নিজস্ব প্রতিবেদক, পুরুলিয়া: বলরামপুরের সুপুরডি গ্রামের ত্রিলোচন মাহাতোর খুনের তদন্তে নেমে আজ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। পাঞ্জাবি মাহাতো নামে(৪৫) ওই ব্যক্তির বাড়ি সুপুরডি গ্রামেই। গত ২৯শে মে বলরামপুর থেকে বাড়ি ফেরার পথেই নিখোঁজ হয় যায় ত্রিলোচন। ৩০শে মে ভোর পাঁচটা নাগাদ ত্রিলোচন মাহাতোর ঝুলন্ত দেহ মেলে গ্রামের কিছুটা দুরের জঙ্গলে। যে দিন নিখোঁজ হয় সেদিন ত্রিলোচন বাড়ির লোককে ফোন করে জানিয়েছিল পাঁচ জন মিলে তাকে স্থানীয় আট কাঠার জঙ্গলে বেঁধে রেখেছে এবং তাকে খুব মারছে। সন্দেহ করা হচ্ছে ওই দুষ্কৃতীরাই হয়তো ত্রিলোচনকে তার বাড়িতে ফোন করিয়েছিল। এদিকে যে পাঞ্জাবি মাহাতকে পুলিশ ধরেছে সেও ত্রিলোচনকে খোঁজার দিন গ্রাম এবং পরিবারের লোকের সঙ্গেই ছিল বলেই জানিয়েছে ত্রিলোচন মাহাতোর পরিবার। রাত দেড়টা নাগাদ জঙ্গলে খোঁজার সময় পাঞ্জাবির কাছে একটি ফোন আসলে সে জানায় তার গরুকে খাবার দিতে হবে। এত রাতে গরুকে খাবার দেবার কথা বলায় তা শুনে অনেকের মনেই সন্দেহ হলেও কেউ আর এই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরের দিন ভোর বেলা ত্রিলোচন মাহাতোর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়।

সন্দেহ করা হচ্ছে পাঞ্জাবি মাহাতোর ঘরেই হয়তো ত্রিলোচনের দেহ খুন করে রাখা হয়েছিল। পরে জঙ্গলে খোঁজাখুঁজি ফাঁকা হতেই ভোরের দিকে দেহ নিয়ে গিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সুপুরডি গ্রামের বস্তির দিকে পাঞ্জাবি মাহাতর বাড়ি হলেও, যেখানে ওর দেহ উদ্ধার হয় তার ঢিল ছড়া দূরত্বে পাঞ্জাবির একটি বাড়ি রয়েছে। তাই ওই বাড়িটিও সন্দেহের তালিকায় রেখেছে সিআইডি। হতে পারে ওই বাড়িতেই ত্রিলোচনকে রাখা হয়েছিল। বাড়ির লোকের কাছে ফোন আসে ৭:৪৪মিনিট থেকে ৮টার মধ্যে। তারপরেই বেশ কয়েকটি মোটর সাইকেল করে ত্রিলোচনের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে গ্রামবাসীরা। সঙ্গে ছিল বলরামপুর থানার পুলিশ। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও ত্রিলোচনকে পাওয়া যায় নি। প্রতিটি জায়গা স্থানীয় জঙ্গলেও খোঁজার পরেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। অথচ পরের দিন গ্রাম থেকে কিছটা দূরেই ঝুলন্ত দেহ পাওয়া গেল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুপুরডি গ্রামের এক বাসিন্দা জানান,’আমরা কয়েকশ লোক মিলে সুপুরডি গ্রাম থেকে কিছুটা দুরের গ্রাম পাঁড়দ্বা, হাড়জোড়া গ্রামেও খুঁজেছিলাম ওকে। কিন্তু কোনো সন্ধান পাইনি। আবার দেহ পরের দিন ভোর বেলা গ্রামের কিছুটা দূরেই ঝুলন্ত দেহ পাওয়া গেল। এতে অনেক কিছুই জলের মতো পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে। পাঞ্জাবি মাহাতো আগে তৃণমল করলেও ত্রিলোচন মাহাতোর ঘটনার পর বিজেপি সঙ্গে মিলে মিশে থাকতে শুরু করেছিল। কিন্তু ত্রিলোচনের পরিবার এবং গ্রামবাসীরা পাঞ্জাবি মাহাতো কে সন্দেহ থেকে বাদ দেয় নি।

যদিও বলরামপুর থানার অভিযোগের তালিকায় পাঞ্জাবির নাম নেই। অন্যদিকে আগামীকালই এই ঘটনা সিবিআই তদন্তের জন্য হাইকোর্টে আপিল করতে চলেছে ত্রিলোচনের পরিবার। কয়েকদিন ধরেই তারা কলকাতায় রয়েছেন। তার আগেই সিআইডি একজনকে গ্রেপ্তার করে দেখিয়ে দিল। তার মানে কি যাতে এই ঘটনা সিবিআই এর হাতে না যায় তার চেষ্টা চালাচ্ছে সিআইডি। প্রশ্ন জেলার ওয়াকিবহল মহলের। অন্যদিকে সামনের সপ্তাহের ২৮শে জুন অমিত শাহ আসছেন পুরুলিয়ায়। তার আগেই এই গ্রেপ্তারে অনেক কিছুই দেখছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল। অন্যদিকে সিআইডি সুত্রে জানা গিয়েছে, তারা পাঞ্জাবিকে গ্রেফতার করলেও তারা এখনও নিশ্চিত নন, অভিযুক্ত কেন ত্রিলোচনকে খুন করেছে। এক শীর্ষ সিআইডি আধিকারিক জানিয়েছেন,’আমরা বেশ কয়েক দিন ধরে সুপুরডি গ্রামে তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারি, যে দিন ত্রিলোচন নিখোঁজ হয়ে যান, সে দিন এই পাঞ্জাবির আচরণ ছিল সন্দেহজনক। সে দিন ঘন ঘন তাকে ফোনে কথা বলতে দেখা যায়। সে দিন যখন গ্রামের সবাই ত্রিলোচনকে খোঁজাখুঁজি করছে, তখন সেই দলে ছিল না সে। সেই সন্দেহ থেকেই তাকে জেরার জন্য ডাকা হয়।’

সিআইডির দাবি, জেরার মুখে অসংলগ্ন কথা বলতে থাকে পাঞ্জাবি। এক সিআইডি আধিকারিক জানান,’পাঞ্জাবি প্রথমে দাবি করেছিল তার কোনও ফোন নেই। অথচ আমরা একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী পেয়েছি যারা দেখেছেন ওকে মোবাইলে কথা বলতে। ওর বাড়িতে তল্লাশি চালানোর সময় দুটো ভাঙা মোবাইল আর সিমকার্ডও পাওয়া গিয়েছে। এর পরই জেরায় খুনের সঙ্গে নিজের যোগ স্বীকার করে নেয় পাঞ্জাবি।’ সিআইডির ডিআইজি অপারেশন নিশাদ পারভেজ জানান,’কেন খুন করা হয়েছে ত্রিলোচনকে সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এটা জানা গিয়েছে আরও অনেকে এই খুনের সঙ্গে জড়িত। তাদের চিহ্নিত করা হবে খুব শীঘ্রই। আমরা উদ্ধার হওয়া মোবাইল আর সিমকার্ড ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here