kolkata news
Highlights

  • রাস্তায় নেমে হাত পাততে বাধ্য হলেন বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকরা
  • মালিকপক্ষ বাগান ছেড়ে চলে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক
  • অর্থাভাবে চরম দারিদ্রতায় দিন কাটছে ওই বন্ধ চা-বাগানের শ্রমিকদের


নিজস্ব প্রতিনিধি, আলিপুরদুয়ার:
রাস্তায় নেমে হাত পাততে বাধ্য হলেন বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকরা। এমনই দৃশ্য দেখা গেল বন্ধ মধু চা বাগানে। মালিকপক্ষ বাগান ছেড়ে চলে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। অর্থাভাবে চরম দারিদ্রতায় দিন কাটছে ওই বন্ধ চা-বাগানের শ্রমিকদের। অর্থাভাবে দু’বেলা খাবার জোগাড় করাই বড় দায় হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে মালিকপক্ষ না থাকায় চা বাগানের স্বাস্থ্য পরিষেবা একেবারেই বন্ধ। খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে অপুষ্টি ও নানান রোগে জর্জরিত চা বাগানের শ্রমিকরা। মৃত্যু-মিছিল চলছে বিভিন্ন বন্ধ চা বাগানে। এখন অনেকে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত।

এমনই এক মারণ রোগে আক্রান্ত ১৩ বছর বয়সী শিভম তুড়ি। শিভমের বাড়ি বন্ধ মধু চা বাগানের লালা লাইনে। শিবের বাবা দিনমজুর। ৬ মাস আগে খাবার খেতে খেতে হঠাৎ দাঁত লেগে তার জিভ কেটে যায়। শিশুমন থাকায় সেই ঘটনা কাউকেই জানায়নি সে। বেশ কিছুদিন পর মুখে ঘা হয়ে গেলে বাড়ির লোক ঘটনাটি জানতে পারে। চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় মধু চা বাগান এলাকার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। সেখান থেকে জেলা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি শিবমের। দিনে দিনে ওই ঘা আরও বাড়তে থাকে। অবশেষে কোনওরকমে টাকা পয়সা জোগাড় করে শিবমকে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতার এক হাসপাতালে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাড়িতে নিয়ে আসা হয় শিবমকে। পরবর্তীতে জানা যায় তার মুখে ক্যান্সার সংক্রমণ হয়েছে।

প্রথম দফার চিকিৎসা করতেই সব সঞ্চয় খুইয়েছে তার পরিবার। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা করতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার নির্দেশ দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু চিকিৎসার জন্য তো অর্থ প্রয়োজন। সেই অর্থ তারদের নেই। আত্মীয় স্বজনের কাছে হাত পেতেও পাওয়া যায়নি তেমন অর্থসাহায্য। তারাই বা দেবেন কোথা থেকে। তাদেরও তো একই দশা। বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরণ দারিদ্রতায় দিন কাটছে বন্ধ চা বাগানের প্রত্যেকের। এমনকি শিবমের পরিবার স্থানীয় বিধায়ক ও সাংসদের কাছে গিয়েও কোনও সাহায্য পাননি।

এই ঘটনা জানাজানি হতেই এগিয়ে আসেন বন্ধ মধু চা বাগানের অন্যান্য প্রতিবেশীরা। অর্থাভাবে শিবম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে তা হতে দেওয়া যাবে না। প্রতিবেশীদের উৎসাহে শিবমের চিকিৎসার জন্য অবশেষে পথে নামতে বাধ্য হন শিবমের পরিবার। সঙ্গী হয় বন্ধ মধু চা বাগানের জনাকয়েক শ্রমিকবন্ধু। রাস্তায় নেমে জনে জনে সাধারণ মানুষের কাছে হাত পাততে শুরু করেন শিবমের চিকিৎসার জন্য। যে করেই হোক শিবমকে চিকিৎসা করাতে হবে। শিবের বাবা মহাবীর তুড়ি বলেন, বাগান বন্ধ, কোনও উপার্জন নেই। কোনওমতে শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাই। আমার বাবা ও সংসার চালানোর জন্য ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজ করছে। ৬ মাস আগে শিবরামের মুখে ঘা হয়। এতদিন জমানো সব অর্থ দিয়েই ওর চিকিৎসা করিয়েছি। চিকিৎসা করাতে গিয়ে জানতে পারি ওর মুখে ক্যান্সার সংক্রমণ হয়েছে। উন্নত চিকিৎসা করাতে আমরি হাসপাতাল নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু এত টাকা পাব কোথায়? সাংসদ, বিধায়ক সকলের কাছে হাত পেতেছি। কেউই কোনও সাহায্য করেননি। হাসপাতালে নিয়ে যেতে যে খরচটুকু প্রয়োজন সেটাও, আমাদের কাছে নেই। বাধ্য হয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়ে পথে ভিক্ষা করতে বেরিয়েছি। পথচলতি মানুষরা আমার ছেলের অবস্থা শুনে যে যা দিচ্ছেন, তাই নিয়ে চিকিৎসার জন্য অর্থ জমা করছি।

এলাকার বাসিন্দা মুন্নি তুড়ি বলেন, আমরা যখন থেকে জানতে পেরেছি ওর চিকিৎসার জন্য বাগানের সবাই মিলে চাঁদা তুলে চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু উন্নত চিকিৎসা করাতে কলকাতা যেতে হবে এবং তার জন্য চাই প্রচুর অর্থ। দীর্ঘদিন থেকে বাগান বন্ধ, ফলে প্রত্যেকেরই একই অবস্থা। সরকারি ও কোনও সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। কোনও উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে আমরা শিবমের চিকিৎসার জন্য পথে নেমেছি। ছেলেটাকে তো আর এভাবে চোখের সামনে মরে যেতে দেখতে পারি না। তাই আমরা গ্রামের সবাই মিলে রাস্তায় নেমেছি। লোকের কাছে গিয়ে ওর চিকিৎসার জন্য অর্থ ভিক্ষা করছি। অল্প কিছু অর্থ জমা হয়েছে। আরও কিছু অর্থ জমা হলেই আমরা শিবমকে নিয়ে কলকাতা রওনা হব। এভাবেই সংগ্রাম চালাচ্ছেন বন্ধ মধু চা বাগানের শ্রমিকরা। অর্থাভাবে অপুষ্টি ও বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু মিছিল চলছে চা বলয়ে। কবে এই মৃত্যু-মিছিল বন্ধ হবে? কবে অন্ধকার ঘুচবে বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকদের পরিবারে? এর উত্তর কারও জানা নেই। এখন শুধু অপেক্ষা…।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here