নিজস্ব প্রতিবেদক, বালুরঘাট: গোটা রাজ্যের নজর ছিল কলকাতার ধর্মতলায়। ২১শের মঞ্চ থেকে তৃণমূল সুপ্রিমো কি কি বলেন আর দলের নেতাকর্মীদের কি কি চমক দেন, সে দিকেই তাকিয়ে ছিল আমজনতা থেকে মিডিয়াকুল। সেই মঞ্চ থেকেই অগ্নিকন্যা ছুঁড়ে দিলেন বার্তা, ১৯শে ফিনিশ বিজেপি আর ৪২’এ চাই ৪২’ই। কিন্তু এসবের থেকে অনেক দূরে কার্যত নিঃশব্দে নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষিত চ্যালেঞ্জকেই কার্যত পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল রাজ্য বিজেপি। কলকাতা থেকে বেশ কিছুটা দূরে আত্রাই নদীর তীরে বালুরঘাট শহরে শনিবার বিজেপির এক সভায় গেরুয়া শিবিরে যোগদান করলেন রাজ্য রাজনীতির দুই বহু চর্চিত মুখ আব্দুল করিম চৌধুরী ও নীলাঞ্জন রায়। করিমসাহেব সরাসরি বিজেপিতে যোগদান না করলেও এটা জানিয়ে দিলেন যে তার তৈরি বাংলা বিকাশ কংগ্রেস পার্টি এনডিএ’র শরিক দল হিসাবেই কাজ করবে আর নীলাঞ্জনবাবুতো সরাসরি বিজেপিতেই যোগদান করলেন।

রাজ্য রাজনীতির এই দুই ব্যক্তিত্ব গেরুয়া শিবিরে ঢুকে পড়ায় রাজ্য রাজনীতির বেশ কিছু হিসাবনিকেষ বদলে যেতে চলেছে। করিমসাহেব দীর্ঘদিন ধরে উত্তর দিনাজপুর জেলার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। জেলার অন্যতম মহকুমা শহর ইসলামপুর তার কর্মভূমি। তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে করিমসাহেব ৯বার বিধায়ক হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৬’র রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে দাঁড়িয়ে তিনি পরাস্ত হন। পরবর্তীকালে তাকে পরাস্ত করে জয়ী হওয়া কংগ্রেস প্রার্থী কানাহাইয়ালাল আগরওয়াল তৃণমূলে যোগদান করলে করিমের সঙ্গে ঘাসফুলের দূরত্ব ও মতভেদ তৈরী হয়। ক্রিমের পরাজয় ও কানহাইয়ালালের জয়ের পিছনে কাজ করেছিল বাম-কংগ্রেস জোট, যা আগামি দিনে চট করে দেখা নাও যেতে পারে। তাই ২০২১’র নির্বাচনে ইসলামপুর বিধানসভা আসন থেকে কানহাইয়ালালের জয় যেমন অনিশ্চিত তেমনি আসন্ন ২০১৯ সালের লোকসভার নির্বাচনে ইসলামপুর থেকে তৃণমূল প্রার্থীর লিড তোলাও এখন প্রশ্নের মুখে পড়ে গেল। করিমের হাত ধরে ইসলামপুর বিধানসভা আসনে বিজেপি তার ভোটও বাড়িয়ে নিতে পারবে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রের ফলাফলে। ইসলামপুর এই লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যেই পড়ে। ২০১৪ সালে সেখানে জয়ী হন বাম শিবিরের প্রার্থী মুহাম্মদ সেলিম। কিন্তু গত ৩-৪ বছরে এই লোকসভা কেন্দ্রে যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে তাতে ওই আসনে তৃণমূলের জয় প্রায় সুনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই সুনিশ্চয়তায় জল ঢেলে দিলেন করিমসাহেব।

অন্যদিকে নীলাঞ্জনবাবু বর্তমান প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরীর ঘনিষ্ট বলেই সুপরিচিত। অধীরবাবু নিজে বার বার কংগ্রেস ত্যাগ না করার কথা বললেও, রাজ্য বিজেপির একাধিক নেতা নানা সময়ে নানা ভাবে সেই সম্ভাবনা যেমন উস্কে দিয়েছে তেমনি প্রকাশ্যে তাকে বিজেপিতে যোগদান করার জন্য আবেদনও করেছে। সেই অধীরবাবুর ঘনিষ্ঠ নীলাঞ্জনবাবু বিজেপিতে যোগদান করায় অনেকেই মনে করছেন অধীরবাবুর কাটা হাত ছেড়ে হাতে পদ্ম তুলে নেওয়া এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। আর যদি সেটা সত্যি হয় তাহলে রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপি যে অনেকটা জমি দখল করে নিতে পারবে সে নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। শুক্রবার বালুরঘাটে বিজেপির ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন বিজেপির কমিটির সদস্য কৈলাস বিজয়বর্গীয় ও মুকুল রায়। তাদের হাত থেকেই বিজেপির পতাকা নিজের হাতে তুলে নেন নীলাঞ্জনবাবু। পাশাপাশি ওই অনুষ্ঠানে প্রায় ৩০০০ কংগ্রেস কর্মী দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করেন। অনুষ্ঠান শেষে নীলাঞ্জনবাবু সাংবাদিকদের জানান,’যেভাবে অধীরবাবু তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তার দাম কংগ্রেস হাইকমান্ড তাকে দেয়নি। অধীরদা আমার নেতা ছিলেন, আছেন, থাকবেন। এরাজ্যে তৃণমূল প্রতিদিন কংগ্রেসকে একটু একটু করে ভেঙে ভেঙে খেয়ে নিচ্ছে আর দিল্লিতে বসে হাইকমান্ড ওদের সঙ্গেই জোট গড়ার পরিকল্পনা করছে। এখানে কংগ্রেস সাংসদ-বিধায়ক-জনপ্রতিনিধি-নেতাকর্মীদের তৃণমূলের গুন্ডারা মারধোর করছে, খুন করছে, মিথ্যা মামলা করছে আর হাইকমান্ড দিল্লিতে বসে তৃণমূলের সঙ্গে দোস্তি করছে। এভাবে চলতে পারে না।’ নীলাঞ্জনবাবুর এই বক্তব্যের পরেই অধীরবাবুর বিজেপিতে যোগদানের সম্ভাবনা আরও জোরদার হয়ে গেল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here