Telkupi

শিবানন্দ পাল: সেনবংশের রাজা বিজয় সেনের সময়েও স্বতন্ত্র রাজ্য হিসেবে তেলকূপি নিজ অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। তেলকূপির রাজা রুদ্রশিখর পালবংশের রাজা যে রামপালকে সহায়তা করেছিলেন, সেই রামপাল বাংলায় পালবংশের (রাজত্বকাল ৭৫০-১১৫৪ খ্রিস্টাব্দ) পতনের কালে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের সম্রাট পদে গোপালের নির্বাচনের ফলে পাল সাম্রাজ্যের জন্ম হয়েছিল।
খালিমপুর তাম্রলিপি অনুসারে, প্রথম পাল রাজা গোপাল ছিলেন এক যোদ্ধার পুত্র। রামচরিতম গ্রন্থে পাল রাজাদের পিতৃভূমি বলা হয়েছে বরেন্দ্র (উত্তরবঙ্গ)। যদিও পাল রাজবংশের জাতিগত উৎস অজ্ঞাত। রামচরিতম গ্রন্থে আবার পঞ্চদশ পাল সম্রাট রামপালকে ক্ষত্রিয় বলা হয়েছে। সম্ভবত এই রাজবংশের উৎস খুব সাধারণ ছিল। এঁরা বংশ পরিচয়ে ক্ষত্রিয় গৌরব যুক্ত করতে চেয়েছেন।
খ্রিস্টীয় ৯ম শতাব্দীর প্রথমভাগে পাল সাম্রাজ্য সর্বাধিক সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। এই সময় পাল সাম্রাজ্যই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। সেই সময়ে এই সাম্রাজ্য অধুনা পূর্ব-পাকিস্তান, উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশ পর্যন্ত প্রসারিত হয়। পাল সাম্রাজ্য সর্বাধিক সমৃদ্ধি ঘটে সম্রাট ধর্মপাল ও দেবপালের রাজত্বকালে। আরও পড়ুন… তেলকূপি নাকি প্রাচীন তৈলকম্পা রাজ্য, রাজত্ব করতেন শিখর বংশের রাজারা [পর্ব ১]

telkupiতিব্বতে অতীশ দীপঙ্করের মাধ্যমে পাল সাম্রাজ্য প্রভূত সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেছিল। পাল সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক প্রভাব পড়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও। যদিও উত্তর ভারতে পাল শাসন ছিল ক্ষণস্থায়ী। কারণ কনৌজের আধিপত্য অর্জনের জন্য গুর্জর-প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূটদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে পাল সম্রাটরা পরাজিত হয়েছিলেন। আবার কিছুকালের জন্য পাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল। তারপর সম্রাট প্রথম মহীপাল বাংলা ও বিহার অঞ্চলে দক্ষিণ ভারতীয় চোল অনুপ্রবেশ প্রতিহত করেন।
সম্রাট রামপাল ছিলেন সর্বশেষ শক্তিশালী পাল সম্রাট। তিনি কামরূপ ও কলিঙ্গেও আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। আরও পড়ুন… তেলকূপির ইতিহাস ঢাকা পড়ে আছে পাঞ্চেত জলাধারের জলের অতলে [পর্ব ২]

telkupiরামপালের অভিষেক সময়ে পালরাজাদের রাজ্যপাট সম্ভবত ভাগীরথী ও পদ্মা নদীর মধ্যবর্তী কোনও বদ্বীপ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি দ্বিতীয় শূরপালকে বধ করে পৈতৃক রাজ্য পুনরায় অধিকার করেছিলেন। কৈবর্ত বিদ্রোহের নেতা দিব্বোকের রাজ্য (উত্তরবঙ্গ) অধিকারের জন্য রামপালকে ভাগীরথীর উপরে নৌকা দিয়ে সেতু তৈরি করতে হয়েছিল।
শূরপালের মৃত্যুর পর রামপাল গৌড়ের সিংহাসন অধিকার করেছিলেন। দিব্বোকের ভ্রাতুষ্পুত্র ভীম তখন গৌড়ের মসনদে আসীন ছিলেন। দিব্বোকের পর অনুমান করা হয়, তাঁর ভাই রুদোক গৌড়ের অধিকার প্রাপ্ত হন। পরে তাঁর পুত্র ভীম উত্তরাধিকার সূত্রে উত্তরবঙ্গের সিংহাসন আরোহণ করেন। আরও পড়ুন… তেলকূপির সঙ্গে জড়িয়ে মহাবীর বর্ধমানের নাম, তাঁর নামেই বর্ধমান [পর্ব ৩]

telkupiএকসময় হতাশ রামপাল পুত্র রাজ্যপাল ও অন্যান্য আমাত্যদের হাতে রাজ্যভার সঁপে দিয়ে কিছুদিনের জন্য বঙ্গ সংলগ্ন জঙ্গলাকীর্ণ রাজ্যগুলি সফর করেছিলেন। তাঁদের সকলের সহযোগিতায় তিনি বহু পদাতিক, অশ্ব ও গজারোহী সৈন্য সংগ্রহ করেন। এর জন্য তাঁকে প্রচুর অর্থব্যয় করতে হয়।
রামপালের মাতুল-পুত্র রাষ্ট্রকূট-বংশীয় রাজা মহাপ্রতিহার শিবরাজদেব গঙ্গা পার হয়ে তাঁর জন্য সেনা নিয়ে অভিযান করেন। শিবরাজ বরেন্দ্রী হতে দিব্বোকের ভ্রাতুষ্পুত্র ভীমের দলবলকে উৎখাত করেন। যদিও শিবরাজের এই বরেন্দ্রী অধিকার স্থায়ী হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই রামপালকে বহু সেনা সহযোগে বরেন্দ্রী আক্রমণ করতে হয়। রামপালের বরেন্দ্রী অভিযানে ভীমযশ, বীরগুণ, জয়সিংহ, বিক্রমরাজ, লক্ষ্মীশূর, শূরপাল, রুদ্রশেখর, ময়গলসিংহ, প্রতাপসিংহ, দ্বোরপবর্ধন প্রমুখ সামন্ত রাজারা অংশগ্রহণ করেছিলেন। পুত্র রাজ্যপাল সহ অন্যান্য পুত্ররাও পিতা রামপালের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন। আরও পড়ুন… পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ডিভিসি জানাল পুরুলিয়ার তেলকূপি জলের তলায় [পর্ব ৪]

telkupiভীমযশ, বীরগুণ, জয়সিংহ, বিক্রমরাজ, লক্ষ্মীশূর, শূরপাল, রুদ্রশেখর, ময়গলসিংহ, প্রতাপসিংহ, দ্বোরপবর্ধন প্রমুখ সে সময়ে অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ অঞ্চল সংলগ্ন ছোট-বড় রাজ্যগুলির রাজা ছিলেন। তাঁরা একযোগে রামপালের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন।রামচরিতের টীকায় উল্লেখ রয়েছে, মগধ ও পিঠীর অধিপতি ছিলেন ভীমযশ। নিজেকে তিনি “কান্যকুব্জরাজবাজিনীগণ্ঠনভুজঙ্গ” নামে অভিহিত করেছিলেন।
রামচরিতের টীকাতে রাজা বীরগুণ সম্বন্ধে বলা হয়েছে, তিনি কোয়াটবীর রাজা ছিলেন। আইন-ই-আকবরী, নগেন্দ্রনাথ বসু, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কোয়াটবী অর্থাৎ ওড়িশার কটককে এই স্থান বলে মনে করলেও ওড়িশায় রামপালের বা তাঁর পিতার সামন্তশাসিত কোনও অংশ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং অনেকে উল্লেখ করেছেন, এটি ছিল বিষ্ণুপুরের পূর্বে একটি গ্রাম অথবা বর্ধমান জেলার আউসগ্রাম থানার ভল্কীকোট গ্রাম।
ভল্কীকোটকে অনেকে প্রাচীন কোটাটবী বা কোটার জঙ্গল এলাকা বলে এখনও চিহ্নিত করেন। রাজা জয়সিংহ ছিলেন দণ্ডভুক্তি অর্থাৎ মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণ অংশের রাজা। ইনি ওড়িশার রাজা কর্ণকেশরীকে পরাজিত করেছিলেন। রামচরিতে বিক্রমরাজ, শুধু এই নামটির উল্লেখ আছে। টীকাকারের ভাষ্যে ‘দেবগ্রাম প্রতিবদ্ধ’ ও ‘বালবলভী তরঙ্গ’, দু’টি মাত্র শব্দ আছে। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি দেবগ্রাম, প্রাচীন বাগড়ী অর্থাৎ মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা অঞ্চলে রাজত্ব করতেন।
অনেকে বলেছেন, বালবলভী নামে বিশাল তরঙ্গ-বহুল নদীদ্বারা বেষ্টিত থাকায় তাঁর রাজধানী দেবগ্রাম সুরক্ষিত ছিল। দেবগ্রামের অবস্থিতি সম্পর্কে কেউ কেউ ধারণা করেন, কলকাতা-লালগোলা রেলপথে শিয়ালদহ থেকে ১৪০ কিলোমিটার দূরে নদীয়া জেলার দেবগ্রাম। এই দেবগ্রাম অঞ্চলও খুব প্রাচীন। রমেশচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত ‘বর্ধমানের পুরাকথা’ বইয়ে  এই জায়গার অনেক প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের বিবরণ আছে। আবার কেউ সুবর্ণরেখা নদীর মুখে পিপলী গ্রামকে চিহ্নিত করেছেন।
লক্ষ্মীশূর অপরমন্দারের অধিপতি এবং আটবিক সামন্তচক্রের প্রধান ছিলেন। সম্ভবত তিনি হুগলী জেলার অন্তর্গত অপারমন্দারের অধিপতি ছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন, এটি ছিল হুগলী জেলার গড়মান্দারন। আবার কেউ বলেছেন, বর্তমান দেওঘর সংলগ্ন অঞ্চল। লক্ষ্মীশূরকে অনেকে পার্বত্য এলাকার সামন্তদের প্রধান মনে করেছেন। তাঁদের মতে, ভাগলপুরের ৩০ মাইল দক্ষিণে মন্দার পর্বত এলাকা, তার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত অরণ্যসঙ্কুল প্রদেশই লক্ষ্মীশূরের রাজ্য ছিল।
রণশূর দক্ষিণ রাধা শাসন করতেন। লক্ষ্মীশূর এই বংশেরও রাজা হতে পারেন। পরবর্তী সেন বংশের রাজা বিজয়সেন শূর বংশের রাজকন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। কুজবটীর শূরপাল। প্রাচীন কুব্জবটি সাঁওতাল পরগনার অন্তর্ভুক্ত দুমকার ১৪ মাইল উত্তরে অবস্থিত ছিল। ময়গলসিংহ ছিলেন উচ্ছাল পরগনার রাজা। বীরভূম জেলার অন্তর্গত ‘জৈনউঝিয়াল’ পরগনাকেই প্রায় সকলে উচ্ছাল বলে স্বীকার করেছেন। তবে দক্ষিণ দামোদরের মানুষ পঞ্চানন মণ্ডল এবং ঐতিহাসিক রমেশ মজুমদার মনে করেছেন, এটি বর্ধমান জেলার উছলান গ্রাম।
প্রতাপসিংহ ছিলেন ঢেক্করীরাজ। তাঁর রাজ্য ছিল কাটোয়ার নিকটবর্তী বর্ধমান জেলায়। দ্বোরপবর্ধন ছিলেন কৌশাম্বীর রাজা। কৌশাম্বী সম্ভবত রাজশাহী অথবা বগুড়া জেলায় অবস্থিত ছিল। কেউ কেউ একে ভাগীরথীর পূর্ব তীরে অর্থাৎ কলকাতার দক্ষিণে অবস্থিত বলে মতপ্রকাশ করেছেন। শ্রীপঞ্চানন মণ্ডল বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার অন্তর্গত কুসুমগ্রামই রামচরিতের কোশাম্বী বলে মতপ্রকাশ করেছেন।
কয়ঙ্গলমণ্ডলের অধিপতি ছিলেন নরসিংহাসর্জুন। তার রাজ্যে ছিল কাঙ্গজোল বা কজঙ্গল। বর্তমান রাজমহলের ২০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। চণ্ডার্জুন ছিলেন সঙ্কটগ্রামের রাজা। শ্রীপঞ্চানন মণ্ডলের মতে, বর্ধমান জেলার রায়না থানার অন্তর্গত সংকট নামক গ্রাম হতে শক্তিগড় পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগই প্রাচীন সংকট রাজ্য। আইন-ই-আকবরীতে সাতগাঁও সরকারের অন্তর্গত সকোট পরগনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সম্ভবত বল্লাল চরিতের সংককোট এবং তবকাত-ই-নাসিরীর সঙ্কনাৎ, এই একই সংকট গ্রাম।
বিজয়রাজ ছিলেন নিদ্রাবলীর রাজা। সম্ভবত তিনি সেনবংশীয় রাজা বিজয় সেন। বিজয় সেন ও বিজয়রাজ অভিন্ন বলে গ্রহণ করলে নিদ্রাবলী পশ্চিম বাংলায় অবস্থিত ছিল। বল্লাল সেন-এঁর নৈহাটি তাম্রশাসন থেকে আমরা জানতে পারি, তাঁদের পূর্বপুরুষ রাধা রাজ্যে প্রথমে বসতি স্থাপন করেছিল। সোম ছিলেন পদুবন্বার রাজা। ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ হুগলী, পাবনা অথবা দিনাজপুরকে চিহ্নিত করেছেন। সম্ভবত হুগলী জেলার অন্তর্গত পাউনান পরগনা প্রাচীন পদুবন্বার স্মৃতি বহন করছে বলে আচার্য মজুমদার চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন, বর্তমান পাবনা-র প্রাচীন নাম পদুবন্বা হতে পারে। আর আলোচ্য তৈলকম্প রাজ্য ছিল বিহারের মানভূম জেলায়। রাজা ছিলেন রুদ্রশিখর। আরও পড়ুন… তেলকূপির মন্দির-সমষ্টিতে তিন ধরনের মন্দির দেখেছিলেন বেগলার [পর্ব ৫]

telkupiসন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত হতে জানা যায় যে, বর্ম্মবংশীয় জনৈক রাজা আত্মরক্ষার জন্য নিজের হস্তী ও রথ রামপালকে উপহার দিয়েছিলেন। বর্ম্মবংশীয় এই রাজার এই আচরণের কারণ, রামপাল কর্তৃক পুনরায় বঙ্গ আক্রমণ এবং সেনবংশীয় সামন্তসেন কর্তৃক বঙ্গদেশ অধিকার। খ্রিস্টীয় ১১শ শতাব্দীতে পাল সাম্রাজ্যের নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এর ফলে সাম্রাজ্যের শক্তি অনেকটাই হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। বৃদ্ধবয়সে রামপালদেব তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজ্যপালের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে রামাবতীতে বাস করেছিলেন। তিনি রাজধানী রামাবতী থেকে রাজ্যশাসন করতেন। রামাবতীই পাল সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। রামাবতী অর্থাৎ মুঙ্গের-এ অবস্থানকালে রামপালদেব তাঁর মাতুল মথনদেবের মৃত্যুসংবাদ শ্রবণ করে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েন এবং ব্রাহ্মণদের দানধ্যান করে গঙ্গাবক্ষে সলিলসমাধি গ্রহণ করেন। আরও পড়ুন… জঙ্গলের প্রাচীন প্রবাদ: রাজা বিক্রমাদিত্য তেল মাখতে আসতেন তেলকূপিতে [পর্ব ৬]

telkupiপাল সাম্রাজ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের পরবর্তী ধ্রুপদি যুগের একটি সাম্রাজ্য। বাংলার ইতিহাসে পাল যুগকে অন্যতম সুবর্ণযুগ মনে করা হয়। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে কয়েক শতাব্দীব্যাপী গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে পাল সম্রাটরা বাংলায় স্থিতাবস্থা ও সমৃদ্ধি এনেছিলেন। পূর্বতন বঙ্গীয় সভ্যতাকে তাঁরা উন্নত করে তুলেছিলেন।
পাল সম্রাটরা বাংলার শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রে অসামান্য কীর্তি রেখেছেন। এই সাম্রাজ্যের প্রধান প্রধান শহরগুলি ছিল পাটলীপুত্র, বিক্রমপুর, রামাবতী (বরেন্দ্র), মুঙ্গের, তাম্রলিপ্ত ও জগদ্দল। ‘পাল’ অনুসর্গটির প্রাচীন প্রাকৃত ভাষায় অর্থ ‘রক্ষাকর্তা’। তাঁরা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অনুগামী।
পাল সম্রাটরা ছিলেন প্রাজ্ঞ কূটনীতিবিদ ও যুদ্ধজয়ী। তাঁদের সেনাবাহিনীর বৈশিষ্ট্য ছিল, একটি বৃহৎ যুদ্ধহস্তী বাহিনী। তাঁদের নৌবাহিনী বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করত। পাল সম্রাটরা ছিলেন ধ্রুপদি ভারতীয় দর্শন, সাহিত্য, চিত্রকলা ও ভাস্কর্যশিল্পের বিশিষ্ট পৃষ্ঠপোষক। তাঁরা একাধিক বৃহদায়তন মন্দির ও মঠ নির্মাণ করিয়েছিলেন। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল সোমপুর মহাবিহার। তাঁরা নালন্দা ও বিক্রমশিলা মহাবিহারের পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন।
তাঁদের রাজত্বকালেই প্রোটো-বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটে। তাঁরা বাংলাভাষার ভিত্তি রচনা করেছিলেন। বাংলার প্রথম সাহিত্যকীর্তি চর্যাপদ পাল যুগেই রচিত হয়েছিল। আজও  তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে পাল উত্তরাধিকার প্রতিফলিত হয়। শ্রীবিজয় সাম্রাজ্য, তিব্বতি সাম্রাজ্য ও আরব আব্বাসীয় খিলাফতদের সঙ্গে পাল সাম্রাজ্যের সুসম্পর্ক বজায় ছিল। আরও পড়ুন… খারবেল থেকে সমুদ্রগুপ্ত ৫০০ বছর, তেলকূপির ইতিহাস অন্ধকারের অবগুণ্ঠনে ঢাকা [পর্ব ৭]

বাংলা ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পাল যুগেই বাংলায় প্রথম ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। পাল প্রত্নস্থলগুলিতে আব্বাসিদ মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। তাছাড়া আরব ইতিহাসবিদদের রচিত নথিপত্রেও পাল সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁদের দেশের বাণিজ্যিক ও বৌদ্ধিক যোগাযোগের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ এই যুগেই ভারতীয় সভ্যতার গাণিতিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান-সংক্রান্ত কীর্তিগুলির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল।খ্রিস্টীয় ১২শ শতাব্দীতে হিন্দু সেন রাজবংশের পুনরুত্থানের ফলে পাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। সেই সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বশেষ প্রধান বৌদ্ধ সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। আরও পড়ুন… বরাহভূম বা বরাভূম হচ্ছে পুরুলিয়া, তেলকূপি তারই মধ্যে পড়ে… [পর্ব ৮] 

পাল সাম্রাজের অবশেষে সেন বংশের প্রতিষ্ঠা হয়। কর্ণাট দেশ থেকে আগত সেনবংশ এগারো শতকের শেষদিকে বাংলার পশ্চিমাংশে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বংশের প্রথম পুরুষ সামন্ত সেন। ১০১৫-১১৫৮ খ্রিস্টাব্দ মধ্যে বিজয় সেনের রাজত্বকাল অনুমান করা হয়। সেই সময়ও তৈলকম্প বিজয় সেনের রাজ্য বহির্ভূত স্বতন্ত্র রাজ্য হিসেবে নিজ অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল।। (চলবে)

ছবি: গুগল থেকে।

আরও পড়ুন… তেলকূপির শাসক তৈলঙ্গদের শুল্ক দিতেন! এই তৈলঙ্গ কে বা কারা ছিলেন [পর্ব ৯]

আরও পড়ুন… তেলকূপি রাজবংশটি ছিল শরাক জাতি নির্ভর। রাজ্যটি ছোট, কিন্তু স্বাধীন [পর্ব ১০]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here