ডেস্ক: পরিবারের কোনও আপনজন বা পরিচিত কারোর মৃত্যু হলে ছোটবেলায় বাবা-মা বলতেন তারা আকাশের তারা হয়ে গেছেন৷ নিষ্পাপ শিশুমন সেই কথাই অবিলম্বে বিশ্বাস করে নিত৷ কিন্তু ধীরে ধীরে বড় হওয়ার পর কঠিন বাস্তবটা উপলব্ধি করতে করতে সেই ভাবনা চলে যায় অচিরেই৷ এখন আর কেউ বোকা বানাতে পারেনা৷ এখন জানা হয়ে গেছে, মৃত্যুর পর কোনও মানুষের পার্থিব কোনও অস্তিত্ব থাকেনা৷ কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, যদি অন্য কারোর মধ্যে দিয়ে আপনজনকে বাঁচিয়ে রাখা যায়? আর এর চেয়েও বড় প্রশ্ন, আদতে কি এমনটা সম্ভব? এই প্রশ্নেরও উত্তর আছে জগতে৷ না কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই৷ আছে শুধুই বিশ্বাস৷ আর কথাতেই তো আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর৷

কাছের মানুষকে আমরা কেউই হারাতে চাইনা৷ কিন্তু ভবিতব্য বড়ই নিষ্ঠুর৷ যে যাওয়ার সে যাবে, এই সহজ ভাবনা বলা সহজ হলেও মেনে নেওয়া কিন্তু বড়ই কঠিন৷ এমন পরিস্থিতিতে কতজনই আছেন যারা নিজেদের ঠিক রাখতে পারেন? প্রাণের মানুষটার হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণাকে পাথর দিয়ে চেপে অন্যের জন্য ভাবতে পারেন? আছেন, এমন মানুষেরও সন্ধান মেলে৷

গত ১০ সেপ্টেম্বর ভয়ানক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন সুরাটের বাসিন্দা বছর আঠারোর মিহির প্যাটেল৷ দ্রুত গতিতে আসা ট্রাক পিষে দিয়ে চলে যায় তাকে৷ দুর্ঘটনার পর তড়িঘড়ি তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে পরিবারের সদস্যরা৷ কিন্তু ভর্তির পরমূহূর্তেই চিকিৎসকরা জানান মিহিরের মাথায় ক্লট হয়েছে৷ এর দুদিন বাদেই মারা যায় মিহির৷ বাড়ির ছেলের অকাল মৃত্যুতে স্বভাবতই শোকে ভেঙে পড়ে পরিবার৷ কিন্তু পরিবারের সদস্যেরা তৎক্ষণাৎ একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন৷ নয়ডার গোবিন্দ মেহরার তখন হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। বেশি না ভেবেই গুজরাটের সুরাটের মিহিরের হৃদযন্ত্র নয়ডার গোবিন্দের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করে মিহিরের পরিবার৷ আপনজনকে অন্যের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় বেশি সময় নষ্ট করেনি তারা৷ কিন্তু এই মহৎ ভাবনায় সমস্যা তৈরি করে শুধুমাত্র একটি জিনিস, সুরাট থেকে নয়ডার দূরত্ব৷ এই দূরত্বকে ‘নিয়ন্ত্রণে’ আনতে তৈরি করা হয় গ্রীন চ্যানেল৷ এর মাধ্যমে মাত্র ১২০ মিনিটে ১২০০ কিমি পথ অতিক্রম করে মিহিরের হৃদযন্ত্র পৌঁছে যায় নয়ডায়, গোবিন্দের কাছে৷ শুধুমাত্র হৃদযন্ত্র নয়, মিহিরের কিডনিও প্রতিস্থাপন করা হয়৷ সুরাটের সঞ্জয় কানানি ও আমেদাবাদের এক কিশোরের দেহে প্রতিস্থাপিত হয় তার কিডনি৷

হালে শহর এবং শহরতলিতে মৃত্যুর পর দেহদান অথবা অঙ্গদানের হার বেড়েছে৷ আমাদের কলকাতা শহরেও এরকম নজির কম নেই৷ এসবেরই মাঝে সুরাটের এই ঘটনা জায়গা করে নিয়েছে মানুষের মনে৷ আপনজনকে চিরতরে না হারানোর তাগিদে কিছু পদক্ষেপ অন্যকারোর জীবনে আশার আলো নিয়ে আসে৷ সেই আলোতেই হয়তো কিছু মানুষ তাদের প্রাণের মানুষটিকে দুচোখ ভরে দেখতে পান৷

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here