প্রাক্তনী উবেইদের হাতে স্বপ্নভঙ্গ ইস্টবেঙ্গলের

0
78

ইস্টবেঙ্গল- ১(২) গোকুলাম-১(৩)

সায়ন মজুমদার: অতীতে বহুবার প্রাক্তন খেলোয়াড়দের হাতেই রক্তাক্ত হতে হয়েছে ইস্টবেঙ্গলকে। শতবর্ষে দুরান্ড কাপ আর ইস্টবেঙ্গলের মধ্যে ফারাকটা গড়ে দিলেন সেই প্রাক্তন লাল হলুদ খেলোয়াড়ই। নাম তার সিকে উবেইদ। গত বছর ইস্টবেঙ্গলের দ্বিতীয় গোলকিপার ছিলেন। দু’বছর তার সঙ্গে কন্ট্রাক্ট থাকলেও এই বছর তাকে ছেড়ে দিয়েছিল কলকাতার অন্যতম প্রধান। কিন্তু এবার গোকুলামের হয়ে কলকাতায় ফিরেই সেই ইস্টবেঙ্গলেরই দৌড় থামিয়ে দিলেন উবেইদ। কোলাডো ও হাওকিপের শট সেভ করে দুরান্ড কাপের ফাইনালে দলকে পৌঁছে অনেক অবহেলার জবাব দিলেন উবেইদ।

দুরান্ড কাপের শুরু থেকে এই টুর্নামেন্টটিকে প্রি-সিজন হিসেবে ধরলেও দল সেমিফাইনালে উঠতেই সিরিয়াস মোডে লাল-হলুদ কোচ আলেহান্দ্রো। এদিন গোকুলামের বিরুদ্ধে তাই একেবারে প্রথম সারির দলই নামিয়ে ছিলেন তিনি। বেঙ্গালুরু ম্যাচের প্রথম একাদশ থেকে এদিন ছটি পরিবর্তন করেছিলেন তিনি। এদিন দলে প্রথম থেকেই ছিলেন ক্রেসপি, সামাদ, বিদ্যাসাগর, মেহতাব, মনোজ। গোল রক্ষার দায়িত্ব ছিল মিরশাদের ওপর। দুরান্ড কমিটি এদিন দুপুর তিনটের সময় খেলা ফেলেছিল ইস্টবেঙ্গলের। কিন্তু খামখেয়ালি আবহাওয়ার জেরে ভরা ভাদ্রেও দুপুরের তাপমাত্রা পৌঁছে গিয়েছিল ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। যার জেরে দুই অর্ধেই আলাদা ভাবে ওয়াটার ব্রেক দিতে হলো রেফারিকে।

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলা শুরু করে লাল হলুদ। ম্যাসেট দ্বিতীয় মিনিটেই পিন্টু মাহাতোর ডান প্রান্ত থেকে করা সেন্টার গোকুলাম গোলে প্রায় ঢুকে গিয়েছিল। সে যাত্রায় সাইড বারে লেগে বল ফিরে আসে। কিন্তু আক্রমণের চাপ ক্রমাগত বাড়িয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। ১৮ মিনিটে এই চাপের কাছেই হার মানে গোকুলাম। বিপক্ষ বক্সের বেশ বাইরে থেকে সামাদের দুরন্ত শট ডিপ খেয়ে গোকুলাম জাল নাড়িয়ে দেয়। উবেইদ ফুল বডি স্ট্রেচ করেই বলের নাগাল পাননি। এক গোলে লিড নেওয়ার পরেও কিন্তু চাপ একটুও কমায় নি কলকাতার অন্যতম প্রধান। রাইট উইংয়ে পিন্টু-কোলাডো জুটি বিপক্ষ ডিফেন্স ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল। এই ম্যাচের আগে গোকুলামের মার্কাসকে নিয়ে প্রবল আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু প্রথমার্ধে তাকে কার্যত বোতলবন্দি করে রাখলেন কাশিম ও ডিডিকা। ফলে তাকে বেশ নিচ থেকে খেলা অপারেট করতে হলো। অবশ্য প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে হঠাৎ করেই জ্বলে ওঠে গোকুলাম। এই সময় একটি বল হেডারে ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের গোলেই প্রায় ঢুকিয়ে দিচ্ছিলেন মার্তি। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে হেনরি কিসেকা ওই বলটি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গোলে ঠেলতে গিয়ে বাইরে বার করে দেন। এর কিছু পরেই মেইতেইয়ের জোরালো শট দুরন্ত দক্ষতায় সেভ করেন মিরশাদ।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুটা অবশ্য আক্রমণাত্মক মেজাজে শুরু করে গোকুলাম। ৫১ মিনিটে ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্সের ভুলের সুযোগ নিয়ে গোলের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন কিসেকা। কিন্তু সেই প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিরশাদের হাতে মারেন তিনি। যদিও এরপরও আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে কেরলের ক্লাবটি। প্রথমার্ধে কিছুটা নিচ থেকে খেলছিলেন গোকুলামের সেরা অস্ত্র মার্কাস। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে কিন্তু তিনি একেবারে সামনে। আর তাতেই আক্রমণের ঝাঁজ বাড়ায় গোকুলাম। অবশ্য ঘড়ির কাটা কিছু গড়াতে ফের ধীরে ধীরে ম্যাচের দখল নেয় লাল হলুদ। যদিও শেষ দশ মিনিট আবার আক্রমণের ঝড় তুলেছিল গোকুলাম। আর সেই ঝড় থামাতে অতিরিক্ত আওময়ে নিজেদের বক্সে কিসেকাকে ফেলে দেন মেহতাব। গোকুলামকে একটি পেনাল্টি ও মেহতাবকে লাল কার্ড দিতে সময় নেননি রেফারি তেজস রাও বিশ্বাস। স্পট কিক থেকে ম্যাচে সমতা ফেরান মার্কাস। নির্ধারিত সময়ে খেলার ফল ১-১ থাকায় ম্যাচ গড়ায় এক্সট্রা টাইমে।

এক্সট্রা টাইমে দশজনে হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই ডিফেন্সের মোড়কে চলে যায় লাল হলুদ। আর এই সুযোগে দাপিয়ে বেড়ালো কেরলের দলটি। এক্সট্রা টাইমের দুই অর্ধেই বেশ কয়েকটি গোলের সহজ সুযোগ মিস করেন গোকুলাম খেলোয়াড়রা। উল্টোদিকে একেবারে শেষ মিনিটে বিপক্ষ বক্সের ঠিক বাইরে একটি ফ্রিকিক পায় ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু রেফারি প্রথমে ফাউল দিয়েও পরে খেলা শেষের বাঁশি বাজিয়ে দেন।

টাইব্রেকারে শুরুতেই পরপর ইস্টবেঙ্গলের হয়ে পেনাল্টি কিক মিস করেন ডিডিকা, কোলাডো। মিরশাদ মেইতেইয়ের শট বাঁচিয়ে একটু আশা দেখালেও শেষে নাওরেমের শট বাঁচান ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তনী হাওকিপ। শেষমেশ টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে জিতে দুরান্ড এর ফাইনালে উঠে গেল গোকুলাম।

ম্যাচের পর হতাশ আলেহান্দ্রো জানান, আমরা ভালো ফুটবল খেলেছি। এক গোলে এগিয়ে থাকলেও আরো গোল করতে পারতাম। দ্বিতীয়ার্ধে একটু খারাপ ফুটবল খেলেছি ঠিকই। তবে পেনাল্টির কারণে ম্যাচের তাল একেবারেই কেটে যায়। তবে ওটা লাল কার্ড ছিল কিনা সেটা নিয়ে একটু সন্দেহ আছে। তবে মাত্র এক মাসের ট্রেনিংয়ের পর প্রায় আধ ঘন্টা দশ জনে খেলে বিপক্ষকে আটকেছি। কিন্তু ফিফা নিয়ম অনুযায়ী এক্সট্রা টাইমে একজন বেশি খেলোয়াড় পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু এখানে সেই নিয়ম লাগু হয়নি। তবে শেষেও বলছি দলের সকলের খেলায় আমি খুশি। ‘

ম্যাচের শেষে এদিনের নায়ক উবেইদ জানান, ‘ এটা আমার কাছে কোনো প্রতিশোধ নয়। আজ আমার নাম হয়েছে এই ইস্টবেঙ্গলের জন্যই হয়েছে। আর আজ আমি যে দুটি সেভ করেছি, তার জন্য ভাগ্যকেই ধন্যবাদ দেব।’

ইস্টবেঙ্গলের প্রথম একাদশ: কোলাডো, পিন্টু, কাশিম, ডিডিকা, ক্রেসপি, সামাদ, বিদ্যাসাগর, মেহতাব, ব্রেন্ডন, মিরশাদ, মনোজ

গোকুলামের প্রথম একাদশ: উবেইদ,নাওচা, ডেনিস, ইরশাদ, মার্কাস, রাশিদ, মেইতেই, সেবাস্তিয়ান, শিবিল, জেস্টিন, কিসেকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here