ফার্সি ও সংস্কৃত পণ্ডিত শাহাজাদা দারা শিকোহর বইমহলে

0
dara shikoh

ইসক্রা রায়: কখন কোন গলির ভেতর থেকে, রাস্তার কোন এক অচেনা বাঁকে, বা প্রতিদিনের চলার পথে কোথায় যে কোন ইতিহাস আর তার কোন গল্প লুকিয়ে আছে, তা বলা মুশকিল। আর এই লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের গল্পগুলির ভেতরে হয়তো এমন সব মণিমাণিক্য লুকিয়ে থাকে যে, তাকে খুঁজে পাওয়ার পরে অবাক হওয়া ছাড়া আর কিছু বাকি থাকে না। দিল্লি এসে ইস্তক এরকম কত কিছু যে খুঁজে পাই আর কত কিছু খুঁজতে গিয়ে অন্য গল্পের সন্ধান পাই তার শেষ নেই। এবার সেই গল্পের ঝুড়িতে যুক্ত হয়েছেন মুঘল সলতনতের বাদশাহ না হতে পারা এক শাহজাদার গল্প। ভারতের ইতিহাসে যদিও তিনি অপরিচিত নন, বরং খুব বেশি ভাবেই তাঁকে মনে রাখে ইতিহাস। যতটা তাঁর বাদশাহ না হতে পারার জন্য, তার চেয়ে বেশি হয়তো তাঁর শিল্প, আর পঠন-পাঠনের জন্য। বলা হয়, হুমায়ুনের পরে সলতনতে তিনিই এমন ব্যক্তি ছিলেন, যাঁকে পুস্তকপ্রেমী বললে অবাক হতে হয় না।

dara shikohহ্যাঁ, ঠিকই অনুমান করেছেন, তিনি দারা শিকোহ, যাঁকে শাহজাহান নিজের উত্তরসূরি হিসাবে স্বীকৃতি দিলেও তামাম হিন্দুস্থানের সুলতান হওয়া তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। ভাইয়ের কাছে যুদ্ধে পরাজিত সেই শাহজাদার কবরের সঠিক হদিস আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি। কেউ বলেন, মুঘল সলতনতের আর এক পুস্তকপ্রেমী রাজা হুমায়ুনের কবরের কাছেই দাফন, আবার কেউ বলেন, নাহ, দিল্লির মাটি আজমেরে জন্মানো শাহজাদার নসিব হয়নি, লাহোরের কোথাও অজানা জায়গায় চিরনিদ্রায় শায়িত তিনি। তবে সে সব নয়, আজকের গল্প দারা শিকোহ আর তাঁর পুস্তকপ্রেম।

dara shikohবলা হয়, ফার্সি ও সংস্কৃত পণ্ডিত শাহজাদা দারা শিকোহর বইয়ের কালেকশন নাকি ছিল দারুণ। প্রপিতামহ হুমায়ুনের মতো তাঁরও নাকি ছিল বিশাল লাইব্রেরি। হুমায়ুন তাঁর প্রাসাদের নিজস্ব লাইব্রেরির সিঁড়ি থেকে পড়েই মারা যান বলে জানা যায়, যদিও সেই লাইব্রেরি হদিস পাওয়া যায় না। কিন্তু দারার লাইব্রেরি আগ্রা ও দিল্লি দু’জায়গাতেই নাকি ছিল। আর এসব পড়তে পড়তেই খবর পেলাম, দারা শিকোহর দিল্লির লাইব্রেরিটি আজও আছে। যদিও বহু হাতবদলের পরে তার আগের চেহারা খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে সেটি এখনও লাইব্রেরি হিসাবেই নাকি আছে আর সেটি ভারতের পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগের অধীনে। এই খবর পাওয়া ইস্তক সেই লাইব্রেরি এক দুর্নিবার আকর্ষণে টানতে থাকে।

dara shikohতাই এক রবিবাসরীয় বিকেলে দারা শিকোহর সেই বইমহলের উদ্দেশে পাড়ি দিই। এবারও যাওয়ার পথ সেই দিল্লি মেট্রো, আর কী অদ্ভুত, দিল্লি মেট্রোর অন্যতম বা বলা ভাল পুরনো স্টেশন কাশ্মীরি গেটের কাছেই সেই লাইব্রেরি। ইতিহাস যেন তার কাছে যাওয়ার পথকেও গল্পে মুড়ে রাখতে চায়। এখন দিল্লি মেট্রোর তিনটি লাইনের ক্রসিং এই কাশ্মীরি গেটের মেট্রো স্টেশন। এখানে ইয়েলো লাইন, রেড লাইন আর ভায়োলেট লাইন– তিনটি লাইনে ডিরেক্ট যাওয়া যায়। এই স্টেশনে নেমে একনম্বর গেট দিয়ে বেরিয়ে কিছুটা হেঁটে গেলেই পাওয়া যাবে দারা শিকোহর লাইব্রেরি। এই পথে আছে ইতিহাসের আরও কিছু গল্প, এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে ডানদিকে দেখা যাবে কাশ্মীরি গেট, যা তদানীন্তন রাজধানীর প্রধান গেটগুলির মধ্যে একটি ছিল। গেটের চারদিক অবশ্য এখন ভাঙা, তবে মূলগেটটি রেনোভেট করে রাখা হয়েছে। ব্যস্ত দিল্লির পথে সে যেন না জানা গল্পের সন্ধান দিতে আজও দাঁড়িয়ে আছে। আর মহাবিদ্রোহের সময়েও এই গেটের কিছু ঘটনা আর গল্প আছে।

dara shikohএই পথে আরও কিছুটা এগোতে বাঁদিকে দেখা যাবে দিল্লির এক প্রাচীন চার্চ, যে চার্চের ভেতরেই আছেন সিকান্দর সাহাব, শ্রীপান্থর ঐতিহাসিক অনৈতিহাসিক পড়া থাকলে সে গল্প বুঝতে সুবিধা, তবে সে গল্প অন্য কোনও দিন। আপাতত এই চার্চ বাঁদিকে ধরে কিছুটা সোজাসুজি হেঁটে এগিয়ে গেলে বাঁদিকের এক ছোট্ট টার্নের সামনে দেখা যাবে ‘আম্বেদকার ইউনিভার্সিটি’র গেট। এই গেটের ভেতরেই আছে সেই লাইব্রেরি। শাহজাদার লাইব্রেরি। ব্যস্ত দিল্লির কোলাহলের ঠিক মাঝখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছত্রছায়ায় না জানা অসংখ্য ইতিহাসের গল্প নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। মেন গেট দিয়ে ঢুকে ডানদিকে একটি প্যাসেজের মতন কন্সট্রাকশান। সামনে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেলেই দারা শিকোহ লাইব্রেরি। যদিও এখনকার লাইব্রেরিটি দেখে সেই সময়ের কন্সট্রাকশানের কিছু বোঝার উপায় নেই, ইন্দো-ইউরোপিয়ান এই কন্সট্রাকশান অনেক পরে নির্মিত, এই লাইব্রেরি এখন ভারতের পুরাতত্ত্ব বিভাগের অন্তর্গত।

dara shikoh১৬৩৭ সালে এই লাইব্রেরি তৈরি করেন দারা শিকোহ। পরবর্তীতে মুঘল সাম্রাজ্যের আলি মুর্দ খানের বাসস্থান হয়, আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে David Ochterlony-ও থেকেছেন এখানে, এর পরে আরও কিছু হাতবদলের পরে আপাতত এটি ভারতের পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের অন্তর্গত। শোনা যায়, এর ভেতরে এখনও কিছু বই নাকি অবশিষ্ট আছে সেই সময়ের। রেনোভেশনের জন্য বন্ধ লাইব্রেরির ভেতরে যাওয়া সম্ভব না হলেও লাইব্রেরি গার্ড (শত অনুরোধেও নিজের নাম জানাননি, কিন্তু তিনি না থাকলে লাইব্রেরি ছোঁয়া যেত না তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা) জানান যে, এই লাইব্রেরি সবার জন্য খোলা থাকে। কোনও টাইম লিমিট নেই। কয়েকমাস পরেই আবার দরজা খুলে যাবে সবার জন্য। জানি না আবার আসা হবে কি না। কিন্তু পড়ন্ত আলোয় লাইব্রেরির ভেতরের কাঠের দরজা দেখে মনে হল, হয়তো দরজার ওপারে এই সময়ে নিজের পছন্দের বই পড়ছেন দারা, তিনি চান না এখন কেউ তাঁকে বিরক্ত করুক। নাই বা হতে পারলেন সুলতান, কিন্তু আদপে তো তিনি মুঘল সলতনতের শাহজাদা, এভাবে কেউ কী ছোঁয়া পাবে তাঁর? সেও কি সম্ভব? তবে দারা শিকোহর লেখা বা বই দেখতে চাইলে কিন্তু কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের ভেতরের সংগ্রহশালায় তা দেখা যায়।

ফিরে আসার সময়ে মনে হল, ১৬৩৭ সালের কোনও ছাপ এখানে খুঁজে না পাওয়া গেলেও আজও যেন নিজের মাঝে এখানে আছেন দারা শিকোহ। দারা শিকোহ মুঘল সাম্রাজ্যের এক ট্র্যাজিক শাহজাদা হয়ে থেকে গেলেও, তাঁর পুস্তকপ্রেম যেন আজ মুঘল থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শেষে স্বাধীন ভারতের গণতন্ত্রেও তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে দারা শিকোহ লাইব্রেরি মাঝে।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here