kolkata news

 

সিরাজুল ইসলাম

কত ধর্মের মানুষ ভারতে বসবাস করেন, তা বলা মুশকিল। তবে এটা বলা যায়, বিশ্বের আর কোনও দেশে বোধহয় এত ভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বাস করেন না। নানা ধর্মের মানুষের নানা আচার থাকাই স্বাভাবিক। যে যার ধর্মীয় আচার পালন করবেন তার নিজের মতো করে- এটাই নিয়ম। ভারতবর্ষের মতো দেশে যুগ যুগ ধরে সেটাই হয়ে আসছে। একের সঙ্গে অন্যের সম্পর্কের বাঁধন এত দৃঢ় যে, কোনওদিন ছিন্ন হয়ে যায়নি। তবে আলগা হয়েছে কখনও কখনও। আবার তা শক্ত হয়ে ফিরে এসেছে। এই যেমন এখনকার পরিস্থিতিতে সেই ছবি বারবার দেখা যাচ্ছে। আর তা সম্ভব হয়েছে করোনার মতো মারণ ভাইরাসের ‘দৌলতে’। এই সময় মানুষ ভেদাভেদ করছে না- কে হিন্দু কে মুসলমান। সবাই আমরা মানুষ- এটাই এখন সবার চিন্তা-ভাবনায় ফুটে উঠছে। দেখা যাচ্ছে মানবতার ধর্ম। যে ধর্ম চিরন্তন।

করোনাকে হারাতে এখন চলছে লকডাউন। আর এই লকডাউনে মানুষের জীবনে নেমে এসেছে দুঃসহ পরিস্থিতি। আর সেই কঠিন সময়ে শুরু হয়েছে মুসলমানদের রমজান। এমনিতেই এখন নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তরাও কঠিন পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই ঠিকমতো দু’বেলা খাবার জোটাতে পারছেন না। আর সেই আবহে রমজান শুরু হওয়ায় আরও শোচনীয় অবস্থা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজনের। এমনিতেই এই মাসে খাবার-দাবারের কারণে একটু বাড়তি খরচ হয় প্রতিটি পরিবারে। যে যার সাধ্যমতো জোগাড় করে রমজান পালন করেন। লকডাউনের জন্য সেইসব পরিবার এখন কী করবে, তা ভেবে উঠতে পারছে না। ধর্মীয় ভেদাভেদ না করে এই সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগে সবার জন্য বিলি করা হচ্ছে নানান ত্রাণসামগ্রী। সংখ্যালঘুরা বাদ নেই সেই ত্রাণপ্রাপ্তি থেকে। রমজানের শুরুতে মন ভাল করা কয়েকটি ঘটনা ঘটল। যা কঠিন এই দুঃসময়ে নতুন করে বাঁচার বড় প্রেরণা হয়ে রইল।

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন দুঃস্থ মানুষের সেবাকাজে নিজেদের বরাবরই নিয়োজিত করে রেখেছে। মহামারি বা বড় কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে অসহায় মানুষের পাশে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে সর্বদা ঝাঁপিয়ে পড়ে এই প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে এবার দুই হাজার সংখ্যালঘু পরিবারকে দেওয়া হল ইফতার সামগ্রী। চলতি রমজান মাসে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের তরফ থেকে আরও ইফতার সামগ্রী বিলি করা হবে বলে জানিয়েছেন সন্ন্যাসীরা। বাগবাজার রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন থেকে পাওয়া ইফতার সামগ্রী দিয়ে রোজা খুলছেন সংখ্যালঘুরা- যা সত্যি মন ভাল করে দেওয়ার মতো ঘটনা। মনুষ্য সমাজের জন্য এ এক সত্যিই ইতিবাচক প্রাপ্তি।

লকডাউনের কারণে এই রাজ্যে আটকে পড়েছেন ভিনরাজ্যের বহু মানুষ। অনেকেই যেমন কষ্টের মধ্যে আছেন, আবার অনেকের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে রাজ্যবাসী। তেমনই দুই কাশ্মীরি যুবক এই মুহূর্তে আটকে আছেন বর্ধমান শহরের ভাতছালায়। শাল বিক্রি করার জন্য তারা এই রাজ্যে এসে শহরের এক হিন্দু পরিবারের বাড়িতে কয়েক মাসের জন্য ভাড়া ছিলেন। তারপর শুরু হয়ে যায় লকডাউন। ফিরতে পারেননি ওই দুই যুবক। সঙ্গে থাকা টাকা এখন প্রায় শেষ। এমন অবস্থায় চলে এল রমজান। কী করে রমজানের ব্রত পালন করবেন ওই দুই যুবক, তা নিয়ে তারা চিন্তায় পড়ে যান। অবশ্য সেই চিন্তা তাদের বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কারণ যে বাড়িতে ওই দুই যুবক ভাড়া আছেন, সেই বাড়ির কর্ত্রী তাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছেন মানবতার হাত। তিনি ওই দুই যুবকের রোজা পালন করার সমস্ত আয়োজন করেছেন। আগামী এক মাস তারা ওই মহিলার দেওয়া খাবার খেয়ে রোজা খুলবেন। একটি হিন্দু পরিবারে বসে রোজা খুলে নামাজ পড়ছেন দুই মুসলিম যুবক- এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। সবকিছুর ঊর্ধ্বে যদি মানবতাই বড় ধর্ম হয়, তা হলে এমনটাই সম্ভব। আর সেটা করে দেখিয়েছেন বর্ধমানের ওই হিন্দুবাড়ির গৃহকর্ত্রী রাসমনি দাস। পরম মমতায় তিনি মায়ের মতো ওই দুই কাশ্মীরি যুবকের জন্য নিজের হাতে করে ইফতার সামগ্রীর জোগাড় করে দিচ্ছেন। ইফতার শেষে তাদের নামাজের ব্যবস্থা করছেন। সম্প্রীতির এর থেকে ভাল ছবি আর কী হতে পারে? আর এমন ছবি আমাদের এই বাংলায় দেখা যায়। যা শুধু আমাদের গর্ব নয় অহংকারও বটে।

গত ১২ এপ্রিল বীরভূমের সিউড়িতে কিডনির অসুখে মারা যান শ্যামাশিস চট্টোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি। পরিবারে ভাই ছাড়া তার আর কেউ নেই। আত্মীয়-স্বজন অবশ্য আছেন আশপাশে। কিন্তু লকডাউনের কারণে কেউ হাজির হতে পারেননি শ্যামাশিসবাবুর বাড়িতে। দাদার মৃতদেহ নিয়ে ভাই একা কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। সেই সময় তার সামনে দেবদূতের মতো হাজির হন এলাকার কয়েকজন মুসলিম যুবক। হিন্দু ধর্মের রীতি মেনে শ্যামাশিসবাবুর দেহ সৎকার করেন ওই যুবকরা। তারপর যা যা পারলৌকিক ক্রিয়া করতে হয় তাও তারা করেন। এই কাজে ওই মুসলিম যুবকদের একবারও মনে হয়নি যে তারা কোন ধর্মের এবং কোন ধর্মের মানুষের জন্য তারা এই কাজ করছেন। তারা এটাই ভেবেছেন, মনুষ্যত্বই সব থেকে বড় ধর্ম। আর সেই ধর্মই তারা পালন করেছেন মাত্র। একটি পরিবার বিপদে পড়েছে। ধর্ম ভেদাভেদ ভুলে সেই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই তো কর্তব্য হওয়া উচিত। এখানে দেখা উচিত নয় কে কোন ধর্মের। শুধু দেখানো উচিত মানবতা। কারণ প্রত্যেকের নিজের নিজের ধর্ম বিশ্বাসের পরেও মানবতা হল বড় ধর্ম। যে ধর্ম মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করতে শেখায় না, পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম দেয় না। মানবতা এমন এক ধর্ম, যা মানুষের মধ্যে সম্পর্কের বাঁধন আরও দৃঢ় করে।

সাম্প্রতিক কালে নিজের নিজের ধর্মের ‘মাহাত্ম্য’ তুলে ধরার জন্য দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক জায়গায় প্রাচীর উঠে যায়। একে অপরকে অবিশ্বাসের চোখে দেখতে থাকে। ঘৃণা জন্মায় একে অপরের প্রতি। যার মারাত্মক কিছু ফল আমরা বিগত কয়েক বছর দেখেছি। করোনার কারণে আপাতত সে সব এখন বন্ধ। এখন অনেক বেশি করে দেখা যাচ্ছে মানবতার ধর্ম। যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে অদৃশ্য দেওয়াল উঠেছিল, তা ভেঙে দিয়েছে। আলগা হয়েছিল সম্পর্কের যে বাঁধন, তা অনেকটাই দৃঢ় করেছে। করোনার ‘দৌলতে’ আমরা এই যে বাতাবরণ পেয়েছি, তা বজায় থাকুক। পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্ব নিয়ে পাশাপাশি বসবাস করি। যা আমাদের এই দেশের চিরন্তন ঐতিহ্য। যা আমাদের শুধু গর্ব নয় অহংকারও। সেই অহংকার নিয়েই যেন আমরা বাঁচতে পারি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here