gandheshwari

শিবানন্দ পাল: শুশুনিয়া পাহাড়ের পায়ের কাছে নির্জনে বয়ে চলেছে একটি শীর্ণ নদী। নাম গন্ধেশ্বরী নদী। এটি দারকেশ্বর নদের একটি উপনদী। দৈর্ঘ্য মাত্র ৩২ কিলোমিটার। ছোটনাগপুর পাহাড় সংলগ্ন এই অঞ্চলে চারটি বড় বড় নদনদী আছে। দামোদর, দারকেশ্বর, কংসাবতী এবং শীলাবতী। আবার এই অঞ্চলে গন্ধেশ্বরী, কুকরা, বিরা এবং ধানকোরা নামে কতগুলো ছোট ছোট নদী আছে। এদের মধ্যে গন্ধেশ্বরী উল্লেখযোগ্য। পাথুরে তলদেশ সম্বলিত গন্ধেশ্বরী নদী শুশুনিয়ার উত্তর পশ্চিম এবং বাঁকুড়া শহরের উত্তর দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রতাপপুরে দ্বারকেশ্বরে মিলিত হয়েছে। দ্বারকেশ্বর পরে রূপনারায়ণ নামে হুগলি নদীতে মিশেছে। হুগলি নদী অর্থাৎ গঙ্গায়। এই গঙ্গার অনেক অনেক উপরে হিমালয়ের পাহাড়ি উপত্যকা থেকে সমতলে নামার পরে গঙ্গা যেখানে যুক্তবেণী হয়েছেন, অখণ্ড ভারতের সেই প্রয়াগ তীর্থে গঙ্গার তীরে অবস্থিত এলাহাবাদ শহর। এলাহাবাদ বর্তমানে উত্তর ভারতের একটি সমৃদ্ধ শহর। ভারতের বৃহত্তম প্রদেশ উত্তরপ্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর এলাহাবাদ, স্বাধীনতোত্তর ভারতকে একাধিক প্রধানমন্ত্রী উপহার দিয়েছে। গঙ্গা, যমুনা ও একদা সরস্বতী নদীর সঙ্গমে অবস্থিত পৌরাণিক শহর এই এলাহাবাদ। (পড়ুন ষষ্ঠ পর্ব)

Gupta script
এলাহাবাদ স্তম্ভের ছবি।

এলাহাবাদ শহরের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রান্তে একটি স্তম্ভ আছে। আর সেই স্তম্ভের গায়ে উৎকীর্ণ আছে বেশ কিছু লিপি। এর মধ্যে একটিকে এলাহাবাদ প্রশস্তি বলা হয়। স্তম্ভের গায়ে উৎকীর্ণ লিপি (প্রশস্তি) মালার একটির মধ্যে নিম্নলিখিত অংশবিশেষ পাওয়া গিয়েছে: Line 21: (Who) is great through the extra ordinary valour, namely, the forcible extermination of many kings of Aryavarta such as Rudradeva, Matila, Nagadutta, Chandavarman, Ganapatinga, Nagasena, Achyuta, Nandin and Balavarman; who has made all the kings of the forest regions to became his servents. এলাহাবাদ প্রশস্তির এই লেখ থেকে আমরা জানতে পারি গুপ্ত বংশের রাজা সমুদ্রগুপ্ত (৩২৫ থেকে ৩৮০ খ্রিস্টাব্দ) আর্যাবর্তের মোট ৯ জন রাজাকে পরাজিত করে গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। এই ন’জন রাজা হলেন রুদ্রদেব, মতিল, নাগদত্ত, চন্দ্রবর্মণ, গণপতিনাগ, অচ্যুত, নাগসেন, নন্দিন এবং বলবর্মণ। এঁদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ৬ জনের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। তাঁদের ২ জন হলেন আমাদের আলোচ্য নাগদত্ত এবং চন্দ্রবর্মণ। যাঁরা ওই সময়ে এই আদি বঙ্গের শাসক ছিলেন।

Gupta script
অশোকস্তম্ভের ছবি।

ইতিহাসবিদরা বলছেন– এলাহাবাদ স্তম্ভ মৌর্য সাম্রাজ্যের সময়কালে নির্মিত হয়েছিল। সমুদ্রগুপ্তের প্রশস্তি ছাড়াও মৌর্য সম্রাট অশোকের লিপি এখানে আছে। এজন্য একে অশোকস্তম্ভও বলা যেতে পারে। কারণ প্রাপ্ত অন্যান্য অশোকস্তম্ভগুলির মতো এই স্তম্ভের গায়ে ছয়টি লেখ আছে। এই লিপির সাথে অশোকপত্নী তিব্বল এবং অশোকমাতা কারুবকী-র দানকার্যের উল্লেখ এখানে উৎকীর্ণ রয়েছে। উক্ত সাতটি লিপি ছাড়াও আশ্চর্যজনকভাবে এই স্তম্ভের গায়ে অবস্থান করছে সপ্তদশ শতাব্দীর মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর-এর লিপি। কী করে এসব হয়? হয়। বর্তমান কালেও হয়। আর এখন তো ‘কপি’ ‘পেস্ট’-এর যুগে এসব হামেশাই ঘটছে। একজনের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দেবার আনন্দই আলাদা! ব্রিটিশরা যেমন অনেক কিছু ভাল কাজ করেছে, আবার তারাও একইভাবে আমাদের দেশ থেকে মধু চুরি করে নিয়ে গিয়েছে নিজেদের দেশে। অনেক সময় আমরাও ওদের খুশি করে কৃপাধন্য হয়েছি। যাইহোক, সম্রাট অশোকের শিলালিপি থেকে জানা যায়– এলাহাবাদ স্তম্ভ প্রথমে প্রাচীন নগরী কৌশাম্বীতে স্থাপন করা হয়েছিল। কৌশাম্বী কোথায়?

gupta script
জোসেফ টাইফেনথেলার-্এর নকশার ছবি।

স্তম্ভের বর্তমান অবস্থান থেকে প্রাচীন কৌশাম্বীনগর প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। আজ কৌশাম্বীতে অবস্থিত অপর আর একটি স্তম্ভের ভাঙা উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। সেই ভাঙা স্তম্ভ দেখে অনেকে মনে করেন, এলাহাবাদ স্তম্ভ এবং ওই ভাঙ্গা স্তম্ভ অতীতে পাশাপাশি অবস্থান করত। আবার ভাঙা স্তম্ভের ছবি ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে। সেজন্য ওই স্তম্ভ সম্পর্কে আলোচনা অসম্ভব। স্বাধীন দেশে ইতিহাসচর্চায় নিষেধাজ্ঞা কেন? আবার যদি আর একটা প্যানডরা বাক্স খুলে যায়! আবার একটা অযোধ্যা যদি হয়? সত্য, শিব ও সুন্দরের প্রকাশে আমরা কেন যত্নবান হতে পারি না! আসলে, আমরা কি সত্যি শিক্ষিত হয়েছি? চারপাশের নানা কর্মকাণ্ড দেখে মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়! নিষেধাজ্ঞা! কিন্তু এতে যে, গোপন আকর্ষণে সন্দেহের প্রাবল্য বৃদ্ধি পায়, সে কথা কে বোঝাবে! ঐতিহাসিকদের অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে মুসলিম শাসনে বহুবার আলোচ্য স্তম্ভ স্থানান্তরিত হয়েছে। শেষে সম্রাট জাহাঙ্গীর-এর রাজত্বকালে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে এই স্তম্ভ এলাহাবাদ শহরে নিয়ে আসা হয়। সম্ভবত এই সময় স্তম্ভের শীর্ষে একটি গোলক স্থাপন করা হয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে জোসেফ টাইফেনথেলার এই স্তম্ভের একটি নকশা করেন। সেই নকশায় স্তম্ভের মাথায় গোলক দেখা যায়।

১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে এশিয়াটিক সোসাইটির হয়ে তদারকিতে গিয়ে জেমস প্রিন্সেপ এলাহাবাদ দুর্গের মধ্যে স্তম্ভটি পড়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পান। ততদিনে আবহাওয়ার প্রকোপে বেলেপাথরে নির্মিত এই স্তম্ভের অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। ১০.৭ মিটার (৩৫ ফুট) উচ্চ এলাহাবাদ স্তম্ভ আদতে পালিশ করা একটি একক বেলে পাথর দ্বারা নির্মিত। এই স্তম্ভের নিচের ব্যাস ০.৯ মিটার (৩৫ ইঞ্চি), উপরের ব্যাস ০.৭ মিটার (২৬ ইঞ্চি)। অন্যান্য অশোকস্তম্ভের ন্যায় প্রাপ্ত ঘণ্টাকৃতি পদ্মফুলের ভাস্কর্যযুক্ত কারুকার্য এই স্তম্ভশীর্ষে নেই। আলেকজান্ডার ক্যানিংহ্যাম মন্তব্য করেছিলেন, এই স্তম্ভের শীর্ষে একটি সিংহের মূর্তি ছিল। জানা যায়, ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে ক্যাপটেন এড‌ওয়ার্ড স্মিথ নিজের নকশা অনুযায়ী একটি সিংহের মূর্তি ওই স্তম্ভের শীর্ষে স্থাপন করার উদ্যোগও নিয়েছিলেন। কিন্তু আলেকজান্ডার ক্যানিংহ্যাম স্মিথের উৎসাহে জল ঢেলে দিয়ে সেই প্রচেষ্টা বাতিল করে দেন। এইসব কারণে ব্রিটিশদের‌ও সন্দেহ হয়, এদেশের নানা পুরাকীর্তির আদলে সামান্য রদবদল ঘটিয়ে কোথাও কোথাও আমাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়নি তো? (পড়ুন অষ্টম পর্ব)

কভারের ছবি গন্ধেশ্বরী নদীর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here