রক্তিমা দাস ও ঋদ্ধীশ দত্ত, কলকাতা: নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আইনে রূপান্তরিত হওয়ার পর থেকে গোটা দেশজুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে এই আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রতিবাদ। আন্দোলন মূলত এই আইনের বিরুদ্ধে ভাবলে ভুল হবে। সিএএ ও এনআরসি মিলে যে দ্বৈত ‘ফাঁড়া’ তৈরি করছে, তার জন্য। এদিকে এই আইনের প্রভাব যাতে ভোটব্যাঙ্কে না পড়ে সে বিষয়ে ইতিমধ্যে তৎপর হয়েছে বিজেপি। সিএএ লাগু হওয়ার পরেই বিজেপির তরফ থেকে প্রচার শুরু হয়েছে এই নিয়ে, কিন্তু এনআরসি-র কথা কোথাও কেউ উল্লেখ করছে না। কারণ সিএএ নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন। এনআরসি নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার। সেই কারণে ক্ষোভের আঁচ বুঝতে পেরে রামলীলা ময়দানে নরেন্দ্র মোদীও বলেছিলেন, এনআরসি নিয়ে ২০১৪ থেকে তাঁর সরকারের অন্দরে কোনও আলোচনাই হয়নি।

চাপের মুখে এখন সুর নরম করেছেন অমিত শাহও। তবে নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের দাবির উলটো কথা দেখা গেল বিজেপির তরফ থেকে প্রচার করা বুকলেটে। এই বুকলেটে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন লাগু হওয়ার পরের ধাপে রয়েছে এনআরসি। অন্তত কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাব তেমনটাই।

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং তার যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে বিজেপির তরফ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন – ২০১৯ এর – পরিচয়’ নামক একটি বুকলেট। এই বুকলেটে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন কী। এতে রয়েছে এই আইন সম্পর্কে লোকসভায় অমিত শাহের বক্তৃতা, রয়েছে নেহরু-লিয়াকত চুক্তি, রয়েছে পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রীর কথা, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল জনবিন্যাসের ব্যাখ্যা। এছাড়াও তুলে ধরা হয়েছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯-এর মূল বিষয় গুলি, পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের সমর্থনে ভারতীয় নেতৃত্বের বিবৃতি। এরপরই রয়েছে প্রশ্ন-উত্তর পর্ব। এই প্রশ্ন উত্তর পর্বে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে ভারতবর্ষে এনআরসির লাগু হচ্ছে। এই বিষয়টি যে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের মন্তব্যের বিরোধিতা করছে, তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

নাগরিকত্ব আইন সম্পর্কিত ২৩ পাতার বুকলেটের ১৪ নম্বর তথা শেষ প্রশ্ন তোলা হয়েছে এনআরসির নিয়ে। প্রশ্নটিই এইরকম, ‘এরপর কি তবে এনআরসি? কতটা প্রয়োজন সেটা ? এনআরসি হলে আসামের মতো পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের জেলে যেতে হবে না তো?’ এই প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্ট করা হয়েছে ভারতবর্ষে এনআরসি লাগু হওয়ার বিষয়টি। উত্তরে বলা হয়েছে, ‘হ্যাঁ, এরপর এনআরসি। অন্তত কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাব সেইরকমই।’ যদিও এর পরেই এনআরসি সম্পর্কিত অসমের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘যে ১১ লক্ষ হিন্দু আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পে আছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে তারা প্রত্যেকেই অনেক আগেই ফরেনার্স অ্যাক্টে সেখানে গেছেন। ফরেনার্স অ্যাক্ট কংগ্রেস সরকারের তৈরি এবং আসামে এনআরসি হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ এবং তত্ত্বাবধানে রাজ্য সরকারের নয়।’

তবে বিজেপির বুকলেকেটের এই ব্যাখ্যা যদি সত্যি হয়, তবে তা সরাসরি প্রমাণ করছে যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রামলীলা ময়দানে দাঁড়িয়ে ‘জোড়া মিথ্যা’ কথা বলেছেন। প্রথমত, এনআরসি নিয়ে তাঁর সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নাকি কোনও আলোচনাই হয়নি। যদি কোনও আলোচনাই না হয়ে থাকে, তবে ‘কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাব’ কথাটি ব্যবহার করার কোনও মানে হয় না। দ্বিতীয়ত, নরেন্দ্র মোদী একই মঞ্চে বলেছিলেন দেশে কোনও ডিটেনশন ক্যাম্পের অস্তিত্বই নেই। বিজেপির বুকলেটেই স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে অসমে ডিটেনশন ক্যাম্পের কথা। শুধু তাই নয়, সেখানে যে হিন্দুরা বন্দি হয়ে রয়েছেন, তাও মেনে নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, ‘হিন্দু হিতৈষী’ বিজেপি সরকার কেন তাদের নরক যন্ত্রণার সম্মুখীন হতে বাধ্য করছে? কেনই বা তাদের নাগরিকত্ব আগে মঞ্জুর হল না?

এরপরেই এনআরসির পক্ষে জনমত টানতে আশ্বাসের সুরে বলা হয়েছে যে, ‘আসাম সরকার বরং ওই এনআরসি বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যারা আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি আছেন তারা প্রত্যেকেই ক্যাব পাস হওয়ার পর অতিসত্বর মুক্তি পাবেন এটাই আশা করা যায়।’ বলাই বাহুল্য ক্যাব পাশ হয়ে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন লাগু হওয়ার পরেও বন্দিমুক্তি হয়েছে কিনা সে বিষয়ে এখনও অসম সরকারের পক্ষ থেকে কোনও রকম বিবৃতি জারি হয়নি।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here