galpo

কলকাতা শহরের বাইপাসের ধারেই বহুতল আবাসনের আটতলায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল ওরা। ওরা মানে হরপ্রীত আর সিঁধু, দুই পাঞ্জাবি যুবক। সেক্টর ফাইভে চাকরি করত ওরা। প্রতিদিনই গভীর রাতে অফিসের গাড়ি ওদের ড্রপ করে দিত আবাসনের গেটের সামনে। প্রায় বছর ছয়েক আগের ঘটনা। মাত্র সপ্তাহখানেক ওরা রেন্টে এসেছিল আমাদের আবাসনে। দিনের অনেকটা সময় ঘুমিয়ে দুপুরে ওরা অফিস যেত আর অনেক রাতে ফ্ল্যাটে ফিরত। স্বাভাবিকভাবেই আবাসনের বাসিন্দাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ওদের সেভাবে হয়নি।

রাত আড়াইটে নাগাদ অফিসের গাড়ি আবাসনের গেটের সামনে ড্রপ করে দিলে সিকিউরিটি মেইন গেটের তালা খুলে দিয়েছিল। হরপ্রীত আর সিঁধু নিজেদের ব্লকের সামনে এসে দেখেছিল, ওখানে সিকিউরিটি ঘুমোচ্ছে। সিকিউরিটিকে ডেকে নিজেদের বিল্ডিংয়ের গেটের তালা খুলিয়ে লিফটে করে আটতলায় পৌঁছে সিঁধু চাবি দিয়ে দরজার লক খুলল। হরপ্রীত জুতোর লেস খুলছিল। সিঁধু লাইটের সুইচে হাত দেওয়ার আগেই, লবির যে লাইট ফ্ল্যাটের মধ্যে ঢুকেছে তাতে স্পষ্ট দেখতে পেল বছর ছয়-সাতের একটি বাচ্চা মেয়ে ঘরের এককোণে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। একই সঙ্গে হরপ্রীতও তাই দেখল। সিঁধু দরজা জোরে টেনে বন্ধ করে ভয়ঙ্কর এক আতঙ্কে হরপ্রীতের হাত ধরে নিচে নেমে এল। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ, ওই প্রবল ঠান্ডাতেও ঘামছে ওরা, গলার স্বরে কাঁপুনি। চার-পাঁচজন সিকিউরিটি ততক্ষণে এসে জড়ো হয়েছে। সবাই মিলে আটতলার ফ্ল্যাটের সামনে চলে এল। সিঁধু কাঁপা হাতে আবার দরজার লক খুলল। নাহ, কেউ তো নেই! লাইট জ্বালাল সব ঘরের। তন্নতন্ন করে খুঁজল কিচেন, বাথরুম, ব্যালকনি– কোথাও কোনও বাচ্চা নেই। তবে, তবে কী! চোখের ভুল! কিন্তু স্পষ্টই তো দেখল দু’জনের দু’জোড়া চোখ একই জিনিস।

আমি আবাসনের পুরনো বাসিন্দা। প্রতিদিনের মতো সকালে জিমে গিয়েছিলাম। ওখানে ঘটনাটা শুনলাম। আমার মতো আরও চার-পাঁচজন মহিলা, যারা প্রথম থেকেই আবাসনে আছি, তারা ঘটনাটি শুনে খুব একটা অবাক হলাম না। কারণ সেদিনের ঘটনার আড়ালে যে একটি মর্মান্তিক ঘটনা জড়িয়ে আছে, তা আমরা জানতাম। বি ব্লকের আটতলার আটশো তিন নম্বর ফ্ল্যাটটি ছিল মিসেস অনিতা আর শেখর শেঠির। ওদের মেয়ে গুড়িয়া জন্মেছিল ওরা এই ফ্ল্যাট কিনে আসবার পরই। ছোট্ট গুড়িয়াকে আমরা কত আদর করেছি, কোলে নিয়েছি। আবাসনের অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে গুড়িয়াকে পার্কে খেলতে দেখেছি। স্কুলবাস ড্রপ করে দিয়ে গেলে মায়ের হাত ধরে লাফাতে লাফাতে গুড়িয়াকে নিজেদের বিল্ডিংয়ে যেতে দেখেছি। সেই গুড়িয়া, ওর তখন বছরছয়েক বয়স। মা-বাবার সঙ্গে বাই কার নর্থ বেঙ্গল বেড়াতে যাচ্ছিল। কিন্তু ভয়াবহ রোড অ্যাক্সিডেন্টে গুড়িয়ার মৃত্যু হয়। মিসেস ও মিস্টার শেঠিও গুরুতর আঘাত পান। বেশ কিছুদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর তারা মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসেন। কিন্তু এরপর তারা গুড়িয়ার স্মৃতিজড়িত এ ফ্ল্যাটে আর আসেননি।

শোনা যায়, তারা কলকাতা ছেড়েই চলে গেছেন। বেশ কিছু বছর তালাবন্ধ থাকার পর ফ্ল্যাটটি বিক্রি করা হয়েছে। যে ভদ্রলোক বর্তমানে ফ্ল্যাটটির ওনার, তিনি ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়েছেন। সেদিন এবং তার পরও কয়েকদিন আবাসনের বাসিন্দাদের মধ্যে যেখানেই দেখা হয়েছে, এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ছোট্ট গুড়িয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যুর সঙ্গে গুড়িয়াদের ফ্লাটেই অত রাতে কাঁদতে দেখা বাচ্চা মেয়েটির মিল খুঁজে আমরা সবাই নির্দিষ্ট একটি ধারণায় আসতে চেয়েছিলাম। আর হরপ্রীত ও সিঁধুর সঙ্গে কথা বলে পরদিনই আমরা ওদের অন্য ফ্ল্যাট রেন্ট নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here