kolkata bengali news

নিজস্ব প্রতিবেদক, বারাসত: অসহায় এক পরিবারে তিন সদস্য। বৃদ্ধ দম্পতি এবং তাদের এক মেয়ে। তাদের সঙ্গে মেয়েও শারীরিক ভাবে অসুস্থ এবং দুর্বল। পরিবারের উপার্জনকারী কেউ নেই। ঘরে নেই একদানা খাবার। রুগ্ন এবং অসহায় তিন জনেরই পয়সা নেই ওষুধ কেনার। উচ্চ শিক্ষিত এই বৃদ্ধ দম্পতি এবং তার মেয়ে বছর দুইয়েক অন্যের কাছে চেয়ে চিনতে কার্যত ভিক্ষে করে চলছিলেন। কিন্তু সাহায্যকারিরা অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। গত দুই সপ্তাহ ধরে অন্যের দেওয়া শুকনো মুড়ি আর বিস্কুট খেয়ে দিন গুজরান করছেন বৃদ্ধ কমল ব্যানার্জি(৮৩), তার স্ত্রী গীতা ব্যানার্জি(৭৮) এবং তাদের উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে গার্গী ব্যানার্জি(৫০)। এক দিকে অনাহার, অন্যদিকে শারীরিক অসুস্থ্যতা। এই দুইয়ের ফলে অসহায় এই পরিবারটির দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই কয়েক দিন আগে জেলা শাসকের কাছে স্বেচ্ছা মৃত্যুর আবেদন জানিয়েছেন বৃদ্ধ দম্পতি এবং তাদের মেয়ে।

সীমাবদ্ধ ক্ষমতা নিয়ে বছর খানেক ধরে এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছেন শ্যামল সরকার নামে এক প্রতিবেশী। কিন্তু তার একার পক্ষেও লাগাতার ভাবে পাশে থাকা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না। তাই তিনিও চান অনেকেই এগিয়ে আসুন অসহায় এই পরিবারটির পাশে। একটা হিল্লে হোক তাদের। চারিদিকে উন্নয়নের মাঝে বারাসতের বানীনিকেতন স্কুল রোডের চার দেওয়ালের একটা ঘরে দিনের পর দিন না খেতে পাওয়া এই অসহায় পরিবারের স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন নিঃসন্দেহে সমাজের কাছে বেমানান একটা ছবি। বারাসত নবপল্লির বাণীনিকেতন স্কুল রোডের ধারে প্রতিমা অ্যাপার্টমেন্ট। তিন তলার ৫৬০স্কোয়্যার ফিটের ছোট্ট এক কামরার ফ্ল্যাট। ঘর জুড়ে ঝুল ঝুলে রয়েছে। কবিগুরুর ছবি, আলমারি, ড্রেসিং আয়না থেকে সর্বত্রই ঝুল আর ময়লায় ভরা। ঘরের দরজা লাগোয়া মেঝেয় বড় একটা কাঠের সিংহাসন। তাতে দেব আর দেবতার অভাব নেই।

এই পরিবারের বাড়িতে ঢুকতেই দেখা গেল খাটের উপর বসে আছেন বৃদ্ধ ব্যানার্জি দম্পতি। খাট জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দারিদ্র্যতার সব কিছু। মুখ ভর্তি এক গাল দাড়ির বৃদ্ধ মানুষটিই কমল ব্যানার্জি। বুকে প্রেসমেকার। বয়স জনিত সমস্যা তো আছেই। চোখে মুখে না খেতে পাওয়ার যন্ত্রনা। তার পাশেই বসা গীতা ব্যানার্জি। কিডনির সমস্যা তার। পা দুটি ফুলে গেছে। কমল ব্যানার্জির এমন অবস্থা কিন্তু ছিল না। তিনি এক সময় দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টে চাকরি করতেন। তার স্ত্রী গীতাও সেখানেই শিক্ষকতা করতেন। তাদের দুই মেয়ে। একজন গার্গী, অন্যজন কস্তুরি। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন সেই ৯২ সালে। তাদের পেনশন ছিল না। চাকরির শেষে এক কালীন যা টাকা পেয়েছিলেন তাই দিয়ে দুই মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিতা করেছেন। তাদের বিয়েও দিয়েছেন। বড় মেয়ে গার্গী নিজে রবিন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ করেছেন। পিএইচডি তার ঝুলিতে। বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে বাবা মায়ের কাছেই আছেন। চাকরির চেষ্টার কসুর করেননি। কিন্তু বিফল হয়েছেন। উপার্জনের অন্য ব্যাবস্থা না থাকায় চাকরি জীবনের টাকা শেষ হতে সময় লাগেনি। শেষ জীবনের চাকরির টাকা থেকেই ৫৬০স্কোয়্যার ফিটের এই ছোট্ট এক কামরার ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন।

কিন্তু গত দুই বছর ধরে চরম দৈন্য অবস্থা তাদের। ছোট মেয়ে কস্তুরি বারাসতের একটা স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনি কিছু সহায়তা করতেন বৃদ্ধ বাবা মায়ের জন্য। কিন্তু সেটাও এখন করেন না বলেই জানিয়েছেন বৃদ্ধ দম্পতি। হাতে একটা পয়সা নেই। অথচ তিন জনের পেট। তাই বাধ্য হয়েই প্রতিবেশী থেকে পথ চলতি মানুষের কাছে হাত পাততে হত বৃদ্ধ দম্পতি এবং তাদের মেয়ে গার্গীকে।

গার্গী এদিন জানালেন, ‘আমি শিক্ষিত। একটা যে কোন কাজের জন্য অনেকের কাছে গিয়েছি। আমাদের দুরবস্থার কথা জানিয়েছি। প্রতিশ্রুতি মিলেছে কিন্তু কাজ হয়নি। বাবা মায়ের বয়স হয়েছে। শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার থেকেই শরীরে বয়স জনিত রোগ বাসা বেঁধেছে। তাদের জন্য খাবারের ব্যাবস্থাই করতে পারছি না। তো ওষুধ দেব কোথা থেকে। নিজেকে খুব অসহায় লাগে এক এক সময়। গত বছর এক টানা ২০দিন ভাত খেতে পারিনি। বিদ্যুতের বিল দিতে না পারার জন্য সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। আট মাস বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিলাম। পরিচিত এক জনের কাছ থেকে টাকা ধার করে বিদ্যুতের বকেয়া শোধ করি। এক বার তো বারাসতের ১২ নম্বর রেলগেটে দাঁড়িয়ে ভেবেছিলাম ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে শেষ করে দিই। কিন্তু পারিনি। বেঁচে থাকার আর কোন উপায় না পেয়ে তাই বাধ্য হয়েই জেলা শাসকের কাছে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন জানিয়েছি গত ৩০ জুলাই।’

অন্যদিকে কমলবাবু জানালেন, ‘আমাদের চাকরিতে পেনশন ছিল না। চাকরির শেষে যা টাকা পয়সা পেয়েছিলাম তাই দিয়ে দুই মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দিতেই খরচ হয়ে গিয়েছে। অল্প কিছু টাকা দিয়ে থাকার জন্য এই ফ্ল্যাটটি কিনেছিলাম। এখন একটা পয়সাও নেই হাতে। বাধ্য হয়ে ভিক্ষে করতে হচ্ছে। কিন্তু সেটাও আর কত দিন সম্ভব। প্রতিবেশী শ্যামল সরকারের সাহায্যের জন্য কোন ভাবে আছি। চোখে জল নিয়ে বৃদ্ধ বলেন জানেন গত দুই সপ্তাহ ধরে শুকনো মুড়ি আর বিস্কুট খেয়ে আছি।’ এই কথা বলতে বলতেই হাত জোর করে কাঁদতে লাগলেন তিনি।

বৃদ্ধ দম্পতি এখন খড়কুটোর মতো প্রতিবেশী শ্যামল সরকারকেই আঁকড়ে ধরেছেন। সেই শ্যামলবাবু জানালেন, ‘এক দিন দেখি এক মহিলা সকালে বাড়ির সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে পথ চলতি মানুষের কাছে হাত পাতছেন। জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেন টানা ২০দিন তারা ভাতের মুখ দেখেননি। শুনে খুব কষ্ট হল। ওনাদের জন্য আমার সামর্থ অনুযায়ী কিছু চাল, ডালের ব্যাবস্থা করি। কিন্তু একার পক্ষে সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের সকলেরই উচিৎ এই অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।’ বারাসত পুরসভার চেয়ারম্যান সুনিল মুখার্জি বিষয়টি শুনে অসহায় পরিবারটিকে পুরসভায় গিয়ে দেখা করতে বলেছেন। বার্ধক্য ভাতার ব্যবস্থা করে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে দেবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here