এখানে মৃত্যুর রং নীল, খাবারের জন্য ফুসফুস ভরাতে হয় সালফারের বিষে

0
1038

অমিত কুমার দাস: ঘনাদা থাকলে হয়ত শিশিরের সিগারেটের টিন থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে, সুখটানের সঙ্গে আরাম কেদারায় গা এলিয়ে জমাটি এক গল্প বানিয়ে বসতেন। তবে গোটা পৃথিবী চষে বাড়ানো ৭২ নম্বর বনমালী নস্কর লেনের মেসবাড়ির ঘনাদার হয়ত পা পড়েনি সেখানে। আর তাই অনেকেরই অলক্ষ্যে থেকে গিয়েছে পৃথিবীর এই অতি আশ্চর্য বিভীষিকাময় নীল লাভা আর অ্যাসিড লেকের এই মৃত্যুপুরি। এক ঝলকে দেখলে মনে হবে চিত্রকর যেন দীর্ঘ সময় নিয়ে আপন খেয়ালে অত্যন্ত আদরের সঙ্গে তৈরি করেছেন ইন্দোনেশিয়ার জাভার ইজেন নামের এই আগ্নেয়গিরির পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে। সোনার মতোই এর চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে রাখা বহুমূল্য খনিজ। এই অপার্থিব সৌন্দর্যের সঙ্গেই এর অন্তরে মেশানো রয়েছে এক ভয়াল বিষ। যার জেরেই এখানকার মানুষের গড় আয়ু মাত্র ৪৫ বছর। পেটের খিদে মেটাতে যেখানকার মানুষ ফুসফুস ভরিয়ে নেয় বিষাক্ত গ্যাসে।

ইজেনের খনি শ্রমিক

আগ্নেয়গিরির দেশ ইন্দোনেশিয়া। ১৯৬০ সালে কোনও একদিন ইন্দোনেশিয়ার জাভায় হঠাৎ জেগে ওঠে নয়া এক আগ্নেয়গিরি ‘ইজেন’। দগদগে লাল লাভার পরিবর্তে তার বুক থেকে ছিটকে আসে নীল রংয়ের রহস্যময় এক অদ্ভুত লাভা। বেশ কয়েক বছর পর আবিষ্কৃত হয়, এ এক অসাধারণ আগ্নেয়গিরি। এর বুকের ভিতর জমে রয়েছে বহুমুল্য খনিজ সালফার। যাকে এখানকার মানুষ এখন ‘রাক্ষুসে সোনা’ নামেই জানে। পেটের টানে সেই রাক্ষুসে সোনাই হয়ে ওঠে এখানকার মানুষের জীবিকার অন্যতম মাধ্যম। ওই রাক্ষুসে সোনার খোঁজে আগ্নেয়গিরির বুকে চালানো শাবল গাঁইতির প্রতিটি আঘাতের শোধ নেয় ‘ইজেন’।

তরল সালফারের নীল হ্রদ

পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক পেশাগুলির মধ্যে অন্যতম হিসাবে ধরা হয় জাভার ‘ইজেন’ আগ্নেয়গিরিতে সালফারের খোঁজে যাওয়া এইসব খনি শ্রমিকদের। আগ্নেয়গিরির পাশ্ববর্তী প্রায় ৩০০ বাসিন্দা দিনরাত সংগ্রহ করেন ‘ইজেন’এর জমাটবাধা এই সালফার। বেশ চড়া দামেই বিক্রি হয় বিভিন্ন কারখানায়, এমনকি রফতানিও করা হয় বিদেশে। এই জমাট বাধা সালফার সংগ্রহ করার ঝক্কিও কম নয়। আগ্নেয়গিরির ভয়ঙ্কর বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড গ্যাস থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস মাস্কও নেই তাঁদের কারও। সাধারণ গামছায় মুখ ঢেকে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে চলে সালফার সংগ্রহের কাজ। ফল দুরারোগ্য ব্যাধি। বিজ্ঞানীদের দাবি, ওই খনিতে যারা কাজ করেন তাঁদের গড় আয়ু এখন ঠেকেছে মাত্র ৪৫ বছর। যাঁরা কাজ করেন তাঁরা প্রতিদিন ৭৫ থেকে ১০০ কেজি সালফার ঝুড়িতে বয়ে ৪ কিলোমিটার রাস্তা ট্রেক করে নামেন পাহাড় থেকে। ওই আগ্নেয়গিরির পাশেই রয়েছে একটি নীল হ্রদ। অপার্থিব সুন্দর এই হ্রদ কিন্তু সাধারণ কোনও হ্রদ নয়, সালফার অ্যাসিডের হ্রদ। গাড়ির ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহার করা হয় এই জল। আর জমাট বাধা সালফার থেকে তৈরি হয়, প্লাস্টিক, চিনি, সাবান সহ নানান ধরণের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস। এই সালফার ব্যবহার করা হয় বিস্ফোরকেও।

ইজেনের নীল লাভা

যারা এই খনিতে কাজ করেন দিনের শেষে তাঁদের আয় মাত্র ১২ ডলার। দিনের পর দিন এই কাজের জেরে সালফারের ক্ষতিকর দিকগুলি ফুটে ওঠে ওই খনি শ্রমিকদের শরীরে। নষ্ট হতে থাকে চোখ, জ্বলে যায় গলা, ক্ষয়ে যেতে থাকে দাঁত। এছাড়াও একাধিক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ৪০ বছর পার হওয়ার আগেই মৃত্যু কোলে ঢলে পড়ে শ্রমিকরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here