kolkata bengali news

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিউড়ি: জমিদালাল চক্রের বেআইনী কারবারের খেসারতে এফআইআর ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত দেশের প্রয়াত শিক্ষাবিদ ও তার দাদার বিরুদ্ধে! বীরভূমের সিউড়ি শহরের এই ঘটনায় স্তম্ভিত নাগরিক সমাজ। ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে সব মহলে। অবিলম্বে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের দাবি উঠেছে।

জানা গিয়েছে, সিউড়ি শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ভট্টাচার্য পাড়ায় রয়েছে ‘চৌমর’ নামে একটি বিশাল পুকুর। যার মালিকানা রয়েছে প্রয়াত ওই দুই শিক্ষাবিদের নামে। উত্তরাধিকার সূত্রে যার বর্তমান মালিক প্রয়াত রমারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের ভাইপো তথা বীরভূম মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ পার্থসারথী মুখোপাধ্যায়। মুখোপাধ্যায় পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় মাস আগে পুকুরটি বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। ইচ্ছুক এক ক্রেতার সঙ্গে দাম-দর নিয়ে আপোস মীমাংসা হওয়ায় অগ্রিম নেওয়া হয় এই শর্তে যে বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুকুরটির মালিকানা হস্তান্তরের সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু অভিযোগ, সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার মধ্যেই ঘটে গিয়েছে বিপত্তি। যে ক্রেতা পুকুরটি ক্রয়ের জন্য অগ্রিম দিয়েছেন সে ও তার দলবল পুকুরটির দখল নিয়ে বেমালুম ভরাট করতে শুরু করে বেআইনীভাবে। এই কাজে যাতে প্রতিবাদ না হয় তারজন্য এলাকার মানুষকে হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ। রীতিমত জেসিবি মেশিন লাগিয়ে, ট্রাক্টরের পর ট্রাক্টর ঢুকিয়ে অর্ধেকের বেশী পুকুর ভরাটের কাজ সম্পন্ন করে দিয়েছে জমির এই কারবারীরা। কিন্তু গোপনে মানুষ একজোট হয়ে প্রশাসনের নানাস্তরে গণ প্রতিবাদপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। যা পেয়ে প্রশাসন সক্রিয় হয়ে পুকুর ভরাটের কাজ বন্ধ করে তদন্ত শুরু করেছে। সেই তদন্ত সাপেক্ষে সদর মহকুমা শাসক এফআইআর করেছেন এবং তাতে স্বাভাবিকভাবেই যেহেতু পুকুরের মালিকানা রয়েছে ওই দুই প্রয়াত শিক্ষাবিদের নামে তাই তারাই হয়ে গিয়েছেন ‘অভিযুক্ত’।

এব্যাপারে মুখোপাধ্যায় পরিবারের বর্তমান প্রধান পার্থসারথী মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘আমি আশিস ভান্ডারী নামে জনৈক এক ব্যক্তির কাছে অগ্রিম নিয়েছিলাম পুকুরটি বিক্রির করার জন্য। কিন্তু বকেয়া না মেটায় জমির মালিকানা হস্তান্তর হয়নি। সময়ের অভাবে নিয়মিত নজরদারি করতে না পারার কারনে এর মধ্যে কে কি করেছে আমার জানা ছিল না।’ তবে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার মানুষ, নাম প্রকাশ না করার শর্তে। কারন এই কারবারে জড়িয়ে রয়েছেন প্রভাবশালীরা। অবশ্যই তারা সবাই শাসকদলের। এলাকার মানুষের অভিযোগ, ‘ওই আশিস ভান্ডারী ও তার শাগরেদরাই এই দুষ্টু চক্রের হোতা। তাদের পেছনে পুরো মদত রয়েছে স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলরের স্বামীর।’ ঘটনার খবর চাউর হতেই ব্যাপক শোরগোল পড়েছে শহরজুড়ে। এ ব্যাপারে সদর মহকুমা শাসক জানিয়েছেন, ‘পুকুর ভরাটের একটি অভিযোগ পেয়েছিলাম। তার পরিপ্রেক্ষিতে বিএলআরওর মাধ্যমে জমির মালিকানা দেখে দুই মালিকের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেছি। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুরসভাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুকুরটিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য।’

উল্লেখ্য, দেশের শিক্ষা জগতে এই মুখোপাধ্যায় পরিবারে অবদান অনস্বীকার্য। প্রয়াত রমারঞ্জন মুখোপাধ্যায় ছিলেন সংস্কৃতের প্রথিতযশা পন্ডিত। তিরুচিরাপল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সহ দেশে-বিদেশে নানান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যতম শিক্ষা পরামর্শ দাতা ছিলেন তিনি। শিক্ষার বিস্তারের স্বার্থে বহু কাজ করে গেছেন। পেয়েছেন ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান। তার দাদা দেবরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ও ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অসামান্য পন্ডিত। পালন করেছেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব। লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের একাধিক গ্রন্থ ও গবেষনাপত্র। দেশের নানা প্রান্তের অগুণিত মানুষের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে এই মুখোপাধ্যায় পরিবারের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠা, সম্মান, দান-ধ্যান, সামাজিক কাজে অবদানের নিরীখে এই পরিবার এক উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে মানুষের মনে। এক দুষ্টু চক্রের অবৈধ কারবারের খেসারতে সেই পরিবার কালিমালিপ্ত হওয়া মেনে নিতে পারছেন না কেউই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here