elderly bengali

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়: ‘শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন আমলকীর ওই ডালে ডালে’। শীতের হাওয়ায় গাছ থেকে পাতা ঝরে যাওয়া আরম্ভ হল। পাতা ঝরে যাওয়ার পর গাছটি কেমন হাড়গোড় বের করা একটা বুভুক্ষু বৃদ্ধ বলে মনে হয়। বসন্ত আসার সঙ্গে সঙ্গে কোথায় সেই হাড়গোড় বের করা বুভুক্ষু রূপ– একদম যৌবনের ছোঁয়া, চনমনে।
কিন্তু বাঙালির ক্ষেত্রে বার্ধক্যের পাতাঝরা বয়সগুলো যেন তাকে আরও জাপটে ধরে। তার মধ্যে থেকে সমস্ত যৌবনের প্রাণরস বেরিয়ে যায়, হারিয়ে যায়। বসন্তের কোনও ছোঁয়া তার জীবনচক্রে ছিল বলে মনে হয় না। বৃদ্ধ মানেই একটা মৃত্যুর আতঙ্ক। কিন্তু মৃত্যুর আতঙ্ক সরিয়ে সেখানেও বাঁচার তাগিদ থাকা দরকার। বাঙালির মগজে ও মজ্জায় অকালবার্ধক্য যেন মিশে রয়েছে। এই বৃদ্ধ অবস্থায় অনেক মানসিক দোষ দেখা যায়– তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে, যুবক-যুবতীদের অশালীন অবস্থায় দেখলেই তারা অসহ্য ওঠে। আর সবজান্তা ভাব, পুরনো দিনের অবস্থার সঙ্গে বর্তমান কালকে মেশানো। বার্ধক্য বাঙালির কাছে যেন বাণপ্রস্থ নেওয়া। ঠিক মনে করতে পারছি না, কোনও এক বাঙালি সাহিত্যিক বলেছিলেন, বৃদ্ধ না হলে সুন্দর হয়ে ওঠা হয় না।

মনে রাখতে হবে, বার্ধক্য ও যযাতিপনা এক নয়। যযাতি বুড়ো বয়সে তাঁর পুত্রের যৌবন ধার করে স্বার্থপরের মত বেঁচেছিলেন। নিঃসন্দেহে অন্য একজনকে তাঁর যৌবনের রূপ-গন্ধ-রস থেকে বঞ্চিত করে জীবনধারণ, অবশ্যই সামাজিক ভাবে অন্যায়।
উনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালি কুলীন প্রথা ধরে রাখতে যেভাবে বুড়ো বয়সে বিয়ে করে বাংলার রমণীকুলের সর্বনাশের দিকে পা বাড়াতে সাহায্য করেছিল, তার আর কহতব্য নেই। আর ওই স্বামীহারা বাঙালি স্ত্রীকুল যৌবনে পাতাঝরা এক গাছের মত রূপান্তরিত। যারা রূপান্তরিত হতে পারেননি, তারা সমাজের বিভিন্ন জায়গায় হয়ে উঠলেন লক্ষ্মীবাই, হিরাবাই, মতি ইত্যাদি। চরম ব্যাভিচার, চরম পৌরুষের দাপট– পুরুষ যে ‘সোনার আংটি বাঁকা’ হলেও দোষ নেই! এখানেও একধরনের যযাতিপনা কাজ করেছে।

বর্তমানে বাঙালি বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রী নিজেদের জীবনকে একটু অন্য খাতে প্রবাহিত করতে চাইলেও এরা কিন্তু সকলেই একা। ছেলেমেয়ে কোথায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে তার ইয়ত্তা নেই, নিজের সামজিক বা অর্থনৈতিক স্থিতি বজায় রাখতে। মাসে দূরদূরান্ত থেকে দূরভাষে কথা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার টাকার দরকার হলে ‘দেখি কী করা যায়’। কিংবা পুরো টাকাটা না পাঠিয়ে কিছু টাকা পাঠানো, পরে কাজের লোককে জিজ্ঞাসা করা, মা ও বাবা টাকাগুলো নিয়ে কী করছে? বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ওপর মানসিক অত্যাচার করে তাকে নিজের বাড়ির বাইরে কী করে রাখা যায়, তার পরিকল্পনা। সত্যি কথা শুনতে খারাপ লাগলেও বর্তমানে বাঙালি বৃদ্ধ-বৃদ্ধার অবস্থা নির্ভর করছে তাদের কত টাকা আছে এবং কত টাকা রেখেছে তাদের প্রজন্মের জন্য।
কিন্তু বাঙালি বার্ধক্যের এই চরম অবস্থা থেকে বেরতে পারবে কি না সেটা বলা বড়ই মুশকিল। এই ছবি আমরা ‘পথের পাঁচালী’র ইন্দির ঠাকরুনের কাছ থেকে পেয়েছি বা ‘একদিন প্রতিদিন’ চলচ্চিত্রের সেই মেয়েটি, যে রাত্রে বাড়ি ফিরল না। তার বাবা ও মায়ের কী অসহায়তা আর পারিপার্শ্বিক মানুষজনের কী অযথা বিভিন্ন চাপ, বাবা-মায়ের দুঃখের কথা, চিন্তার কথা বাদ দিয়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here