তৃণমূলের সুরে সুর মিলছে না সিঙ্গুরে! মুখ্যমন্ত্রীর ট্যুইটেও সাড়া নেই কৃষকদের

0
669
kolkata bengali news

নিজস্ব প্রতিবেদক, চুঁচুড়া: পুজো এসে গিয়েছে। কাশ ফুলে ঢেকেছে সিঙ্গুরের জমি। শরতের আকাশে ভাসা ভাসা মেঘ। কিন্তু সেই মেঘের কোনে যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে বেশ বড় কালো মেঘ দানা বাঁধছে সিঙ্গুরের বুকে। কালো মেঘ ক্রমশ বড় হচ্ছে তলে তলে। সেই ‌মেঘকে কাছে টানতে মরিয়া বিরোধী রাজনৈতিক দল। তাই নতুন করে মাথা চারা দিচ্ছে সিঙ্গুর ইস‍্যু। এখন সিঙ্গুরের বুকে যে তৃণমূলের সুরে সুর মিলছে না সেটা এদিন বেশ বোঝা গেল মুখ্যমন্ত্রীর ট্যুইটে, যাকে কার্যত পাত্তাই দিলেন ন্যানো প্রকল্পে অধীগৃহীত জমি ফেরত পাওয়া কৃষকেরা। শনিবার সিঙ্গুর নিয়ে মুখ‍্যমন্ত্রী ট্যুইট করে জানান, ‘আজ সিঙ্গুরের কৃষকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অধিকৃত জমি ফেরতের তৃতীয় বার্ষিকী। এই ঐতিহাসিক দিনে সরকার কৃষকদের পর্চা হস্তান্তর করে। শিল্পের সমৃদ্ধি ও কৃষকদের স্বার্থ সুনিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মা মাটি মানুষকে জানাই আমার প্রনাম।’

মুখ্যমন্ত্রীর এই ট্যুইট বার্তা ঘিরে সিঙ্গুরের অলিতে গলিতে শুরু হয়েছে গুঞ্জন। কিছুদিন আগে সিঙ্গুরের সব জমিতে চাষ হচ্ছে না বলে মন্ত‍ব্য করেছিলেন মুখ‍্যমন্ত্রী। যা নিয়ে জল ঘোলা হয়েছিল রাজনৈতিক মহলে। তখন সিঙ্গুরে জমি ফেরত পাওয়া বেশীরভাগ কৃষকই জমি চাষযোগ‍্য না হওয়ার কারনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। উল্লেখ‍্য, ২০১৬ সালের ৩১শে অগাষ্ট সুপ্রিম কোর্ট সিঙ্গুরের অধিগ্ৰহন করা ৯৯৭ একর জমি চাষযোগ‍্য করে সমস্ত কৃষকদের ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দেন। সেই মতো সিঙ্গুরের ন্যানো কারখানা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে কৃষকদের জমি ফেরত দিতে শুরু করে রাজ‍্য সরকার। ২০১৬ সালের ১৪ই অগাষ্ট থেকে কৃষকের হাতে জমির পরচা তুলে দেওয়ার মাধ‍্যমে জমি ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। কিন্তু তিন বছর অতিক্রান্ত হবার পরও বেশিরভাগ জমি চাষযোগ‍্য না হওয়ায় ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে কৃষকদের মধ্যে। কিছু জমি চাষের উপযোগী হলেও বেশিরভাগ জমিতে এখনও কারখানার হাড় কঙ্কালে ভর্তি, যা চাষের অযোগ‍্য। এই নিয়ে অনেক আগেই আসরে নেমেছে বিজেপি। হুগলির সাংসদ লকেট চট্টোপাধ‍্যায় সিঙ্গুরের কৃষকদের সঙ্গে দেখা করে তাদের অভাব অভিযোগ শুনেছেন এবং চাষের অনুপযোগ‍্য জমিতে যাতে শিল্প আসে তারও উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছিলেন।

লোকসভা ভোটে সিঙ্গুর বিধানসভায় ১০০০০ হাজারেরও বেশী ভোটে শাসক দলের পরাজয় কিছুটা হলেও ভাবাচ্ছে তৃণমূলকে। অন্যদিকে যে সিঙ্গুর নিয়ে বামফ্রন্ট জামানার অবসান হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের মত, সেই সিঙ্গুর থেকেই ছাত্র যুবদের নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে বামফ্রন্ট। সিঙ্গুরে পুনরায় শিল্পের দাবি নিয়ে রাজনৈতিক ময়দানে পায়ের তলার মাটি পেতে মরিয়া হয়ে সেই সিঙ্গুর থেকেই অন্দোলনে নেমেছে বামফ্রন্টের তরুন তুর্কীরা। সিঙ্গুর জমি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ভুবন বাগুই। কৃষি জমি ফিরিয়ে দেবার দাবিতে তৎকালীন মিছিলে প্রতিনিয়ত আওয়াজ তুলতেন মিছিলের অগ্ৰভাগে থেকে। জমি ফেরত পেয়ে চাষ করছেন। ধানও হয়েছে‌। তবে জমি ঠিক করে দেয়নি সরকার, নিজে খরচা করে জমি চাষযোগ‍্য করেছেন। সিঙ্গুর আন্দোলনের আরেক যোদ্ধা বর্তমানে একজন সক্রিয় তৃনমুল কর্মী মহাদেব দাস। খাসের ভেড়ি ও বেড়াবেড়ি মৌজায় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১০ বিঘা জমি এখনও চাষের অযোগ‍্য হয়ে পড়ে আছে। নুড়ি, পাথর, কংক্রিটে ভর্তি। দুধকুমার ধাড়া বর্তমানে সিঙ্গুর পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ‍্যক্ষ। গোপাননগর ও খাসেরভেড়ি মিলিয়ে কয়েক বিঘা জমি ছিল যা এখনও চাষ যোগ‍্য হয়নি। কিন্তু প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ উভয়ই।

অন্যদিকে শিল্পের জন‍্য জমি দিয়েছিলেন গোপলনগর গ্ৰামের সুকদেব বেরা, জয়দেব বেরার পরিবাররা। চেয়েছিলেন শিল্প হলে কাজ মিলবে পরিবারের। কিন্তু স্বপ্ন অধরা থেকে গেল। না হলো শিল্প, না হচ্ছে কৃষি। কারন জমির কাগজ পেয়েছেন ঠিকই, কিন্ত জমি চাষযোগ‍্য করে চিহ্নিত করে এখনও তা ফেরত পাননি।জয়দেববাবু আক্ষেপ করে বলেন, ‘এখনও পুজোর কেনাকাটা হয়নি কারোর। আদৌ হবে কিনা তাও জানি না। পরিবারের ছেলেরাও বেকারত্বের সমস‍্যায় ভুগছে। শিল্পটা হলে খুব ভালো হতো।’ দ্ধিতীয় বর্ষের কলা বিভাগের ছাত্রী দেবিকা বেরাও একই সমস্যার কথা জানালেন। ‘আকাশে বাতাসে পুজো গন্ধ ভেসে বেড়ালেও, ঘরেতে এখনও নেই নতুন জামা কাপড়ের গন্ধ। কিছু বলতে গিয়ে জল চলে আসে চোখে। কারখানাটা হলে দাদা অন্তত একটা কিছু করতো!’ সিঙ্গুরের বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য আবার ন্যানো কারখানা নিয়ে নতুন বিতর্ক টেনে এনেছেন। তার মত, ‘জমি চাষযোগ‍্য হয়নি সেটা আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু টাটারা যদি বুদ্ধিমান হতেন, যদি অন্য শিল্পপতিদের মতো জমি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কিনে নিতেন তাহলে, টাটারা জমি পেয়ে যেতেন এবং সিঙ্গুরে কারখানাও হতে পারতো। ভয় দেখিয়ে জোর করে বন্দুক দিয়ে জমি দখল করা যায় না।’

অন্যদিকে তৃণমূল বিধায়ক বেচারাম মান্না বলেছেন, ‘গতবারে যে পরিমান জমি চাষ যোগ‍্য ছিল এবারে তার পরিমান বেড়েছে। আগামি দিনে তা আরও বাড়বে। বিরোধীরা সিঙ্গুর নিয়ে মিথ‍্যা প্রচার চালাচ্ছে, তাদের হারানো রাজনৈতিক জমি ফিরে পাবার জন্য। বিরোধীদের বক্তব্য রাজনৈতিক গিমিক ছাড়া আর কিছুই নয়।’ আবার সিঙ্গুরে বিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক সঞ্জয় পান্ডে বলেন, ‘সিঙ্গুরে মানুষ তৃণমূলকে বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু তারা দেখলো তারা প্রতারিত হয়েছে। তাই ভোট বাক্সে তার প্রভাব পড়েছে। সিঙ্গুর বিধনসভা সহ হুগলি লোকসভাতে শাসক দলের পরাজয় হয়েছে। আগামী দিনেও সিঙ্গুর তৃণমূলের সঙ্গে থাকবে না।’ তবে আগামি দিনে সিঙ্গুর কোনদিকে হাঁটবে‌, রাজনীতির ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা নেবে, তা বলবে আগামীদিনের সিঙ্গুরই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here