রিজার্ভ ব্যাংকের নিয়ম মেনে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাংকের লেনদেনে চাই বাংলা

0
205
bangla

কৌশিক মাইতি: বাংলা, ভাষার ভিত্তিতে তৈরি রাজ্য, যে রাজ্যের প্রধান ভাষা বাংলা, মোট জনসংখ্যার ৮৬ শতাংশ বাঙালি। কিন্তু হাতেগোনা কিছু ব্যাংকের শাখা ছাড়া ব্যাংকের ফর্মে বাংলার লেশমাত্র নেই, যা অনভিপ্রেত। ব্যাংকের ফর্মে জ্বলজ্বল করছে হিন্দি ও ইংরেজি। ফর্মে বাংলা না থাকার জন্য সমস্যায় ভোগেন গ্রাম-বাংলার মানুষ থেকে শুরু করে শহরের বাংলা শিক্ষিত মানুষ– সকলেই।

প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে আমি, মাটির গন্ধ চিনি। জ্বলন্ত সমস্যাগুলো দেখি। LIC কিংবা পোস্ট অফিস, ব্যাংকের কাগজ, ইংরেজি-হিন্দিতে লেখা থাকে বেশিরভাগ। শুধু ছবির মতো করে দেখে বেশিরভাগ লোকজন, কারওর কাছে নিয়ে যান পড়ে দেবার জন্য, ফর্ম পূরণের জন্য। অন্যের সাহায্য ছাড়া এই সব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস দুর্বোধ্য তাদের কাছে। বাবা-কাকা থেকে গ্রামের ভাই-বোন বেশিরভাগই সমস্যায় পড়েন। কিছু মানুষ ব্যাংক ও পোস্ট অফিসের ফর্ম পূরণ করে দেন টাকার বিনিময়ে, এ দৃশ্য আমার চেনা। নয়তো ব্যাংকের কর্মীর সাহায্যের প্রত্যাশায় অপেক্ষা করতে হয়। গ্রামে ব্যাংকের শাখা কম, প্রচণ্ড ভিড়। সরকারি ব্যাংকের শাখাগুলোয় ছাত্র-ছাত্রী থেকে বয়স্কা বিধবা মহিলার লম্বা লাইন। সেখানে ব্যাংককর্মীর সাহায্য পাওয়া কঠিন ব্যাপার। শুধু গ্রাম না, আরামবাগের মতো মহকুমা শহর কিংবা কলকাতার যাদবপুরের মতো উন্নত এলাকাতেও ব্যাংকে দেখেছি, ব্যাংকের নানা ফর্মে বাংলা না থাকায় সমস্যায় পড়েন সাধারণ মানুষ। বাংলা থাকলে একেবারে নিরক্ষর মানুষ ছাড়া সব মানুষেরই সমস্যা লাঘব হয়।

প্রথম কথা, এটা অধিকারের প্রশ্ন, যে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ব্যাংকের ফর্মে বাংলা থাকবে না কেন? পশ্চিমবঙ্গের মূল সরকারি ভাষা বাংলা, এটা ভাষাগত সমানাধিকারের প্রশ্ন। যে বাংলায় আলামোহন দাস চালু করেছিলেন দাস ব্যাংক, যে বাংলায় পথচলা শুরু বেঙ্গল ব্যাংকের (যা আজ স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া), যে বাংলার মাটিতে কুমিল্লা ব্যাংক অর্থাৎ আজকের ইউবিআই ব্যাংক গড়ে উঠেছিল, সেই মাটিতেই ব্যাংকে বাংলাভাষা বঞ্চিত। এটা নাগরিক অধিকার-হনন। সাক্ষর মানুষকে নিরক্ষর করে দেওয়ার চক্রান্ত। বাংলার বুকে একজন শুধুমাত্র হিন্দি জেনে যদি পরিষেবা পান, তবে একজন বাঙালি নয় কেন? দ্বিতীয় কথা, এটা গ্রাহকের সুবিধার প্রশ্ন। গ্রাহকের কাছে ব্যাংকের দায়বদ্ধতা আছে। এভাবে শুধুমাত্র ইংরেজি ও হিন্দি ব্যবহার করে গ্রাহককে, গণমানুষকে অসুবিধায় ফেলতে পারে না ব্যাংক। তাই পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত প্রতিটা ব্যাংকের ফর্মে বাংলা থাকা বাঞ্ছনীয়। রাজনৈতিক কারণে বাংলাকে বঞ্চিত করে শুধুমাত্র ইংরেজি ও হিন্দি রাখা একটা চক্রান্ত। পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ জায়গায় মানুষ হিন্দি পড়তে ও লিখতে পারেন না, প্রসঙ্গত ৮৩ শতাংশ বাঙালি বাংলা ছাড়া অন্য ভাষা জানেন না। ফর্মে হিন্দি রাখা অর্থহীন বাংলার বেশিরভাগ শাখাতে, কিন্তু জ্বলজ্বল করে হিন্দি।

রিজার্ভ ব্যাংকের নিয়ম বলছে, বাংলার মাটিতে অবস্থিত ব্যাংকের প্রতিটা ফর্মে বাংলা থাকা বাধ্যতামূলক। ১ জুলাই, ২০১৪ তারিখে রিজার্ভ ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করে, যেখানে ব্যাংকের কাজে রাজ্যের ভাষা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। একটি মামলায় রিজার্ভ ব্যাংক মাদ্রাজ হাইকোর্টে জানায়, ব্যাংকগুলো জনপরিষেবামূলক কাজে (যেমন ফর্ম, এটিএমে লেখা, হোর্ডিং ইত্যাদি) সংশ্লিষ্ট রাজ্যের ভাষা ব্যবহার না করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ১ জুলাই, ২০১৪-র মাস্টার সার্কুলারে স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে, ব্যাংককর্মীরা গ্রাহকের সঙ্গে এ রাজ্যে বাংলায় কথা বলতে বাধ্য। আমাদের সকলের উচিত ব্যাংকে গিয়ে নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার বুঝে নেওয়া।

ব্যাংক আমানতকারীদের থেকে টাকা জমা নেওয়ার বিজ্ঞাপন বাংলায় দেয়, কিন্তু পরিষেবা বাংলায় না। এ কেমন খেলা? বাংলায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো টাকা জমা নেয় বেশি, বাঙালিকে ঋণ দেয় কম। বাঙালি কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক? এছাড়া অনেক ব্যাংকে বাংলা জানা কর্মী নেই। এর ফলে বিঘ্নিত হয় পরিষেবা। উত্তরপ্রদেশের ক্ষেত্রে ভাবতে পারেন যে, সেখানে হিন্দি জানা কর্মী নেই? কলকাতায় যেসব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের হেড অফিস, সেই সব ব্যাংকের ফর্মেও বাংলা নেই, দুঃখজনক। তাই ব্যাংক ও পোস্ট অফিসের প্রতিটি ফর্মে বাংলা চাই রিজার্ভ ব্যাংকের নিয়ম মেনে। পরিষেবা প্রদানের জন্য ব্যাংকের কর্মীদের বাংলা জানা খুব জরুরি, তাই সেভাবেই কর্মীনিয়োগ করুক ব্যাংকগুলো। এটা বাংলার দাবি, এটা বাঙালির দাবি।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here