২৩৯ বছর আগে হুগলির গুপ্তিপাড়া গড়েছিল এক অনন্য ইতিহাস

0
shikdar durga puja kolkata bengali news

সৌভিক বাগচী: সময়টা নেহাত কম নয়৷ বেশ দীর্ঘ৷ বাংলায় দুর্গাপুজোর ইতিহাস গাঁটলে দেখা যায় আজকের এই বারোয়ারি দুর্গাপুজোর প্রচলন হতে অন্তত তিন’শ বছরেরো বেশি সময় লেগেছিল বাংলায়৷ তবে এর চল কিন্তু প্রথম শুরু করেছিল এপার বাংলা(অধুনা পশ্চিমবঙ্গ)৷ সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিত্তশালী জমিদার এবং বাবুদের প্রভাব প্রতিপত্তি আস্তে আস্তে ফিকে হতে থাকে। সেইসময় বাংলা তথা ভারত এক অদ্ভুৎ যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে৷ এক দিকে মোগল সাম্রাজ্যের জীর্ণ দশা৷ অন্যদিকে ব্রিটিশদের উত্থান৷  জব চার্নক কলকাতা তৈরির একশ বছর হয়ে গিয়েছে৷ তখনও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজ করছে বাংলায়৷ ব্রিটিশরা পুরোপুরি নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারেনি  সেই সময়৷ ব্রিটিশদের পা চাটা নব্য বাঙালি বড়লোকদের বড়লোকি তখন রমরমিয়ে চলছে কলকাতায়৷ কিন্ত অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সামন্ততন্ত্র একটু একটু করে ক্ষয় হতে শুরু করেছে৷  এমনই এক সময় শুরু হয় বাংলায় বারোয়ারি দুর্গাপুজো৷

 

সালটা  ১৭৯০   হুগলি জেলার বলাগড় থানার গুপ্তিপাড়ার (অনেকের মতে, জায়গাটির আসল নাম গুপ্তবৃন্দবন পাড়া) এক দুর্গা পুজো অর্থাভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। তখন পাড়ার বারোজন বন্ধু মিলে সেই দুর্গা পূজা নতুনভাবে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। উর্দু ভাষায় বন্ধুকে বলা হয় ‘ইয়ার’। আর সেই বারো জন ইয়ার মিলে যে দুর্গা পূজার শুরু করেন, তাকে বারোইয়ারী পূজা বা বারোয়ারি পূজা বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।  ইতিহাসে এই পূজাকে প্রথম ‘সার্বজনীন’ দুর্গোৎসব বলা হলেও তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে এটি এমন এক পদক্ষেপ ছিল, যা শুধুমাত্র উৎসবই ছিল না, ছিল সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে একরকম বিদ্রোহ। শোনা যায়, এ পূজার পৌরহিত্য না করার জন্য ব্রাহ্মণদের চাপ দেওয়া হয়েছিল। তখন এ পুজো সম্পন্ন করার জন্য এক নবীন ব্রাহ্মণ এগিয়ে এসেছিলেন। এই বারোয়ারি পূজার মধ্যে দিয়ে দুর্গা পূজা জমিদারদের প্রাসাদ থেকে বের হয়ে এসে আমজনতার উৎসব হিসেবে প্রথম পরিচিতি পেতে শুরু করে। দেবী হয়ে ওঠেন সার্বজনীন।

 

এই ভাবে একক উদ্যোগের দুর্গাপুজো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হলো একাধিক জনের পুজোতে। বিত্তবানদের বাড়ি ছেড়ে দুর্গা পুজো সর্বসাধারণের হয়ে উঠতে শুরু করলো। গুপ্তিপাড়ার পূজা অনুসরণ করে মফস্বল এলাকাগুলোয়, এমনকি গ্রামে-গঞ্জে এই বারোয়ারি পুজো জনপ্রিয় হতে থাকে। তবে শহর এলাকায় বারোয়ারি দুর্গাপুজোর প্রচলন হতে বেশ সময় লেগেছিল৷  তবে দুর্গা পুজোর সার্বজনীন  রূপ পেতে আরও এক শতক সময় লেগেছিল৷ এই পুজো শুরুতে আজকের মতো এতটা গণতান্ত্রিক ছিল না৷ জনতার হাতে পুজোর রাশ আসেত লেগেছিল আরও দীর্ঘ সময়৷

আঠারো শতকের শেষের দিকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ধনী লোকের বাড়ির দুর্গা পুজোর  সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। আজকের দিনের বিচার করলে চলবে না৷ সেই আমলে কিন্তু ধনী গরিবের ব্যবধান ছিল চোখে পড়ার মতো। উনিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলায় হিন্দু সমাজে নব জাগরণ ঘটতে থাকে। এসময় রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, ঈশ্বচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিদের হাত ধরে বাংলায় নানা সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। চারদিকে লেগে যায় সমাজ সংস্কারের ঢেউ। অনেক যুবক ইংরেজি ও পাশ্চাত্য ধারার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজের নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।

 

১৯ ও ২০ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বাংলায় ছিল অগ্নিযুগ৷ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লবীরা মা দুর্গার মাঝে পেতেন লড়াই করার উদ্দীপনা৷ আর সেই সময় তাই দুর্গাপুজোতেও তার প্রভাব পড়ত৷ সাধারণ পরিবারের সন্তানেরা শিক্ষিত হওয়ায় সমাজ সংস্কারে তারা অগ্রণী ভূমিকা নিতে থাকে, তেমনি তাদের মধ্যে স্বাধীনতা চেতনারও বিকাশ ঘটতে থাকে। ইংরেজদের অপশাসনের বিরুদ্ধে এসব শিক্ষিত সমাজের ক্ষোভ দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঘটতে থাকে ছোটখাটো বিদ্রোহ আর প্রতিবাদী আন্দোলন। এই সময়টায় স্বদেশী আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলা। এসব আন্দোলন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মাঝে দূরত্ব কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। এসময় ব্যাপক হারে শিক্ষার প্রসার ঘটায় ধনী-দরিদ্রের সামাজিক বিভাজনও অনেকটাই কমতে থাকে।

 

নতুন ধ্যান-ধারণা নিয়ে১৮৩২ সালে কোলকাতায় সর্বপ্রথম বেশ ঘটা করে বড় আকারের বারোয়ারি দুর্গা পূজার আয়োজন করা হয়। এই পূজার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন কাশিমবাজারের রাজা হরিনাথ। ১৯১০ সালে এই বারোয়ারি পূজা ‘সার্বজনীন দুর্গা পূজা’র রূপ নেয়। এক্ষেত্রে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলে আদিগঙ্গার তীরবর্তী বলরাম বসু ঘাট রোডের বাসিন্দারা প্রথম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এখানকার কয়েকজন যুবক ও ব্যবসায়ী মিলিত হয়ে ‘ভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। সমিতির সদস্যেরা সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলে সার্বজনীন দুর্গো পূজা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। এই সমিতির উদ্যোগে ১৯১০ সালে সার্বজনীন দুর্গা পূজা শুরু হয়। কোলকাতা শহরের এই বারোয়ারি পূজা প্রথম সার্বজনীন দুর্গো পূজা হিসেবে পরিচিতি পায়।  ১৯১৩ সালে সিকদার বাগান নামক স্থানে এবং ১৯১৯ সালে নেবু বাগানে স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে সার্বজনীন দুর্গো পূজার আয়োজন করা হয়। এভাবে সারা বাংলায় সার্বজনীন দুর্গা পূজার চল শুরু হয়। আর সার্বজনীন এই পূজা সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিতে খুব একটা দেরি হয়নি। দুর্গা পূজার এই সার্বজনীন আয়োজন সমাজের নানা স্তরে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। পরবর্তীকালে ‘সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব’ হিসেবে তা বাংলার সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। আজকের থিম পুজো সেইসময় না থাকলেও বাংলা বিশেষ করে কলকাতার মাটিতে পরাধীন ভারতে একটাই থিম ছিল -তা হল স্বাধীনতা৷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here