‘পঞ্জাবিরা বাসুজিকে কোনও দিন ভুলবে না’, অকথিত জ্যোতি বসু

0
1276
jyoti basu

বিশ্বজিত ভট্টাচার্য: প্রায় ১৪-১৫ বছর আগের কথা৷ হেড অফিসের বড়বাবুদের হুকুম হল, বিহার ও ঝাড়খণ্ড নির্বাচন কভার করতে যেতে হবে৷ কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। অতএব তল্পিতল্প গুটিয়ে চলো বিহার৷ আমি তখন একটি টেলিভিশন চ্যানেলের কর্মী, পটনায় গিয়ে আমাদের দফতরে পৌঁছে দেখি সাজো সাজো রব৷ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আমাদের চ্যানেলের আরও কয়েকজন নির্বাচন কভার করার হুকুম তামিল করতে জড়ো হয়েছেন৷ হেড অফিস হায়দরাবাদ থেকে আমাদের কোঅর্ডিনেটর হয়ে এসেছেন নীলাম্ভর মহান্তি৷ স্ট্রাটেজিক প্ল্যানিং নিয়ে বৈঠকে আমাকে বলা হল, বিহার ও ঝাড়খণ্ডের মাওবাদী উপদ্রুত এলাকার ভোট কভার করতে হবে৷ মনে পড়ল বহু পুরনো বচন, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে৷ যেহেতু তাঁর আগে বিভিন্ন রাজ্যে মাওবাদী কার্যকলাপ নিয়ে কাজ করে এসেছি, তাই আমার ঘাড়েই ওই দায়িত্ব চাপল৷

যাই হোক, বিহারের কয়েকটি জেলায় ঘোরাঘুরির পর চলে এলাম ঝাড়খণ্ডে৷ রাঁচি থেকে বহুদূরে ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত এলাকার গ্রাম মুনিয়াড়৷ নগ্ন দারিদ্রের মাঝে এক নিঝুম গ্রাম৷ বিদ্যুৎহীন সেই গ্রামের লোক মোবাইল ফোন তো দূরের কথা, ঘড়ি-রেডিয়ো কিছুই চোখে দেখেননি৷ ফেরার পথে মুনিয়াড় থেকে প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার চলে আসার পর চোখে পড়ল এক সিআরপিএফ ক্যাম্প৷ পাঁচিলের ওপর কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা কড়া পাহারায় থাকা সেই ক্যাম্প দেখে বুঝলাম এখনও মাওবাদীদের পাড়াতেই আছি৷ গড়িয়ে আসা বিকেলের আলোয় ক্যাম্পের বাইরে বেশ কয়েকটি জিপ দাঁড়িয়ে আছে৷ মনে হল হোমরাচোমরা কেউ এসেছেন৷ ভাবলাম ঢুঁ মেরে দেখি যদি বাইট পাওয়া যায়৷ টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিকদের এই এক রোগ৷ বাইটই মুখ্য৷ পাহারায় থাকা সিআরপিএফ কর্মীকে পরিচয়পত্র দেখাতে ভিতরে ঢোকার ছাড়পত্র মিলল৷ ক্যাম্পের অফিসঘরে ঢুকে উপস্থিত কর্তার সঙ্গেও দেখা হল৷ কলকাতা থেকে আসা বাঙালি সাংবাদিক শুনেই আপ্যায়ন করে বসতে বললেন৷ শক্তপোক্ত চেহারার সর্দারজি সিআরপিএফ কর্তা অপরিচিত সাংবাদিককে আপ্যায়ন করে বসতে বলছেন দেখে খটকা লাগল৷ দ্বিতীয় কর্তা বসার পরেই জানতে চাইলেন, বাসুজি কইসা হ্যায়? উনকা তাবিয়ত ঠিক হ্যায় না? ভিনরাজ্যে ঘোরার সুবাদে পশ্চিমবঙ্গের বাসুজিটি কে, তা জানি৷ কলকাতা থেকে এত দূরে পাহাড়, জঙ্গলঘেরা এলাকায় এক সিআরপিএফ কর্তা জ্যোতি বসুর কুশল জানতে চাইছেন৷ বললাম, ভালই আছেন৷ তবে কানে খুবই কম শুনছেন৷ যন্ত্র দিয়েই শুনতে হয়৷ শরীরও মাঝেমধ্যে বিগড়োয়৷ জ্যোতিবাবু ভাল আছেন শুনে দ্বিতীয় প্রশ্ন, উনি তো মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়েছেন, পার্টি অফিসে আসেন? মিটিংয়ে যান? বললাম, সপ্তাহে একদিন আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের অফিসে দলের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে বসেন৷ দলীয় মিটিংয়েও যান৷ দলীয় দফতরে এখনও সিঁড়ি দিয়েই দোতলায় ওঠেন৷ সর্দারজির পরের কথায় রহস্যের পর্দা উঠে গেল৷ বললেন, দেশের এরকম নেতার খুব প্রয়োজন, ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর যখন গোটা দেশে শিখদের ঘরবাড়ি পোড়ানো হচ্ছিল, খুন করা হচ্ছিল, তখন পশ্চিমবঙ্গে আমরা নিরাপদে ছিলাম৷ বাসুজির জন্যই এটা হয়েছিল৷ আমরা পঞ্জাবিরা এটা কোনওদিন ভুলব না৷

আরেকবার এই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছিল মহারাষ্ট্রে৷ সেবার নির্বাচন কভার করতে মুম্বই গিয়েছিলাম৷ সেই নির্বাচনে সবচেয়ে স্পর্শকাতর কেন্দ্র ছিল উল্লাসনগর৷ ওই কেন্দ্রে যিনি নির্দল প্রার্থী ছিলেন সেই পাপ্পু কালামি চারবারের বিধায়ক৷ টাডা আইনে একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন৷ বাহুবলী বিধায়কের বিরুদ্ধে যিনি বিজেপির প্রার্থী হয়েছিলেন তিনিও বাহুবলী হিসেবে পরিচিত৷ ফলে টানটান ভোটের হাওয়া৷ স্থানীয় সহযোগী সাংবাদিকের কাছে শুনলাম, হোটেলে-রিসর্টে বহিরাগতদের খোঁজে তল্লাশি চলছে৷ বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারে বিভিন্ন জায়গায় রেড হচ্ছে৷ সেসবের ছবিও তাঁর কাছে আছে৷ এবার দরকার পুলিশের বাইট৷ সহকর্মীর পরামর্শে গেলাম এসিপি তানাজি ঘাগরের বাইট নিতে৷ সেখানেও খাতিরযত্ন পেয়েছিলাম এসিপি সাহেবের৷ তাঁর পত্নীর গুরুদেব কলকাতার বাসিন্দা, তাই পত্নীর সঙ্গে প্রায়ই ঢুঁ মারতেন কলকাতায়৷ কলকাতার আইনশৃঙ্খলার প্রশংসা করে বলেছিলেন, বাসুজির শাসনের জন্যই কলকাতার রাস্তাঘাট খুব নিরাপদ৷

কাশ্মীর নিয়ে আসমুদ্রহিমাচল এখন খুব ব্যস্ত৷ কাশ্মীরের কল্যাণেই জানতে পারলাম আমাদের দেশেরও প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ৷ পথেঘাটে অনুচ্ছেদ ৩৭০, ৩৫-এ ধারার কত রকম ব্যাখ্যা৷ এই অবস্থায় ২০০১ সালে ১৮ ডিসেম্বর কলকাতায় নেওয়া জ্যোতিবাবুর সাক্ষাৎকারের কাশ্মীর প্রসঙ্গে বলা কথাগুলো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে ঘুরছে৷ সাক্ষাৎকারের ওই অংশ পড়লেই বোঝা যাবে তাঁর রাজনৈতিক বাস্তববোধ কতটা প্রখর ছিল৷ জ্যোতিবাবুর রাজনৈতিক বাস্তববোধের অনেক কথাই শুনেছি। তার মধ্যে একটি ঘটনা মনে পড়লে আজও খবর করতে না পারার যন্ত্রণাটা টের পাই৷ অবশ্য খবর করব না, এই শর্তেই খবরটা পেয়েছিলাম৷ ২০০২ সাল৷ দেশে তখন অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার৷ সেই বছর সিপিএমের দলীয় মুখপত্রের শারদীয় সংখ্যায় জ্যোতি বসুর লেখা আনতে যিনি ইন্দিরা ভবনে গিয়েছিলেন, তিনি আমাকে বিশেষ স্নেহ করেন৷ তাঁর কাছেই ‘খবর করা যাবে না’ এই শর্তে ঘটনাটা জেনেছিলাম৷ জ্যোতিবাবু নিজে তো লিখতেন না, তিনি কিছু পয়েন্ট বলতেন, তা শুনেই লেখা তৈরি করতে হত৷ সেবার লেখা আনার সময়ে জ্যোতি বসু বলেছিলেন, ‘কংগ্রেস সম্পর্কে খুব কড়া অবস্থান যেন লেখায় না থাকে।’ ওই কথা শুনে যিনি লেখা আনতে গিয়েছিলেন, তিনি একটু অবাকই হয়েছিলেন। তখন জ্যোতি বসু বাজপেয়ী সরকারের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি বাড়ছে। এই অবস্থায় আর্থিক নীতির বিরোধিতা করলেও কংগ্রেস সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা বদলাতে হতে পারে৷ জ্যোতি বসুর এই বক্তব্যে ২০০৪ সালে কংগ্রেস পরিচালিত ইউপিএ সরকারকে সমর্থনের বীজ লুকিয়ে ছিল৷ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রুখতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসকে বামপন্থীরা সমর্থন দিয়েছিল ২০০৪ সালে৷ ফলে খবরটা করলে সেই সময় খুব বড় খবর হত৷ কিন্তু শর্ত ছিল, খবর করা যাবে না৷

আর একটা ঘটনা মনে পড়ছে, এক প্রবীণ সাংবাদিকের কাছে শোনা ঘটনা৷ তিনি তখন সিপিএমের মুখপত্রের সাংবাদিক৷ তরুণ বয়সে তাদের কাছে অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বামপন্থার আকাশে রীতিমত হিরো৷ সৌমিত্র সিপিএমের সদস্য হতে আগ্রহী ছিলেন৷ কিন্তু জ্যোতি বসু রাজি হননি৷ এই খবর জেনে তরুণ বামপন্থীরা অত্যন্ত হতাশ হয়েছিলেন৷ সুযোগ পেয়ে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে ওই সাংবাদিক একদিন জ্যোতিবাবুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে আপনার আপত্তির কারণ কী? জ্যোতিবাবু বলেছিলেন, ‘দেখো, ওরা শিল্পী, দলের নিয়মশৃঙ্খলায় ওদের আটকে রাখা যাবে না৷ কিছুদিনের মধ্যেই ওদের হতাশা আসবে।’

আজ যখন চারপাশে অসহিষ্ণুতা নিয়ে এত চর্চা, এই সময়ে ওই প্রবীণ সাংবাদিকদের কাছে শোনা আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে৷ ছয়ের দশকের শেষদিকে উত্পল দত্ত নকশালবাদী রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছিলেন৷ সেইসময় লেখা ‘তির’ নাটকে উত্পল দত্ত তীব্রভাবে সিপিএমকে আক্রমণ করেছিলেন৷ তাই উত্পল দত্তের নাটক যাতে মঞ্চস্থ না হয়, তার জন্য নানা বাধা তৈরি করেছিল সিপিএম৷ এই খবর জানার পর জ্যোতিবাবু নেতাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘উত্পল দত্তের নাটক নিয়ে দলের আপত্তি কোথায়?’ উত্তরে এক নেতা বলেছিলেন, তাঁর নাটকে দল এবং আপনার সম্পর্কে অনেক সমালোচনা রয়েছে৷ শুনে জ্যোতিবাবু বলেছিলেন, ‘তার জন্য নাটক খারাপ হবে কেন?’

জ্যোতিবাবুর উদাসীন ও গম্ভীর ভাবমূর্তি সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা, তিনি যে অন্যদের থেকে আলাদা এটা বোঝাতেই জ্যোতিবাবু সচেতনভাবে ওই ভাবমূর্তি তৈরি করেছিলেন৷ কিন্তু এই ধারণা যে কতটা ভুল, তা বুঝেছিলাম ইন্দিরা ভবনে কর্মরত এক পুলিশকর্মীর কাছে শোনা এক ঘটনায়৷ প্রতিদিন সকালে জ্যোতিবাবু বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়তেন৷ ব্রেকফাস্টে থাকত দু’টি টোস্ট ও এককাপ দুধ, চিনি ছাড়া চা৷ একদিন সকালে বসে কাগজ পড়ছেন জ্যোতিবাবু৷ টেবিলে দেওয়া হয়েছে টোস্ট ও চা৷ হঠাৎই একটি কাক পাঁচিলের ধারে থাকা টেবিলে টোস্টের ডিসের দিকে এগোতে শুরু করে৷ জ্যোতিবাবুর সেদিকে খেয়ালই নেই৷ পুলিশকর্মীরাও বুঝে উঠতে পারছেন না ঠিক কী করবেন৷ জ্যোতিবাবুর সামনে গিয়ে কাক তাড়ানোর সাহসও তারা পাচ্ছেন না৷ এই অবস্থায় তারা দেখলেন, কাকটি শেষপর্যন্ত ছোঁ মেরে টোস্ট ঠোঁটে নিয়ে উড়ে গেল৷ জ্যোতিবাবু যেমন কাগজ পড়ছিলেন তেমনই পড়তে লাগলেন৷ সেইসময় জ্যোতিবাবুর আপ্তসহায়ক জয়কেষ্ট ঘোষ ছিলেন না৷ তিনি এলে পুলিশকর্মীরা তাকে ঘটনাটা জানালেন৷ তখন তিনি জ্যোতিবাবুর কাছে গিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, আবার কী টোস্ট দিতে বলবেন? জ্যোতিবাবু শুনে বলেছিলেন, ‘আর আছে?’

শেষ করি জ্যোতিবাবুর একটি সরস মন্তব্য দিয়ে৷ ২০০০ সালের প্রথমদিকে জল্পনা ছিল, জ্যোতিবাবুকে রাষ্ট্রপতি করতে চায় ইউপিএ সরকার৷ সেই সময় একদিন সিপিএমের যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআইয়ের সভা ছিল সল্টলেকে৷ প্রধানবক্তা ছিলেন জ্যোতি বসু৷ বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ থেকে নামার সময় জ্যোতিবাবুকে প্রশ্ন করেছিলাম, শোনা যাচ্ছে, কংগ্রেস আপনাকে রাষ্ট্রপতি করতে চায়? জ্যোতিবাবুর উত্তর ছিল, ‘আমার একটা অসুখ আছে৷ ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম৷ ছ’বছর ধরে সারাতে পারছি না৷ তবে মাথাটা ঠিক আছে৷’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here