মুকেশ কুমার, কোচবিহার: সে অনেক দিন আগের কথা। ইতিহাস তার দিনক্ষণ মনে রাখেনি। তবে নয় নয় করে পাঁচশো বছর আগে তো বটেই। কোচবিহারের মহারাজা বিশ্বসিংহ তখনও রাজা হননি। তিনি তখন নেহাতই বালক। বয়স মাত্র নয়। তার খেলার সঙ্গীসাথি ছিল গ্রামেরই কিছু ছেলে। কেউ তার থেকে বড় কেউবা ছোট। দলের সর্দার কিন্তু সেই বিশ্বসিংহ। একদিন খেলার ছলে একটা শুকনো ময়না কাঠের ডাল আর কিছু শুকনো বাঁশের কঞ্চি নিয়ে তা মাটিতে পুঁতে সেই ডালপালা সমন্বিত বিগ্রহকেই দেবী দুর্গা কল্পনা করে পুজো করতে থাকে। বনের ফলমূল আর ফুলই ছিল সেই পুজোর উপাচার। নিজেদের মত করে পুজো শেষে বিশ্বসিংহের মনে হল বলি দিতে হবে দেবীকে। নাহলে পুজো অসমাপ্ত থেকে যাবে, দেবী সন্তুষ্ট হবেন না। বিশ্বের সঙ্গে তখন তার তিনভাই আর কয়েকজন বন্ধু। কিন্তু কি বলি দেওয়া হবে, কি দিয়ে বলি দেওয়া হবে আর কে বলি দেবে তা নিয়ে দেখা দিল সমস্যা। কুছ পরোয়া নেহি, বিশ্ব নিজেই ঠিক করে নিল সঙ্গের সঙ্গীসাথিদের মধ্যে থেকে সবথেকে ছোট আছে যে তাকেই দেওয়া হবে বলি। সে বলি দেওয়া হবে কাশফুল গাছের ডাল দিয়ে, আর বলি দেবে বিশ্বসিংহ নিজের হাতেই।

তখন আশ্বিন মাস, শুক্লা পক্ষ। যে কাশ ফুলের ডাল বাচ্চা ছেলেও হাত দিয়ে মটকে ভেঙ্গে দিতে পারে সেই কাশ ফুলের ডাল হয়ে উঠল বিশ্বের দেবী পুজোর খড়গ। আর সেই খড়গের ঘায়ে সত্যি সত্যি বিশ্বের সঙ্গী এক বাচ্চা ছেলের ধড়মস্তক আলাদা হয়ে রক্তের বন্যা বইয়ে দিল। সঙ্গী মারা গিয়েছে, তার মাথা দেহ আলাদা হয়ে পড়ে আছে, এসব দেখে ভয়ে তখন বিশ্বকে ছেড়ে পালালো তার ভাই থেকে শুরু করে সঙ্গীরা। রয়ে গেল একা বিশ্ব। কথিত আছে সেই সময় বিশ্বসিংহের সময় আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা। জানিয়ে দেন, বিশ্বের পুজোয় তিনি সন্তুষ্ট। তার বরে বিশ্ব বড় হয়ে হবে রাজা। আর প্রতি বছর আশ্বিন মাসের শুক্লা পক্ষে দুর্গাপুজোর সময় যথাযথ ভাবে সম্পন্ন করতে হবে তার পুজো। বিশ্বসিংহ হয়েছিলেন কোচবিহারের মহারাজা। তিনিই রাজা হয়ে কোচবিহারের ডাঙরাই মন্দিরে শুরু করেন বড়দেবীর পুজো। বিশ্বসিংহের আরাধ্য দেবী দুর্গাই সেখানে বড়দেবী নামে পূজিত হন। প্রতি বছর শ্রাবন মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে যূপচ্ছেদন পুজোর মধ্যে দিয়ে কোচবিহারে বড়দেবীর পুজোর সূচনা হয়। এবছরও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। গত শনিবার সকালে হয়ে গেল সেই পুজো।

বড়দেবী কোচবিহার রাজপরিবারের কূলদেবী। গত পাঁচশো বছর ধরে রীতি মেনে সেই পুজো হয়ে আসছে। এখনও বড়দেবীর মূর্তি গড়ে তোলা হয় ময়না কাঠ দিয়ে। শ্রাবন মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে সেই ময়নাকাঠকে বিশেষ রীতি মেনে পুজো করা হয়, এই পুজোকেই বলা হয় যুপচ্ছেদন পুজো। এরপর সন্ধ্যায় এই ময়নাকাঠকে পালকিতে চাপিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে নিয়ে যাওয়া হয় কোচবিহার রাজাদের কূলদেবতা মদনমোহনের মন্দির ‘মদনমোহন বাড়ি’তে। একমাস সেখানে পুজো হবে। এরপর রাধা অষ্টমী তিথিতে সেই ময়নাকাঠ ফের নিয়ে আসা হবে বড়দেবীর মন্দিরে। সেখানেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠবে দেবীর প্রতিমা। তবে দুর্গাপুজোর সময় পুজো হলেও এই দেবীর প্রতিমা প্রচলিত দূর্গাপ্রতিমা থেকে অনেকটাই আলাদা। এখানে দেবীর সঙ্গে লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, ও সরস্বতী থাকেন না। থাকেন অসুর, সিংহ ও তার দুই সখী জয়া ও বিজয়া। দেবী ঘোর রক্তবর্ণা, অসুর সবুজ রঙের। বড়দেবীর যুপচ্ছেদন পুজোর মধ্যে দিয়ে কার্যত কোচবিহারে শুরু হয়ে যায় পুজোর মরশুম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here