rat and human

যদুনাথ মুখোপাধ্যায়: গত চার-পাঁচদিন বাংলা কাগজে ক্যানসার নিকেশের গরমাগরম খবর! কলকাতার এক সরকারি হাসপাতালের ক্যানসার-বিশেষজ্ঞরা নাকি ওরাল কেমোথেরাপি প্রয়োগ করে দুই ক্যানসার রোগীর স্টেজ ফোর, তাও আবার ছড়িয়ে পড়া ক্যানসার একদম ‘ভ্যানিশ’ করে দিয়েছেন। অন্য এক খবর, আগেরদিনই চোখে পড়েছিল যে, স্তন এবং ফুসফুসের ক্যানসারকে টা-টা বাই-বাই করার ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলেছেন এক বাঙালি গবেষক। কালো জিরের মধ্যেই নাকি সেই ক্যানসার-নিকেশের ম্যাজিক বুলেটের উপাদানের সন্ধান পেয়েছেন তিনি। ইঁদুরের ক্যানসারকে এই বুলেট প্রয়োগ করে নিকেশ করার ক্ষেত্রে নাকি একশো শতাংশ সাফল্য পেয়েছেন ওই গবেষক।

খবর দু’টি পড়ে ক্যানসারের ‘আনসার’ পেশ করার জন্য পরিত্রাতা বাঙালি গবেষকের (?) সাফল্যের ঢাক পেটানো দেখে গল্পের গরুর গাছে চড়ার কথা মনে পড়ছিল। বিগত প্রায় পাঁচ দশকে ক্যানসার গবে(ট)ষণার এমনই সাফল্যের হাস্যকর গপ্পো কয়েকশো বার শোনানোর নিট প্রাপ্তি কেন প্রতিবারই ‘বিগ জিরো’ই হয়েছে, হবেও, এই বিষয়ে পর্বতপ্রমাণ জ্ঞানগর্ভ নিবন্ধ, পুস্তক সহজলভ্য হলেও, বিজ্ঞাপন-নির্ভর বাজারু মিডিয়া এমনই বোকাসোকা খবর পরিবেশনের জন্য দায়বদ্ধ।
আসুন, উপরে যে আশাবাদী ক্যানসার-মুক্তির খবরের উল্লেখ করেছি, গাদটি ছেড়ে তার সারটি বোঝা যাক। এমনকী একদম প্রাথমিক স্তরের ক্যানসার চিকিৎসায় সাফল্য (নিরাময় অর্থে) প্রসঙ্গে যখন ক্যানসার চিকিৎসার তথাকথিত স্বর্গভূমি আমেরিকার পরিণতি ‘নারকীয়’ কেন, এই প্রশ্ন ওদেশের শক্তিশালী গণমাধ্যমে বার বার আলোচিত হচ্ছে, সেখানে কলকাতার সরকারি হাসপাতালে একদম শেষধাপের (স্টেজ ফোর) ক্যানসার হেলায় ঠিক হবার সংবাদের সত্যতা, আমাদের এক আশ্চর্যজনক ক্যানসার সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

প্রাজ্ঞ বিশারদরা এই ‘ঠিকের’ যে চমকপ্রদ, প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার সারকথা হল: বীভৎস ক্যানসার চিকিৎসার সাফল্য আদৌ উল্লেখযোগ্য না হলেও, কিছু কিছু মরণাপন্ন ক্যানসার রোগীর ওই একই চিকিৎসায় সুস্থ হবার কারণটি নিহিত থাকে এমন রোগীর জৈবিক বৈশিষ্ট্য এবং তার ক্যানসারটির নিজস্ব জৈবিক বৈশিষ্ট্য বা নেচার-এর ওপর। এক্ষেত্রে চিকিৎসা নিমিত্তমাত্র। সামান্যতম কাণ্ডজ্ঞান থাকলে বিষয়টা না বোঝার কথা নয়। যাদের ক্যানসার পরিপক্ক স্তরে পৌঁছনোর অনেক আগেই চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক পরিণতি ঘটে, স্টেজ ফোর-এর ক্যানসার ‘ভ্যানিশ’ হবার ঘটনা সেক্ষেত্রে তো প্রাজ্ঞ বিশারদের ব্যাখ্যাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। ক্যানসার গবে(ট)ষণার হাস্যরস উদ্রেককারী অজ্ঞতার বিষয়ে বিস্তারিতভাবে লেখার অবকাশ রয়েছে। আপাতত বাজারু মিডিয়ার ক্যানসার-নিকেশের গপ্পো নিয়ে বলা যাক।

মানুষের মনে ক্যানসার-মুক্তির অলীক, সর্বদা অসত্য আশাবাদ জাগিয়ে রাখার জন্য মিডিয়া-পণ্ডিতরা বিগত অন্তত পঞ্চাশ বছরে ইঁদুরের ক্যানসার-মুক্তির খবর নিয়মিত ছেপেই চলেছে। ক্যানসার ধান্দার নিয়ন্ত্রক রাঘববোয়াল ওষুধনির্মাতাদের স্বার্থসিদ্ধির এমন গবে(ট)ষণার অসারতা প্রসঙ্গে অসংখ্য পুস্তক, রিসার্চ পেপার, এমনকী সন্মানিত গণমাধ্যমেও বহুবার তীব্র সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞাপন-নির্ভর মিডিয়া-পণ্ডিতরা জেনেবুঝেও তার উল্লেখ না-করার জন্য দায়বদ্ধ। কাদের স্বার্থে, বলা নিষ্প্রয়োজন।
ল্যাব গ্রোন মাইস ক্যানসার বা গবেষণাগারে উৎপাদিত ইঁদুরের ক্যানসার যেহেতু মানবশরীরে স্বয়মেব, সহজাতভাবে উৎপন্ন ক্যানসার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কেন, প্রাজ্ঞ দুই ভারতীয় ক্যানসার গবেষক ড. মনু কোঠারি এবং ড. লোপা মেহতা ১৯৭৩ সালেই, পেল্লাই সাইজের, তাঁদের হাজার পৃষ্ঠার আকরগ্রন্থে (The Nature of Cancer) ব্যাখ্যা করেছিলেন। বিশ্বচর্চিত এবং বিশেষভাবে উল্লিখিত সেই পুস্তকে গবেষণাগারে ইঁদুরের ক্যানসার নিরাময়ের সাফল্য কেন মানুষের ক্যানসারের চিকিৎসায় কোনও কাজে আসবে না, সেই কথা কোঠারি এবং মেহতা প্রাঞ্জলভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। মিডিয়া-পণ্ডিতরা সেই সত্য মানুষকে জানানোর বিনিময়ে শ্রেষ্ঠীদের রোষানলে পড়তে এবং বিজ্ঞপনের মোটা দাদন খোয়ানোর ঝুঁকি নিতে চাননি। তারা সচেতনভাবেই এই পাপকর্মের ভাগিদারি করার জন্য দায়বদ্ধ।

কেন বলছি এই কথা? মাত্র কয়েকবছর পিছিয়ে চলুন। সাল ২০১১-তে আমেরিকা প্রবাসী বাঙালি ক্যানসার-বিশেষজ্ঞ সিদ্ধার্থ মুখার্জিকে কাঁধে তুলে খুব নেচেছিল মিডিয়া, নিশ্চয়ই মনে থাকার কথা আপনাদের। প্রায় ছয়শো পাতার সুললিত আলঙ্কারিক ইংরেজিতে লেখা তাঁর পুস্তকের জন্য সিদ্ধার্থকে বিশিষ্ট পুরস্কার পুলিৎজার সম্মান দেওয়া হয়েছিল। সেই পুস্তক, ‘এম্পারার অব অল মেলাডিজ– আ বায়োগ্রাফি অব ক্যানসার’ প্রসঙ্গে মিডিয়ার নাচানাচির কথাও নিশ্চয়ই মনে আছে আপনাদের।
মিডিয়ার পণ্ডিত কলমচিদের অসংখ্য প্রতিবেদনের একটিতেও কিন্তু ক্যানসার-বিরোধী যুদ্ধের অন্যতম সেনাপতি সিদ্ধার্থের এই স্বীকারোক্তির উল্লেখ ছিল না যে, প্রায় পাঁচ হাজার বছরের প্রায়োজিত প্রতিটি ক্যানসার-যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে প্রতিবারই শেষহাসিটা ক্যানসারই হেসেছে। কেন এই ভবিতব্যকে কখনও বদলানো যাবে না, সিদ্ধার্থ স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন। লিখেছেন, ‘ক্যানসারটা আমাদের জিন-সজ্জায় সেলাই করে রাখা থাকে (Cancer is stitched in our genomes)।
নটেগাছটি মুড়লো বটে, কিন্ত অত্যন্ত জরুরি কথাটা তো না বললেই নয়। আমেরিকান দাম্ভিক মানসিকতা আর মূল্যবোধের কারণে বঙ্গপুঙ্গব সিদ্ধার্থ, ভারতীয় হিসেবে গর্ববোধ, শ্লাঘা অনুভব করার ঠিক বিপরীত অবস্থানে অটল থাকার কারণে ১৯৭৩ সালেই দুই ভারতীয় বিশারদ যে এই সত্যে উপনীত হয়েছিলেন, সে কথার উল্লেখ করা উচিত মনে করলেন না। হোয়াইট স্কিন ইজ দ্য গডস স্কিন– এই শিক্ষা বেচারা ভুলতে পারেননি যে!

ভারতের এই দুই প্রাজ্ঞ ক্যানসার গবেষক সেই ১৯৭৩ সালেই আধুনিক চিকিৎসার দু’শো বছরের ক্যানসার-বিরোধী জেহাদের সারসংক্ষেপ করে এই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে, কুবেরের সমস্ত অর্থভাণ্ডার উজাড় করে দিলে অথবা জরাসন্ধের সমস্ত অস্ত্রভাণ্ডার প্রয়োগ করলেও ক্যানসারকে কখনও নতিস্বীকার করানো সম্ভব হবে না। তাঁরা এই দুঃখজনক বাস্তবতাকে দু’টি অ্যাক্রোনিম (আদ্যক্ষর সহযোগে বানানো শব্দ) ব্যবহার করেছিলেন: *OOOO= Oceanic Outputs O (zero) Outcome. এবং FRUITFUL= Funeral Rates Unchanged Inspite of Therapeutic Fancies/ Fads/ Forces/ Forms UnLimited. এরই সঙ্গে ওই প্রাজ্ঞ গবেষকদ্বয়, তাঁদের পাঁচ দশকের প্রায়োগিক অভিজ্ঞতার ঝুলি উজাড় করে নিজেদের অতি নিকটজন সহ অসংখ্য মানুষের ক্যানসার ম্যানেজমেন্ট-এর পরিণতির উদাহরণ তুলে ধরেছেন। ক্যানসারকে সঙ্গে নিয়ে, কেবলমাত্র তার কারণে দেখা দেওয়া উপসর্গের চিকিৎসায় (যাকে মেডিকেল শব্দাবলিতে প্যালিয়েশন বা উপশমকারী চিকিৎসা বলে) রোগীকে অপেক্ষাকৃত বেশিদিন সুস্থ, সক্রিয়, কর্মঠ রাখা যায়।

অনুসন্ধিৎসু, আগ্রহীদের অনুরোধ, মিডিয়ার ক্যানসার-প্যাথির চক্করে সর্বস্বান্ত মানুষকে ক্যানসারের শান্তস্বরূপ দর্শনে সাহায্য করুন। আমাদের ওয়েবসাইট www.cancerfundamentaltruth.com এবং Dr. Manu Kothari Fan Club (Facebook) দেখুন এবং অন্যদেরও দেখতে বলুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here