মৌনী মন্ডল: ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’, ছোটদের জন্য লেখা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এই উপন্যাসটি পড়েননি এমন পাঠক খুব কমই আছেন। কেউ যদি বিষন্ন মন নিয়ে এই বই পড়তে বসেন, ১০০শতাংশ দাবী রেখে বলা যায় ২পাতা পড়েই আপনার মন হয়ে উঠবে ‘চনমনে’। পরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় সেই উপন্যাস প্রায় অক্ষুন্ন রেখে যে চিত্রনাট্য বানিয়েছেন, হলফ করে বলা যায় অনেকদিন পর দর্শক ‘পুজোর ছবি’র নির্ভেজাল আনন্দ খুঁজে পাবেন এই ছবির মাধ্যমে।

দর্শক ভাবতেই পারেন, চেনা গল্পে নতুনত্ব আর কিই বা থাকবে! আছে, আছে, অনেক কিছুই আছে যা শীর্ষেন্দু বাবুর লেখা বইতে আপনি পাবেন না। একেবারে শুরুতেই অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় নিজের সাবলীল নিজস্বতা রেখেছেন ছবিতে। ছবির নামভূমিকার উপস্থাপনাতেই তিনি রেখেছেন অভিনবত্বের ছোঁয়া। শুধু তাই নয়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ক্যামিও রোল দিয়েই তিনি ঢুকছেন ছবির মূল গল্পে। গল্পের মূল চরিত্র ‘মনোজ’ নিজেই লেখককে প্রশ্ন করেন ‘রূপকথার রাজা-রাণী-গুপ্তধন’ প্রসঙ্গে। লেখক বলেন রূপকথার রাজা-রাণী-রাজপুত্র, আমাদের চারপাশের মানুষেরাই, আর ‘গুপ্তধন’ অন্য কিছুই নয়, আমাদের মনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা। এই কথকপথনের মাধ্যমেই চিত্রনাট্য ঢুকে পড়ে মনোজদের অদ্ভুত বাড়িতে।

চিত্রনাট্য এগিয়েছে এইভাবে, মূলত মনোজ নামের একটি ছোট্ট ছেলেকে ঘিরে এই কাহিনী, তার বাড়ির সবাই বেশ ‘অদ্ভুতুড়ে’ গোছের হলেও, সে আর তার দাদা সরোজ ছিল আর পাঁচজন সদস্যের থেকে এক্কেবারে আলাদা। তাদের নিজস্ব দুনিয়ায় তারা থাকত হারিয়ে। তাদের জগত ছিল ঘুড়ি-লাটাই-ভোকাট্টা-বই পড়া-অ্যাডভেঞ্চারে ভরপুর। মনোজদের বাড়িতে একটা ছবি আছে। একটা হাসি হাসি মুখের ছোট ছেলের ছবি। কেউ জানেনা সেই ছবিটি কার, কিন্তু এই ছেলেটির ছবিটি বরাবর বাড়ির এ্যালবামে রয়ে গেছে। সেই ছবিটি অ্যালবাম থেকে সরিয়ে নিজের কাছে সযত্নে রেখে দেয় মনোজ। ছবিটি নিয়ে তার কৌতুহলের কোনো সীমা নেই। সে নিজের মনে মনেই বানিয়ে ফেলে নানান কল্পকাহিনী। এ তো গেল মনোজের কথা, সে ছাড়াও তাদের বাড়িতে রয়েছে অদ্ভুত স্বভাবের অনেক লোক। যেমন ধরা যাক, মনোজের মাষ্টারমশাই দুঃখহরন বাবুর কথা। যিনি আবার উবু হয়ে না বসলে পড়াতে পারেন না । তাকে যদি কেউ চেয়ার টেবিলে বসিয়ে দেয়, তাহলেই উনি ভীষণ ভুলভাল পড়াতে থাকেন। গানের মাষ্টার গণেশ ঘোষাল, যিনি আবার তাল লয়ে একটু এদিক সেদিক হলেই গলায় দড়ি দিতে যান। আছেন মনোজের বাবা রাখোবাবু, যিনি কথায় কথায় ব্রাহ্মী শাকের রস খান, আর সব কিছু ভুলে যান। রয়েছেন পিসিমা আদ্যাশক্তি, যিনি আবার বুড়ো বয়সে ভীষণ তেজস্বিনী, তাঁর গুলতির নিশানায় ফেল তাবড় তাবড় তীরন্দাজরাও, সারাদিন গোবর জল ছড়া দেওয়া আর আছাড় খাওয়া তার নেশা। মনোজের দু’ই কাকা। বড় কাকা ভজহরিবাবু, লোকে তাঁকে বাজারু বলে ডাকে। বাজার করায় তাঁর সমকক্ষ তল্লাটে নেই। ছোট কাকা বিজ্ঞানী হারাধনবাবু। বাড়িতে তাঁর বিশাল গবেষণাগার। সেখানে তাঁর যত অদ্ভুত অদ্ভুত আবিষ্কার। তাঁর আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে ‘লামড়ো’ আর ‘চাগম’। ধান আর গমের বীজের সাহায্যে ‘চাগম’, আর লাউ ও কুমড়োর বীজের সাহায্যে ‘লামড়ো’ নামের দুটি শংকর জাতের নতুন আবিস্কার করে ফেলেছেন তিনি। ওদিকে পাড়ার ‘গরু খোঁজা’ গোয়েন্দা বরদাচরণ স্বপ্ন দেখেন শার্লক হোমস হওয়ার। মাঝে মধ্যেই পাড়ার এসটিডি বুথ থেকে ফোন করেন ফেলুদাকে। সেই গোয়েন্দাই একদিন মনোজদের বাড়িতে এসে হাজির। তিনি বলেন, হরিনগড়ের রাজার ছেলের ছবি নাকি মনোজদের বাড়িতেই আছে, আর সেটির সন্ধানেই নাকি তিনি এসেছেন। রাজপুত্র কন্দর্পনারায়ণ নাকি খুব ছোট বয়সে হারিয়ে যান। তার সাথে সাথে নাকি উধাও হয়ে যায় রাজকুমারের সব ছবিও। মোটামুটি এরকমভাবেই চলতে থাকে গল্প। রাজবাড়ীর সাথে কি সম্পর্ক মনোজদের বাড়ির? কীভাবে এল সেই ছবি তাদের বাড়িতে? হারানো রাজকুমারকে কি ফিরে পাওয়া গেছিল? সব প্রশ্নের উত্তর দেবে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’।

যেহেতু এই গল্প অনেকেরই চেনা, তাই গল্পের সাসপেন্স হয়তো সেরকম ভাবে অনেকের কাছেই থাকবেনা। কিন্তু অনিন্দ্য যে ভাবে গল্পটিকে পর্দায় উপস্থাপন করেছেন তা সত্যিই প্রসংশনীয়। শিলাজিৎ-এর সঙ্গীত পরিচালনা এই সিনেমার মুড-এর সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলেমিশে গিয়েছে। ‘একটা কাক’ গানটিতে গ্রাফিক্স-এর কাজ যেমন ভালো লাগে, শুনতেও ততটাই মজা লাগে। শোনা গিয়েছিল অভিনেতা আবির চট্টোপাধ্যায় একটি ক্যামিও রোলে রয়েছেন। আরে, কোথায় ক্যামিও? ছবিতে তো বেশ ভালোই ছড়িয়ে আছেন তিনি! একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন তিনি। তাছাড়াও ছবির নতুন চমক, আবিরের গলায় গান। শিলাজিতের কথায় ও সুরে ‘ডাকাত হব আস্তে আস্তে’ গানটি গেয়েছেন আবির। অনেক বছর পর অভিনয়ে সন্ধ্যা রায়কে দেখে ভালো লাগে। রাজা গোবিন্দ নারায়ণ চৌধুরির স্ত্রী রানি মা-র চরিত্রে রয়েছেন তিনি। আর রাজামশাই-এর চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে নতুন করে কিছুই বলার নেই, স্বভাবতই সাবলীল তিনি এখানেও। ছবির প্রথম এবং শেষ দৃশ্যে ক্যামিও করেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। সিনেমায় এটাই তাঁর প্রথম অভিনয় বলা যেতে পারে। দাপুটে পিসিমার চরিত্রে দাপুটে অভিনয় করেছেন সোহাগ সেন। এছাড়াও, রজতাভ দত্ত, ব্রাত্য বসু ও অম্বরীশ ভট্টাচার্য সকলেই দুর্ধর্ষ নিজের নিজের চরিত্রে। মনোজের ভূমিকায় সোহম মৈত্রও বেশ সতন্ত্র।

শেষ বেলায় বলব, গোয়েন্দা গল্পের একঘেঁয়েমি, বাণিজ্যিক সিনেমার নাচ-গান-অ্যাকশনের একঘেঁয়েমি কাটানোর অব্যর্থ ওষুধ বেশ মন দিয়েই বানিয়েছেন পরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। আর বড়পর্দায় ‘নস্ট্যালজিয়া’ নিয়ে কারবার করাতে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিকল্প’ নেই বললেই চলে। তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’-এও তেমনটাই পেয়েছি আমরা। তাছাড়া হাসির ছবি, সাহিত্য নিয়ে ছবি করা অত্যন্ত কঠিন একটি পরীক্ষা, এই পরীক্ষায় একেবারে ‘লেটার’ নম্বর নিয়ে পাস করেছেন অনিন্দ্য। পুজোর দিনে সব ভুলে ‘হো হো’ করে প্রান খুলে হাসতে চাইলে দেখে আসুন ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here