black hole of calcutta

শিবানন্দ পাল: একটা সময়ে ইংল্যান্ডের যে কোনও স্কুলের ছাত্রকে ভারত সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করলে বা ভারত সম্পর্কে কী জানো প্রশ্ন করলে উত্তর দিত, পলাশি, মিউটিনি এবং ব্ল্যাকহোল। ‘পলাশি’ বলত, কারণ, পলাশি ছিল তাদের কাছে নতুন যুগের সূচনাস্বরূপ। ইংরেজরা নতুন দিগন্ত পেয়েছিল। ‘মিউটিনি’ বলত এ জন্য যে, তারা এই ঘটনাকে মনে রাখত ইংরেজদের ওপর ভারতীয় সিপাহিদের নারকীয় অত্যাচারের কাহিনি হিসেবে। কিন্তু ইংরেজরা যে সেই সময় কীভাবে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছিল, সে সব কথার কোনও উল্লেখ তাদের ব‌ইয়ে থাকত না। কিন্তু ব্ল্যাকহোল! ব্যাপারটা কী?তখন তো তেমন কোনও মহাজাগতিক ঘটনা ঘটেনি! তা হলে কি অন্য কিছু? ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্ম থেকে ব্রিটিশ শাসনের অবসান… এই সাড়ে তিনশো বছরের ইতিহাসে এই ব্ল্যাকহোল ঘটনার তাৎপর্যই বা কী? সুভাষচন্দ্র বসু ছাড়া ভারতের জাতীয়তাবাদী কোনও নেতা পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ প্রশাসকের সামনে এই প্রশ্ন তোলেননি। ঘটনার তাৎপর্য এটাই যে, ‘ব্ল্যাকহোল’ ঘটনা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই একটি ট্রাজেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

black hole
কলকাতা দুর্গের সেই জায়গা, ব্ল্যাকহোল।

কেন ট্রাজেডি? জানতে হলে পাঠককে কিছু সময় দিতে হবে। মন দিয়ে পাঠ করতে হবে এই কাহিনি। তৎকালীন সময়ে যে কোনও সময় কাউকে শাস্তি দেবার জন্য প্রশাসনের সমস্ত প্রতিষ্ঠানে একটি ‘সাময়িক কারাকক্ষ’ অর্থাৎ ‘ব্ল্যাক হোল’ রাখা হত। ‘ব্ল্যাকহোল’ শব্দটির ব্যবহার খুবই সাধারণ ছিল। কলকাতার দুর্গে সে রকম একটি ‘সাময়িক কারাকক্ষ’ অর্থাৎ ‘ব্ল্যাকহোল’ ছিল। যেমন সব দুর্গে থাকে। প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবেই এটি সর্বত্র রাখা হত। ১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজদৌল্লার কলকাতা আক্রমণের সময় ইংরেজ প্রশাসকের দল তৎকালীন কাউন্সিলের কনিষ্ঠ সদস্য হলওয়েলের হাতে কলকাতা দুর্গ রক্ষার ভার সমর্পণ করে নিজেরা ভয়ে মহিলা ও শিশুদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় পালিয়েছিল। হলওয়েল ২৩ জুন নবাব সিরাজদৌল্লার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজরা প্রচার শুরু করে দেয়, কলকাতা দুর্গে ১৮ ফুট লম্বা, ১৪ ফুট চওড়া একটি ঘরে ১৪৬ জন ইংরেজকে বন্দি করে রাখা হয়। ২০ জুন তাদের জোর করে প্রবেশ করানো হয়। পরদিন সকালে অর্থাৎ ২১ জুন দেখা যায় ওই ঘরে জীবিত অবস্থায় রয়েছে মাত্র একজন মহিলা সহ ২৩ জন ইংরেজ।
বাকিরা সকলে মারা গিয়েছে।

black hole
এই সেই জন জেফানিয়াহ হলওয়েল।‘ব্ল্যাকহোল’-এর মিথ্যা কাহিনির রচয়িতা।

হলওয়েলের কল্যাণে এই গল্প ভারতবর্ষ জুড়ে প্রচারিত হয় এবং কাহিনিটি খুব অল্পদিনের মধ্যে অমরত্ব পেয়ে যায়। কারণ, রাজা এটা বলেছেন… রাজা যা বলেন… লোকে জানে সে… সব সত্যি কথা! জন জেফানিয়াহ হলওয়েল আসলে ‘ইন্ডিয়া ফ্যাক্টস’ নামে একটা ব‌ই লেখেন। সেই ব‌ইয়ে এই ঘটনা এবং নিজেকে বেঁচে যাওয়া বন্দিদের একজন বলে বর্ণনা করেন এমনভাবে যে, তিনি হলেন একজন বীরযোদ্ধা। কলকাতা (ফোর্ট উইলিয়াম) দুর্গের পূর্বদ্বারের সামনে রাষ্ট্রীয় খরচে নিহতদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হয়ে গেল।

black hole
কল্পিত ‘নিহতদের’ স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ।

বিতর্ক করার আগে অবশ্য ভাবতে হয়, বিষয়টি ইংল্যান্ডে স্কুলছাত্রদের অবশ্যপাঠ্য বিষয় ছিল কেন? আবার পরবর্তী সময়ে বিষয়টি একেবারেই গুরুত্বহীন হয়ে গেল কেন? তা হলে কি কালের নিরিখে সম্পূর্ণ মিথ্যা কাহিনি মারা গেল? বিষয়টি তা নয়। ওই ঘটনার প্রয়োজন ফুরিয়েছিল। একটি কাহিনি, একটা ঘটনার কিছু মূল্য থাকে। সেই কাহিনি মূল্যহীন হলে তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। নিকোলাস ডার্ক লিখেছেন, কাল্পনিক এই কাহিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বীর বণিক যোদ্ধাদের ওপর চরম অত্যাচারের প্রবাদকাহিনি হয়ে উঠেছিল। প্রচারটা ছিল এমনই। প্রচারে কাজ হয়! কিন্তু তখন তো এত মিডিয়ার রমরমাও ছিল না। তা হলে কীভাবে হল?

BLACK HOLE
নবাব সিরাজ-উদ-দৌর্লা। তাঁকে বদনাম করতেই করা হয়েছিল অপপ্রচার।

ইংল্যান্ডে ফেরার পথে ‘সাইরেন’ নামে জাহাজে বসে হল‌ওয়েল গল্পটা লিখেছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বীর বণিক যোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ কাহিনি হিসেবে গল্পটা লেখা। ব্রিটিশরা কীভাবে আক্রান্ত হয়, সেটাই বড় করে দেখানো হয়। সহানুভূতি আকর্ষণ করার জন্য মহিলা এবং শিশুদের কথা জুড়ে দেওয়া হয়। গল্প এমনভাবে দাঁড় করানো হয়, যেন ইংরেজরা খুবই সাধুপুরুষ! আক্রান্ত হয়েই দেশটাকে দখল করতে ষড়যন্ত্র করতে বাধ্য হয়েছে। নইলে ওদের ব্যবসা-বাণিজ্য করতে খুবই সমস্যা হচ্ছিল। ইংরেজ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না! গোলা, বারুদ, বন্দুক, কামান… সৈন্যদল থাকতে একটা গল্পের প্রয়োজন হল? আধিপত্যবাদের সীমা বাড়িয়ে না চললে আবারও এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হতে পারে… এমনই মনোভাবের প্রকাশ!

black hole
চিত্রে ব্ল্যাকহোলের অবস্থান।

রাজকীয় আবেগের ভাববিন্যাসকে কাজে লাগিয়ে ভারতে ইংরেজদের আধিপত্য বিস্তারের সামাজিক প্রয়াসে ‘ব্ল্যাকহোল’-এর কাহিনি দারুণভাবে সফল হয়েছিল। ব্রিটিশ রাজশক্তি যখন ভারত শাসন করেছে, ‘ব্ল্যাকহোল’ কাহিনি তখন ইংল্যান্ডের বিদ্যালয়স্তরের প্রতিটি শিক্ষার্থীর কণ্ঠস্থ ছিল। এ ছিল এক স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উনিশ শতকের গোড়া থেকে পাঠ্যবইতে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে স্থান পেয়েছে। যদিও প্রথম অর্ধ শতাব্দী জুড়ে এই ঘটনা সরকারি প্রতিবেদনের বাইরে তেমন গুরুত্ব পায়নি। জে এইচ লিটিল ১৯১৫-১৬ সালে ঘটনার সত্যতা নিয়ে যখন প্রশ্ন তুললেন, বললেন, হলওয়েল, ক্রুক প্রমুখের ‘বানানো’ এই গল্প। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মার্চ এশিয়াটিক সোসাইটির সভায় এই কাহিনিকে অলীক এবং মিথ্যা প্রচার বলে মান্য করা হল। লর্ড হেস্টিংস (১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে) এই স্মৃতিসৌধ ভেঙে দিতে বাধ্য হলেন। অবশ্য এ ধরনের স্মৃতিসৌধ তৈরি করার জন্য যারা লজ্জা পায় না, ভেঙে দেবার সময় লজ্জা পাবে কেন? আর‌ও আশ্চর্য! ভারতশাসন অবসানের অব্যবহিত পরেই এই কাহিনিকে পাঠ্যবইয়ের অন্ত-টীকায় নামিয়ে এনে পারসিভাল স্পিয়ার এই ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য করলেন, ‘হলওয়েলের মতো অনির্ভরযোগ্য ব্যক্তির… বর্ণনাশক্তির ফসল’।

না কোনও প্রতিবাদ ছিল না। একটি মিথ্যা কাহিনি একশো বছর অতিক্রান্ত হবার পর পুরোপুরি মিথ্যা… মৃত হয়ে গেল।গুরুত্বের অবস্থান থেকে গুরুত্বহীনতার পথে তথাকথিত তথ্যের এই যে বিবর্তন, ইতিহাসের বহু জায়গায় জ্ঞান ও ক্ষমতার পারস্পারিক মেলবন্ধনের সম্পর্কের পরিচয় বহন করে আজও। ‘ব্ল্যাকহোল’-এর মতো অনেক কাহিনি গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে জন্ম নিয়েছে। অন্ধকারের গর্ভে যে তথ্যের জন্ম হয়, তা অন্ধকারেই মিলিয়ে যায়। কিন্তু মারা যাবার আগে সমূহ ক্ষতি করে যায়। বিপদ সেটাই। তাই সাধু সাবধান! আপনি কি প্রকৃত‌ই সত্যসন্ধানী? ভাববেন অন্তত একবার!

(ছবি: অন্তর্জাল)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here