galpo

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। মোনা আহিরিটোলার ঘাটে পৌঁছে দেখল ছেলেটা এসে গেছে। ছেলেটা মানে বীরেন। এই নামটাই সে বলেছিল মোনাকে। সত্যিমিথ্যে জানে না। এ লাইনে শুধুই নগদ, ধারবাকির কারবার নেই। তাই নামঠিকানা নিয়ে মাথা ঘামায় না কেউ। তাছাড়া মোনার ভাল নাম তো আর মোনালিসা নয়। অন্য কিছু। সেই নাম এখানে কেউ জানেও না।
সে যাই হোক, দুপুরবেলা হঠাৎ ঠেলা খেয়ে ঘুম ভেঙেছিল মোনার। চোখ খুলে দেখে সামনে লতা। লতা জিগ্গেস করে, ‘গঙ্গার ঘাটে যাবি! মামা পারমিশান দিয়েছে। আজ সেই ছেলেটাকে আসতে বলেছি। যে পনেরো হাজার দিয়ে মোবাইল কিনে দিয়েছিল আমায়।’ মাথাটা ফাঁকাফাঁকা লাগছিল মোনার। ঠিক বুঝতে পারছিল না। তাকিয়েছিল হাঁ করে। কাল ভোররাত অব্দি ড্যান্স ফ্লোরে ছিল সে। তারপর কাস্টমারের সঙ্গে একটা ফ্রি শট। ওই প্যাকেজের মধ্যেই আর কী। সব মিলিয়ে ঘুমোতে যেতে সকাল হয়ে গেছিল একেবারে। তার ওপর হুইস্কির হ্যাংওভার। ধাতস্থ হতে সময় নিয়েছিল কিছুক্ষণ। তারপর ঘুমজড়ানো গলায় জিগ্গেস করেছিল, ‘এই তো সেদিন দেখা করে এলি। আবার আজ! কাজ ছেড়ে এবার কী সংসারি হবি নাকি!’ লতা আকাশ থেকে পড়েছিল। ‘মাগির কথা শোনো। বলে কি না এই সেদিন! আজ কতদিন পর বেরব, তা বিশদিন তো হলই।’
‘বিশ দিন!’ যেন কষ্ট করে মনে করে মোনা। এই খোয়াড়ে থাকতে থাকতে দিনরাতের হিসেবই গুলিয়ে যায় তার। রাতের পর রাত শুধু মদ খাও আর পা ফাঁক করো। তার ওপর আছে ড্যান্স। সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে নাচতে হয়। গিয়ে বসতে হয় খদ্দেরের কোলে। দু’পায়ের ফাঁকটা অবশ হয়ে থাকে প্রায়ই। তবুও বুঝতে দিলে চলে না। খদ্দের বিরক্ত হয়। থাক সেসব কথা। ঘোর কাটাতে রিমোট টিপে এসিটা বাড়িয়ে দেয় সে। তারপর চালায় এলইডি টিভি। ওদের থাকার ঘরগুলো সাইজে মোটামুটি বড়। ব্যবসার ঘরের মতো ছোট্ট ঘুপচি আর অন্ধকার নয়। ওয়ারড্রোব, ফ্রিজ এইসব রেখেও দু’তিনজন ধরে যায় ঠিকমতো।
টিভি দেখতে দেখতেই মোনা বলে, ‘সে তো একপা বাড়িয়েই আছি। কিন্তু আমারও তো লোক দরকার। তার কী হবে!’
‘যাঃ বাবা। লোক মানে…। লাভার কি তোর একটা! সেই পুলিশ ছেলেটাকে ডাক। সাদা জামা সাদা প্যান্ট। কিম্বা ওই লোকটা, কীসের যেন ব্যবসা করে’, বলে লতা। মোনা জানে, দু’জনেই এখন অন্য মেয়ের ঘরে যাতায়াত শুরু করেছে। পাত্তা দেবে না তাকে। কিন্তু সেকথা সে বুঝতে দেয় না লতাকে। বলে, ‘না। ওসব চলবে না। পুরনো হয়ে গেছে। দাঁড়া নতুন একজনকে ডাকি। প্রচণ্ড ভালবাসে আমায়। যা আনতে বলব তাই আনবে।’ বলেই ঝট করে ফোনটা হাতে তুলে নেয় সে। তারপর ডায়াল অপশন টাচ করে আদেশের সুরে বলে, ‘অ্যাই শোনো, আমার জন্য খিচুড়ি আর আলুরদম নিয়ে ঠিক পাঁচটার সময় গঙ্গার ঘাটে চলে আসবে। দেরি হয় না যেন। আজ আমার খিচুরি খেতে মন চাইছে খুব।’ উলটো দিকের মানুষটাকে কিছুই বলার সুযোগ দেয় না মোনা। আর দেবেই বা কেন! রোজ না হয় একটা শরীর হয়ে এখানে থাকে সে। অন্যের ইচ্ছা মেটায়। কিন্তু গঙ্গার ঘাট! সেখানে তো সে শুধু শরীর নয়, আস্ত একটা মনও যাবে তার সঙ্গে। সেই খুশিতেই বোধহয় কট করে ফোন কেটে দেয় সে। তারপর দুষ্টুমিমাখা চোখে তাকায় লতার দিকে। চাউনিতে ‘কেমন দিলাম’ গোছের ভঙ্গি। লতা বলে, ‘মাসি আজ নেই। মামা গাড়ি ডেকে দেবে। ঠিক পাঁচটায় রেডি থাকিস কিন্তু।’

galpoলতা বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। তখন প্রায় দেড়টা। এই সময় থেকেই দিন শুরু হয় ওদের। মোনা স্নান সেরে খেতে বসে। অন্য দিন হলে দুপুরের পরই সাজগোজ করে নিতে হয় তাকে। গিয়ে দাঁড়াতে হয় সিঁড়ির মুখে কিংবা বারান্দার রেলিংয়ে। বিকেল হলেই শুরু হয় বাবুদের আনাগোনা। কিন্তু মোনা আজ সাজবে না। আজ সে গঙ্গার ঘাটে যাবে। তাদের এই সোনাগাছির বেশ্যাপাড়া থেকে মাত্র দশ কী পনেরো মিনিট। সঙ্গে লতা এবং আরও দু’একজন থাকবে। কারও একার জন্যে তো আর গাড়ি আসবে না এখানে! আবার হেঁটেও যেতে দেবে না এরা। মামার লোকজন চারিধারে ছড়ানো। একটু বেচাল হলে রক্ষে থাকবে না আর। তবে ওসব কথা এখন না ভাবাই ভাল। মাত্র এক কী দুই ঘণ্টা সময়। এই সময়টায় মুখে মেকআপ নিতে ইচ্ছা করে না মোনার। আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছা করে জলের ধারে। ঠিক ছোটবেলায় যেভাবে সে কল্পনা করত ‘খুকু গেছে জল আনতে পদ্মদিঘির ঘাটে’। তার ইচ্ছা করে ছেলেবেলার মতো ছলাৎছলাৎ ঢেউ মাখতে পায়ের পাতায়।
ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা। সূর্য এখনও আছে কিছুক্ষণ। তার লালচে আভা পড়েছে জলে। ঝিলমিল করছে মাঝগঙ্গায়। মোনাকে দেখেই এগিয়ে আসে ছেলেটা। তার হাতে ধরা ভাঁড়। ভাঁড়ে খিচুড়ি আর আলুরদম। আজ অন্নপূর্ণা পুজো। দূরে কোথাও ঢাক বাজছে। জলে ভেসে যাচ্ছে ফুল-বেলপাতা। সিঁড়ির ধাপে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছেলেমেয়ের দল। বসে আছে জোড়ায়-জোড়ায়। মোনা ঘাটে পা দিয়েই লক্ষ্য করেছে ওর-ই মধ্যে তাদের বাঙালি পট্টিরও দু’একজন মেয়ে আছে। দেহব্যবসা থেকে ছুটি নিয়ে যারা এসেছে তারই মতো কিছুক্ষণের জন্য মনের খেলায় মাততে। এই ঘাটটা এরকমই। অনেকেই আসে। শুধু প্রেমিক নয়, বাড়ির লোকজনের সঙ্গেও দেখাসাক্ষাৎ করে। মোনা নিজেও এসেছে দু’বার। তার মা আর ভাই কলকাতায় আসলে তাদের সঙ্গে দেখা করতে।
যাই হোক, ওরা গিয়ে বসে সিঁড়ির নিচের দিকের একটা ধাপে। জলের খুব কাছাকাছি। মোনা বলে, ‘কালই মা ফোন করেছিল। বলল আজ পুজো আছে। গ্রামে থাকতে অন্নপূর্ণা পুজোয় কত ভোগ খেয়েছি লাইন দিয়ে বসে। মা বাবা দাদা আমি। গরম গরম খিচুড়ি-আলুরদম। এখানে এসব হয় না। তাই তোমাকে বললাম।’ বীরেন প্রসাদসমেত ভাঁড়টা এগিয়ে ধরল মোনার দিকে। মনে হয় আশপাশের কোনও বারোয়ারিতলা থেকে আনা। তখনও গরম ছিল একটু। হলুদ খিচুড়ির ওপর সাদা ফুলের পাপড়ি। মোনা পাপড়িগুলো ফেলে না। ছোটবেলায় মা বলত, ‘ফুলের পাপড়ি পেটে গেলে পরীর মতো ডানা গজায়।’ ডানা তো তার গজিয়েইছে। তবে তা ওড়ার জন্য নয়। খদ্দেরদের পথ ভুলিয়ে ঘরে আনার জন্য। কথাটা মনে হতেই মনটা ভারি হয়ে ওঠে তার। মনে পড়ে যায় পুরনো দিনের কথা। সেই মুর্শিদাবাদে থাকত। ধূলিয়ানের কাছে। প্রত্যন্ত এক গ্রাম। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বিকেলবেলা জড়ো হয়ে গোল্লাছুট খেলা। সন্ধে হলেই দুলে দুলে পড়তে বসা। তারপর একটু বড় হলে স্কুল থেকে ফেরার সময় সাদাকাগজে লেখা প্রেমপত্র হাতে রাস্তার পাশে সাজ্জাতের নীরব দাঁড়িয়ে থাকা এবং শেষমেশ কলেজে পড়ার সময় গ্রামের এক দালাল মারফত তার এই লাইনে আসা।

galpoভাবতে ভাবতে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে থাকে মোনা। শেষবিকেলের স্রোত গায়ে মেখে ভিজে গামছায় উঠে আসে একটা লোক। লোকটার সঙ্গে গঙ্গার একঝাঁক স্নিগ্ধ হাওয়াও। মোনার লম্বা খোলাচুলে যেন হাত বুলিয়ে দেয় কেউ। বলে, দুঃখ কীসের! আমি তো আছি। মোনা সামনে ঝুঁকে পেতে দেয় তার পিঠ। হাওয়া বয়ে চলে তিরতির করে। বীরেন জিগ্যেস করে, ‘কী হল। এত কী ভাবছ!’ মোনা ম্লান হেসে ঘাড় নাড়ে।
‘না কিছু নয়।’ তারপর বীরেনের হাতের মধ্যে দিয়ে গলিয়ে দেয় নিজের হাত। মাথা রাখে তার কাঁধে। বীরেনের জামার হাতাটা ফাটা। গায়ে ঘামের গন্ধ। আর একদিনও লক্ষ্য করেছে সে। বড় ছেঁড়াফাটা জামা-প্যান্ট পরে আসে ছেলেটা। মোনা জিগ্গেস করেছিল, ‘নতুন নেই! রোজ রোজ এরকম জামা-প্যান্ট পরে আসো কেন!’ ঘাড় নেড়েছিল বীরেন।
‘মায়ের খুব শরীর খারাপ। প্যারালাইসিস। তাই ওসব দিকে আর নজর দেওয়া হয় না।’
সেদিন থেকেই মোনার ইচ্ছা ছিল একটা নতুন জামা কিনে দেবে তাকে। শপিংমলে দেখেছে সে। কলকাতার মেয়েগুলো সব টপাটপ জামা-প্যান্ট কেনে তাদের বর কিংবা বয়ফ্রেন্ডের জন্য। কিন্তু মোনার সে শখ পূরণ হল না আজও। তিন সপ্তাহ হয়ে গেল মাসি একটা কাজেরও পেমেন্ট করেনি তাকে। অথচ এই ক’দিনে আটান্নটা কাস্টমার নিয়েছে সে। যদিও ওর মধ্যে থেকে দশটা কাজের টাকা বাদ যাবে। সেগুলো সব মামার বন্ধুবান্ধব। ওদের থেকে টাকা নেওয়া বারণ। তবুও এদিক-সেদিক করে থাকে প্রায় পঁয়তাল্লিশটা কাস্টমারের টাকা। তার ওপর বারোটা ড্যান্স। সমস্ত টাকাই জমা আছে মাসির কাছে। তাদের তো নিজের রোজগারের টাকা কাছে রাখার নিয়ম নেই। রোজকার কাজের শেষে তা তুলে দিতে হয় মাসির হাতে। মাসে-দু’মাসে এক-আধবার বাড়ি যায় মোনা। বিশেষত পিরিয়ডসের সময়ে। ওই সময়ই টাকা দেয় মাসি। গত সপ্তাহেই ধূলিয়ান যাওয়ার কথা ছিল তার। দাদা একটা গাড়ি কিনবে লোনের টাকায়। ভাড়া খাটানোর জন্য। তারই ডাউন পেমেন্টের টাকা দিতে। কিন্তু মাসি হঠাৎ উলটো গান গেয়ে বসল সেদিন।
‘হ্যাঁ রে মোনা, এ হপ্তায় তোর টাকা কম কেন! ঘরে লোক হচ্ছে না!’
‘না হলে কী করব! লোক কি এবার বাইরে থেকে ধরে আনব’, উত্তর দিয়েছিল মোনা। মাসি খানিক থেমে বলেছিল, ‘আর ক’টা দিন মন দিয়ে কাজ কর তা হলে। তারপর বাড়ি যাওয়ার কথা বলবি।’ অগত্যা আর যাওয়া হয়নি মোনার। হাতে টাকা নেই একটাও। মঞ্জুর থেকে হাজার-পাঁচেক ধার করবে ভেবেছিল সে। কিন্তু বাট্টার টাকা বেশি চাওয়া নিয়ে দু’দিন আগেই খেমচা-খেমচি হয়ে গেছে তাদের। সেই থেকে মুখ দেখাদেখি নেই দু’জনের। মোনার হাতে নখের লাল চেরা দাগটা স্পষ্ট হয়ে রয়েছে এখনও।
বীরেন বলে, ‘এবারে কিন্তু অনেক দিন পর ডাকলে। শেষ এসেছিলাম সেই গতমাসের শুরুতে।’ মোনা হাতব্যাগ থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে। একটা লম্বা টান দিয়ে বলে, ‘বেরলামই তো অনেক দিন পরে। কী করব বলো! রোজ রোজ তো আর কাজ ছেড়ে আসতে পারি না।’ বীরেন বলে, ‘কতবার বলেছি বেরতে যখন পারো না তখন আমিই চলে যাই তোমার ঘরে। সেখানে তো আর কারও কিছু বলার নেই! কিন্তু তাতেও যে তোমার কী অসুবিধা!’ মোনা ঘাড় নাড়ে।
‘অসুবিধা আছে। মাসি ছাড়বে না। কাজের সময় কোনও গেস্ট গেলেও ওকে ওর পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে দিতে হবে। পুরো টাকাটা যাবে আমার পকেট থেকে। তাছাড়া আমিও চাই না আর পাঁচটা কাস্টমারের মতো তুমি আমার ঘরে এসো।’
কথা শেষ করে সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে মোনা। ঘাটের আলোগুলো জ্বলে উঠেছে কখন। সিঁড়ির ধাপে বেড়ে চলেছে জলের ছলাৎছল শব্দ। জোয়ার শুরু হয়ে গেছে মনে হয়। ঢেউগুলো এবার একটু-একটু করে এগিয়ে এসে ছুঁয়ে ফেলবে তার পা। পা, নাকি তার সমস্ত শরীরটাকে! মনের সমস্ত অলিগলি, ছেলেবেলার সেই জল-কুমারী খেলার মতো। একদৃষ্টে ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে মোনা।

galpoকিন্তু হঠাৎ-ই ফোন এসে যায় লতার। ‘কতক্ষণ হল খেয়াল আছে! এবার তো ফিরতে হবে।’ মোনা ধীরপায়ে উঠে গিয়ে গাড়িতে বসে। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়। মোনা জানালার নামানো কাচ দিয়ে তাকিয়ে থাকে। বাইরে একরাশ খোলাহাওয়া। তবুও দমবন্ধ হয়ে আসে তার। কিছুক্ষণ পর নজরে পড়ে ব্যস্ত রাস্তার ফুটে পুরনো জামাকাপড়ের পসরা সাজিয়ে এক যুবক। আচমকা চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মোনার। গাড়ি দাঁড় করিয়ে ছুটে যায় সে। হাত-পা নেড়ে কীসব কথা হয় দু’জনার। মোনা ফিরে আসে পুরনো পালিশ করা একজোড়া জামা-প্যান্ট হাতে। লতা তাকিয়ে থাকে তার হাঁ-মুখ নিয়ে। মোনা দুষ্টু হেসে বলে, ‘আমার পুরনো কাস্টমার। জোর করে আদায় করলাম। বললাম, আজ দাও। পরে পুষিয়ে দেব।’ লতা তাল ঠোকে, ‘বেশ করেছিস। কালো জামা, কালো প্যান্ট। তোর লাভারকে হেব্বি মানাবে কিন্তু।’ বলেই জড়িয়ে ধরে মোনাকে। প্রাণটা জুড়িয়ে যায় মোনার। গঙ্গার ধেয়ে আসা শীতল হাওয়ায় ঠিক যেমনটা হয় আর পাঁচটা মানুষের।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here