সুচিত্রা রায় চৌধুরী: ‘ওরা আমাকে সারাক্ষণ অত্যাচার করে৷ প্রশ্ন করে, তুই ছেলেদের মত কেন সাজিস? তুই তো মেয়ে’৷ গৌতমের(মৌসালি) উত্তর ছিল, আমি তো সাজি না, আমি তো ছেলেই৷ তবে এই কথাবার্তাতে কোনও লাভের লাভ হয়নি৷ উল্টে অত্যাচার চলেছে৷ বরং আরও নৃশংস রূপ দেখিয়েছে পরিবার৷ জগদ্দলে এক লিঙ্গান্তরকামী পুরুষকে বেধড়ক মারধর করল তাঁর পরিবারের লোকেরা৷ শেষ পর্যন্ত তাঁকে উদ্ধার করল রূপান্তরকামী সংগঠনের সদস্যরা৷

কথায় কথায় মারধর, গালিগালাজ, মানসিক নির্যাতন৷ আর যেন সহ্য করতে পারছিলেন না বছর পঁয়ত্রিশের মৌসালি৷ নেপথ্যে মৌসালীর নিজেকে পুরুষ বলে দাবি করা৷ শারীরিক গঠনে মৌসালী নারী হলেও নিজের পুরুষ বলেই মনে করেন তিনি৷ নিজের নাম রেখেছিলেন গৌতম৷ তবে এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না তাঁর পরিবার৷ যার জেরে মারধর৷ শুক্রবার পরিবারের পাশবিক অত্যাচার আর সহ্য করতে পারেননি গৌতম৷ তিনি খবর দেন রূপান্তরকামী সংগঠনের নেত্রী তথা সমাজকর্মী তিস্তা দাসকে৷ খবর পেয়ে নিজের সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে ছুটে যান তিস্তা৷ তবে গৌতমের বাড়িতে ঢুকতেই অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুনতে হয় তিস্তাকেও৷ তাঁকে গৌতমের দিদি প্রশ্ন করেন,’ ও কি ভাবে ট্রান্স ম্যান হয়! ওর তো পিরিয়ড হয়’৷ চিত্কার করে তিস্তা জানা, আপনারা একটু জানুন, আমার স্বামীও একজন ট্রান্স ম্যান। ওঁর ও একসময় পিরিয়ড হতো। এখন হয় না। রূপান্তরের পথে নানা পর্যায় আছে! সেটা না জেনে, মারবেন? বচসা চলে বেশ কিছুক্ষণ৷

kolkata bengali news

শেষপর্যন্ত ভাটপাড়া পুলিশের সহায়তায় গৌতমকে উদ্ধার করা হয়৷ তাঁকে জগদ্দল হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়৷ সেখানে প্রাথমিক চিকিত্সা করা হয় তাঁর৷ তবে ক্ষত বেশ গভীর৷ গৌতমের মাথাতেও আঘাত করা হয়েছে বলে জানান চিকিত্সকেরা৷ যার জেরে করাতে হবে সিটি স্ক্যানও৷ মহানগরকে সমাজকর্মী তিস্তাদেবী জানিয়েছেন, ‘গৌতমকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে দাবি করে তাঁর পরিবার৷ গৌতমের বাবা-মার মতে, তারা তো জন্ম দিয়েছিলেন একজন কন্যা সন্তানকেই৷ তাহলে এখন নিজেকে পুরুষ বলে দাবি করছে কেন সে? কার মদতে সে করছে এসব অলক্ষুণে কাণ্ড’?

kolkata bengali news

গৌতমকে প্রাথমিক চিকিত্সার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় হাসপাতাল থেকে৷ তিস্তা ও সংগঠনের সদস্যরা গৌতমকে বাড়িতেই পৌঁছে দেয়৷ তবে তাঁকে বলা হয়েছে, বাড়ির লোক কোনওভাবে যদি তাঁকে হেনস্থা করে তাহলে যাতে তত্ক্ষণাত তিস্তাকে ও পুলিশকে খবর দেয় গৌতম৷ পরিবারের বিরুদ্ধে ভাটপাড়া থানায় এফআইআর দায়ের করেছেন গৌতম৷

গৌতম একা নন, এভাবেই নিজেদের পরিবারের কাছে বঞ্চনা, হেনস্থার শিকার হন আরও অনেক লিঙ্গান্তরকামী পুরুষ ও মহিলারা৷ তাদের অনেকেই মুখ খোলেন, তবে বেশিরভাগই ভয়ে চুপ করে যান৷ সহ্য করে নেন সমস্ত নির্যাতন৷ তবে না, আর চুপ করে থাকা নয়৷ মুখ খুলুন৷ প্রতিবাদ করুন৷ কারণ আপনারাও মানুষ৷ আর পাঁচজনের মত বেঁচে থাকার সমান অধিকার আছে আপনাদেরও৷ পুঁথিগতবিদ্যায় হয়ত অনেকেই শিক্ষিত, দেশ বিদেশ জয় করে বেড়াচ্ছেন৷ তবে সামান্য মূল্যবোধ ও চেতনাটুকু এখনও বাকী রয়েছে অনেকের মধ্যেই৷ তাই মনের আঁধার দূর করে আপন করুন ওঁদেরও৷ কারণ ওঁরাও আপনার আমার মত রক্ত মাংসে গড়া একজন মানুষ, একজন নাগরিক৷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here