় ফল হয়েছে। এক ধাক্কায় বিজেপি এই রাজ্যে লোকসভায় প্রায় অর্ধেক আসন দখল করে নিয়েছে। তবে লক্ষ্যণীয় ভাবে যেটা দেখা গেল তা হল, সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের আধিক্য আছে, এমন জায়গায় বিজেপি তেমন ভাবে থাবা বসাতে পারেনি। আর এই সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক নিজের দিকে ধরে রাখতে পারার জন্য প্রায় হারতে বসা বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে তৃণমূল অনেক ভোটে জিতে গিয়েছে। যার অন্যতম হল বসিরহাট ও যাদবপুর। সংখ্যালঘু কিছু ভোট বিজেপি’র দিকে যায়নি তা নয়। কিছু অবশ্য গিয়েছে। কিন্তু তা সংখ্যায় একেবারে বিপুল নয়। মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর বরাবরই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এই কেন্দ্রে লক্ষ্যণীয় ভাবে বিজেপি প্রার্থী মাফুজা খাতুন দ্বিতীয় হতে পেরেছেন। সংখ্যালঘু ভোট তিনি না পেলে তাঁর পক্ষে দ্বিতীয় হওয়া সম্ভব ছিল না। এটা বিজেপি ভাল করেই জানে যে, সংখ্যালঘু ভোট পুরো তো দূরের কথা, অর্ধেকও কখনও তারা এই রাজ্যে পাবে না। সংখ্যালঘু ভোট না পেলে আর যাই হোক এই রাজ্যে ক্ষমতা কখনও দখল করা যাবে না। আর এটাই এই রাজ্যের রাজনৈতিক সারসত্য।

বিজেপি যখন এই ভোটে ভাগ বসাতে পারবে না বুঝতে পেরেছে, তখন রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসাতে আসছে হায়দরাবাদের মজলিসে ইত্তেহাদুল মুসলিমিন বা মিম পার্টি। দলের কাণ্ডারি আসাদউদ্দিন ওয়েইসি এবার বিশেষ ভাবে নজর দিতে চান এই বাংলায়। ইতিমধ্যে তিনি তাঁর কাজ শুরু করে দিয়েছেন। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় টুকটাক মিটিং শুরু হয়ে গিয়েছে তাঁর দলের। এলাকাভিত্তিক কিছু সংখ্যালঘু যুবক আপাতত ভিড়েও গিয়েছেন মিম-এ।

গোটা বাংলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নাম নামলেও আসাদউদ্দিন ওয়াইসি’র দল সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কয়েকটি জেলায় যে কিছু প্রভাব ফেলবে, তা বলাই যায়। কিন্তু, আসাদউদ্দিন ওয়েইসি’র দল এই রাজ্যে উল্লেখযোগ্য ভাল ফল যে করতে পারবে না তা বলাই যায়। কারণ, এই রাজ্যের সংখ্যালঘুরা বিশেষ ভাবে রাজনৈতিক সচেতন। তারা জানে কাকে ভোট দিলে সেটা তাদের জন্য ভাল হবে। আসাদউদ্দিন ওয়েইসি কোন অঙ্কে এখানে লড়তে আসছেন, তা ঠিক বোধগম্য হল না। ৫০ শতাংশের বেশি সংখ্যালঘু বাস করেন এমন বিধানসভা কেন্দ্র বেশ কয়েকটি আছে এই রাজ্যে। ওয়েইসি ভেবেছেন, সেইসব কেন্দ্রগুলি দখল করে নিতে পারবেন তিনি। যদি এমন স্বপ্ন তিনি দেখে থাকেন, বলা যায় সেটা তাঁর দিবাস্বপ্ন। কারণ শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে যদি এই রাজ্যে ভোট হতো তা হলে অনেক আগেই সেইসব আসনগুলো দখল করে নিতেন এই রাজ্যেরই অন্যতম সংখ্যালঘু নেতা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরির জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দ। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় নিজের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। শেষে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য বাধ্য হয়েছেন তৃণমূলে যেতে। এই রাজ্যের সংখ্যালঘুরা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরিকে কখনওই মনে করেননি তিনি তাদের ‘মসিহা’। আর হায়দরাবাদ থেকে উড়ে এসে সেই সংখ্যালঘুদের ‘মসিয়া’ হতে চাইছেন আসাদউদ্দিন ওয়েইসি। সংখ্যালঘুরা ঠিক সময়ে তার যোগ্য জবাব দেবেন অবশ্যই।

রাজনৈতিক বোধবুদ্ধি, বিচার-বিশ্লেষণ সব মানুষের সমান নয়। কিছু মানুষ অত তলিয়ে ভাবেন না। সংখ্যালঘুদের অতি ক্ষুদ্র একটা অংশ অবশ্যই হয়ত ওয়েইসি’র দলকে ভোট দেবেন। তাতে ‘মিম’ তথা ওয়েইসি’র বিন্দুমাত্র লাভ হবে না। সামান্য কটা ভোটে জামানত রক্ষা করা তাঁর দায় হয়ে পড়বে। তা হলে মাঝখানে কী হবে। যেটা হবে তা হল, অনেকাংশেই সুবিধা হবে বিজেপি’র। সংখ্যালঘু ভোট বাদ দিলে বাকি যে ভোট থাকে, সেই ভোট দখল নেওয়ার জন্য সেয়ানে-সেয়ানে লড়াই চলবে তৃণমূল ও বিজেপি’র। আর এই লড়াইয়ে যদি ফলাফল ৫৫-৫০ হয়, তখন নির্ণায়ক হবে বাকি সংখ্যালঘু ভোট। বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করে বলা যায় সেই ভোট অবশ্যই যাবে তৃণমূলের দিকে।

এখন প্রশ্ন, আসাদুদ্দিন ওয়েইসি তথা ‘মিম’ পার্টি এই রাজ্যে কেন আসছে ভোটে লড়তে? অনেক কারণের কথা ‘মিম’ হয়তো ভোটারদের বলবে। কিন্তু যেটা বলবে না, সেটা হল তাদের গোপন অ্যাজেন্ডার কথা। কী সেই অ্যাজেন্ডা? এই রাজ্যে আসার ক্ষেত্রে মিমের অন্যতম অ্যাজেন্ডা হল ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করা’। অর্থাৎ জিততে না পারলেও কিছু সংখ্যালঘু ভোট নিজের দিকে টেনে বিজেপি’র সুবিধা করে দেওয়া। রাজ্যের সংখ্যালঘুদের কাছে ‘মসিয়া’ হতে আসছেন না ওয়েইসি। তিনি আসছেন ২০২১-এ এই রাজ্যে বিজেপি’র জন্য জমি শক্ত করে দিতে। ওয়েইসি বলেছেন, এই রাজ্যের মুসলিমরা ভাল নেই। তাদের ভাল করতে তিনি রাজ্যে আসছেন। ধরে নিচ্ছি, তাঁর এই আবেদনে সাড়া দিয়ে কিছু মানুষ তাঁকে ভোট দেবেন। তাতে যদি তিনি এই রাজ্যে ৫-১০টি আসনে জিতে যান এবং বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তাতে কী লাভ হবে রাজ্যে সংখ্যালঘুদের?

এতদিন এই রাজ্যের সংখ্যালঘুরা যে রাজনৈতিক সচেতনতা পরিচয় দিয়েছেন, এবার তাদের সামনে অত্যন্ত বড় চ্যালেঞ্জ। ওয়েইসি’র মিমকে এই রাজ্যে তাঁরা জায়গা করে দেবেন, না পত্রপাঠ বিদায় করবেন- সেটা দেখা যাবে ২০২১-এর ভোটে। তবে তার আগে বলাই যায়, সংখ্যালঘুদের ভোট পাওয়ার জন্য অনেক ছলাকলার আশ্রয় দেবে ‘মিম’। সংখ্যালঘুদের বিচার করতে হবে তারা ওয়েইসি’র ছলাকলায় ভুলবেন না, নাকি দিনগুলো আরও ভালভাবে থাকার চেষ্টা করবেন। ‘মিম’ কেন এই রাজ্যে আসছে, তা খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে রাজ্যের সংখ্যালঘুরা। যখন তারা বুঝবে যে সংখ্যালঘুদের ভালর জন্য মিমের এই রাজ্যে আগমন নয়, ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করাই’ উদ্দেশ্য। তখন হায়দবাদের ওই দলের পরিচয় হায়দবাদে আবদ্ধ থাকবে। বাংলায় আর শাখা-প্রশাখা বিস্তার করতে পারবে না। সংখ্যালঘুরা পত্রপাঠ বিদায় করে দেবেন এই রাজ্য থেকে। যাতে ভবিষ্যতে আর এই রাজ্যে আসার কোনও সাহস দেখাবেন না আসাদুদ্দিন ওয়েইসি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here