মৌনী মন্ডল : ১৯০৫ সাল, বাংলা তখনও অবিভক্ত। তবে সূচনা হয়েছে ‘বঙ্গভঙ্গ’ আন্দোলনের। অন্যদিকে তৎকালীন ঢাকা’র বিক্রমপুর এস্টেটের মেজ-রাজা মহেন্দ্রকুমার চৌধুরি তখন মদ, শিকার আর মহিলাসঙ্গতে বিভোর। তিনি নিয়ম করে সময়ে অসময়ে চলে যান তাঁর নাচঘরে, সেজে ওঠে জলসাঘর, বাঈজির সাথে মেতে ওঠেন শরীরী খেলায়। আবার কখনও বাড়ির পরিচারিকার ‘মাসিক’এর খবর নিয়ে তাঁকে ডেকে পাঠান নিজের শয়নকক্ষে। মদ-মাংস-মচ্ছব ছাড়াও মহেন্দ্রর নেশা ছিল শিকারে, ভাইবোনদের মধ্যে বেশি খাতির ছিল তাঁর মেজ বোন মৃন্ময়ীদেবীর সঙ্গে, বিশেষ যত্ন নিতেন পোষ্যদের আর ভালবেসে খেয়াল রাখতেন রাজ্যের প্রজাদের। সেই কারণে লম্পট রাজাকে বিশেষ সমীহ করতেন রাজ্যের প্রজারা। বিক্রমপুর এস্টেটে ইংরেজদের নজর পড়ায় চিন্তিত হয়ে মহেন্দ্রর মা-পিসি বংশের উত্তরাধিকারি পাওয়া এবং এস্টেটের দায়িত্ব সামলানোর জন্য তাঁকে সংসার করার কথা বলেন, প্রথমে তা নাকজ করলেও পরে সম্মত হয়ে ‘কলিকাতা’র ভাল ইস্কুলে পড়া দরিদ্র ঘরের মেয়ে চন্দ্রাবতীর সাথে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। মেহেফিল বসে, তাবড় তাবড় উস্তাদরা গান ধরেন ‘অব পানিয়া ভরণ ক্যায়সে জায়ুঁ’, মদ-মুজরো-বাঈজী সঙ্গতে ভাঁটা পড়েনা সেদিনও। এদিকে নতুন কুলবধূ শূন্যদৃষ্টিতে মাথা থেকে নামিয়ে নেন রাজ-মুকুট। মদ্যপ মহেন্দ্র শয়নকক্ষে এসে চিনতে পারে না তাঁর সদ্য বিবাহিত স্ত্রী’কে, পরে মতি ফিরলে তাঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন ‘বাচ্চা মেয়ে’ নয় ‘মহিলাই’ তাঁর বেশি পছন্দের এবং ‘মাঝে মাঝে সাক্ষাৎ’ ছাড়া তাঁ কাছে যেন বেশি কিছু প্রত্যাশা না করা হয়। চন্দ্রাবতী তাঁর বাপের বাড়ি ছেড়ে আসার সময় সঙ্গে করে আনে তার দাদা সত্যকে। শহুরে সত্য জামাইবাবুর কীর্তি বোঝার পর বোন এবং নিজের ভবিষৎ নিশ্চিত করার জন্য তাঁকে দিয়ে বেশ মোটা টাকার বিমা করিয়ে নেয়। শহরে বিমা করতে গিয়ে মহেন্দ্র শহরের বেশ্যাপল্লীতে রয়ে যান, পাঠিয়ে দেন সত্যকে অসুস্থ চন্দ্রাবতীর কাছে। ওদিকে অসুস্থ বোনের কাছে ফিরে সত্য ‘চরিত্রহীন লম্পট’ মহেন্দ্রকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার বন্দোবস্ত করতে থাকেন। অতিরিক্ত যৌ্ন সংসর্গে মহেন্দ্র ‘সিফিলিস’ রোগে আক্রান্ত হন। আর সেই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে শ্যালক সত্য, পারিবারিক ডাক্তার অশ্বিনীকে যশ-অর্থের লোভ দেখিয়ে সামিল করেন তাঁর চক্রান্তে। হাওয়া বদলের অছিলায় মহেন্দ্র-চন্দ্রাবতী-সত্য-অশ্বিনী চলে দার্জিলিং-এর পথে। হাওয়া বদল হল, কিন্তু স্বাস্থ্যের এত অবনতি হল যে মহেন্দ্র কুমার চৌধুরি সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। চন্দ্রাবতী খুব কাঁদলেন, সত্য-অশ্বিনী মিলে দার্জিলিং-এই দাহ করলেন মহেন্দ্রকে।

১৯৩৩, ঢাকার এজলাসে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি, উকিল মহাশয় প্রবল উত্তেজিত হয়ে তাঁকে সওয়াল করছেন ‘কি বললেন? কি বললেন আপনার নাম? ঠিক করে বলুন? আপনি ভুল বলছেন, ঠিক করে বলুন আপনার নাম…?’ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি খানিক বিচলিত হয়ে, শান্ত গলায় ভাঙা হিন্দি উচ্চারণে বলেন, ‘হামার নাম, রাজা মাহেন্দ্র কুমার চৌধুরি’।

ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘এক যে ছিল রাজা’ চিত্রনাট্যের বুনট। ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’কে নিয়ে যে প্রচলিত গল্প রয়েছে, তা নিয়ে উত্তম কুমার অভিনীত ‘সন্ন্যাসী রাজা’ এবং হালের কিছু টেলি-সিরিয়ালে কাজ হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। তবে সৃজিত যে ছবিটি বানিয়েছেন তার চিত্রনাট্য তিনি লেখেন পার্থ চট্টোপাধ্যেয়ের লেখা বই ‘অ্যা প্রিন্সলি ইমপোস্টার’ থেকে, যেখানে তিনি মূলত বহু আলোচিত ভাওয়াল সন্ন্যাসী-রাজার মামলা নিয়ে তাঁর এই বইটি লিখেছিলেন। সেই মত সিনেমায় বেশ কিছু এজলাসের দৃশ্য রাখা হয়েছিল। কিন্তু, পরিচালক যে খুব বেশি ‘ফোকাসড’ হয়েছেন সেই বিষয়ে তা বোঝা গেল না ছবি দেখে। ছবিটির গুরুঅংশ জুড়ে ছিল এজলাসের বাইরের দৃশ্য। সেদিক দিয়ে একটু হতাশই লেগেছে। তবে তিনি যেভাবে চিত্রনাট্য লিখেছেন এবং যেভাবে ছবিটি সম্পাদনা করা হয়েছে তাতে যেমন কিছু কিছু যায়গায় চমক ছিল, ভালোলাগা ছিল, সেরকমই ছবিটির শেষার্ধ ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলার মতোই দীর্ঘ মনে হয়েছে।

‘নারীবাদ-বঙ্গভঙ্গ-ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন-দু’ই উকিলের প্রেমপর্যায়-অদৃষ্টের লেখনী’ ইত্যাদি ছবিতে দেখানোর চেষ্টা করতে গিয়ে, চিত্রনাট্যের জল বড্ড বেশিই গড়িয়ে গেছে বলে মনে হয়েছে। গল্পের ‘হাওয়া বদল’ করতে গিয়ে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে চিত্রনাট্য। প্রশ্ন উঠবে সিনেমায় তাহলে কি কিছুই দেখার নেই? অবশ্যই আছে। শুধুমাত্র কৌপিন পরা যীশুকে যাঁরা বড়স্ক্রীনে দেখবেন বলে হলে গেছেন, হলফ করে বলা যায় তাঁরা পরিণত অভিনেতা যীশুকে দেখে মুগ্ধ হয়ে ফিরবেন। ছবিতে যত ছোট হয়েছে তাঁর পোষাক, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তাঁর অভিনয় শৈলী। অঞ্জন দত্ত- অপর্ণা সেন কে নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই, এজলাসের দৃশ্যগুলো এত সাবলীল কখনই হত না, তাঁদের উপস্থিতি না থাকলে। জয়া এহসান বড় মাপের অভিনেত্রী তা তিনি আবারো বুঝিয়েছেন ‘মৃন্ময়ী’ করে। রুদ্রনীল- অণির্বাণ যে মাপের অভিনেতা, সেই মাপ নিঁখুত বসিয়েছেন তাঁরা অশ্বিনী-সত্য চরিত্রের মাধ্যমে। ছবিতে তাঁদের সংলাপ গুলি এবং অভিনয় বিন্যাস-ধারাবাহিকতা, অভূতপূর্ব। স্বল্প সময়ের চরিত্রে দাগ ফেলেছেন শ্রীনন্দা শংকর, রাজনন্দিনীও। প্রতিটি ছোট ছোট চরিত্র সব কলাকুশলীরাই তাঁদের ১০০ শতাংশ দিয়ছেন। সাধারণত ছবিতে ‘সাদা-কালো’য় ‘ফ্ল্যাশব্যাক’ দেখানোর একটা প্রচলিত রীতি দেখা যায়। এই ছবিতে, পিছনের সময়কে রঙিন মোড়কে আর ছবিতে সময় যত এগিয়েছে সেই সময়কে সাদা-কালোয় দেখানো হয়েছে, অভিনব লেগেছে এই দৃশ্যায়ন। আরো কিছু চমকপ্রদ দৃশ্যের কথা বলতে গেলে অবশ্যই বলতে হয়, রাজা মহেন্দ্রর শিকারে যাওয়ার আগে রাজকীয় ভঙ্গিতে হাতির শুঁড়ে ভর দিয়ে পিঠে চড়ার দৃশ্যটি। মাইনাস টেম্পারেচারে কৌপিন পরে শ্যুটিং-এর জন্য নয়, যীশু যদি এই দৃশ্যটির জন্যে ক্যামিও ব্যবহার না করে থাকেন, তাঁর জন্যে রইল কুর্ণিশ। এমন অনেক কিছু নিয়েই ছবিতে বেশ কিছু ডিটেল ওয়ার্ক করা হয়েছে যা ভাল লাগে। মেকআপ এ সোমনাথ কুন্ডু বুঝিয়ে দিয়েছেন বাংলায়ও এরকম মেকআপ সম্ভব। শ্রেয়া ঘোষালের ‘এসো হে’, সাহানার বাজপেয়ীর ‘মহারাজো একি সাজে’, রশিদ খানের গলায় ‘অব পানিয়া ভরণ ক্যায়সে জায়ুঁ’, অরিজিৎ-এর ‘কে আমি, কোথায়’ গানগুলি সিনেমায় যেমন দেখতে ভালো লেগেছে, তেমনই আরাম লেগেছে শুনতে। ‘অব পানিয়া ভরণ ক্যায়সে জায়ুঁ’ গানটিতে সঙ্গীত পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের উপস্থিতিও বেশ ভাল। পরিচালক বেশ আন্তরিকতা-আবেগ দিয়ে ছবিটি বানিয়েছেন, তার জন্যে তাঁকে সাধুবাদ জানাই, কিন্তু ‘মোহ-মায়া’ ত্যাগ করতে না পেরে, ছবিটি নির্মেদ না হয়ে, হয়ে গিয়েছে লাগামহীন দীর্ঘ-শ্লথ। তবে ঐ যে বললাম সৃজিতের ছবির কিছু চমক, ‘এক্স’ ফ্যাক্টর রয়েছে এবং সর্বপরি ভালো অভিনয় দেখতে হলে দেখে আসতেই পারেন ‘এক যে ছিল রাজা’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here