kolkata bengali news

মহানগর ওয়েবডেস্ক: একটা সময় ছিল যখন দিনের পর দিন প্রেমিকাকে না দেখে, স্রেফ তাঁর কথা ভেবে, তাঁর হাতে লেখা চিঠি পড়েই দিন কাটিয়ে দিতেন কোনও এক প্রেমিক। অমর হয়ে থাকতো সেই সব প্রেমগাঁথা। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই ‘জনম জনম কা সাথ’ জানালা দিয়ে ফুড়ুৎ। আর ‘লং ডিসটেন্স রিলেশনশিপ’? জেনারেশন ‘ওয়াই’য়ের যেকোনও কাউকে প্রশ্ন করুন, সকলেই মেনে নেবে, ‘ওটা বেশিদিন টেকে না’।

সত্যিই কি টেকে না এই ‘লং ডিসটেন্স রিলেশনশিপ?’ আজকের এই দ্রুততার যুগে ধীরে ধীরে ভালবাসার বন্ধনগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছে মানুষের কাছে। লোপ পাচ্ছে সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো। কিন্তু এই কলিকালেও ভালবাসার আলাদা সংজ্ঞা তৈরি করছে ক্লেপাতান। স্রেফ নিজের প্রেমিকাকে এক নজর দেখার জন্যই সে পাড়ি দেয় ৮০০০ মাইল (প্রায় ১৩০০০ কিমি)। না, ক্লেপাতান কোনও ‘কলির রোমিও’ মানুষ নয়। সে আসলে একটি সারস। তার নিবাস দক্ষিণ আফ্রিকায়। আর তার প্রিয়তমা থাকে ক্রোয়েশিয়ায়। শেষ ১৬ বছর ধরেই সে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে উড়ে আসে ক্রোয়েশিয়া, স্রেফ নিজের প্রেমিকার সঙ্গে একাত্ম হতে।

ক্লেপাতানের সঙ্গিনীর নাম ম্যালেনা। ১৬ বছর আগে এক পুকুরের ধারে তাকে আহত অবস্থায় পরে থাকতে দেখেন ক্রোট নাগরিক স্তেপান ভকিচ। তিনি জানান, ‘আমি যদি সেদিন ওকে পুকুরের ধারে ফেলে রেখে আসতাম তাহলে ম্যালেনাকে আর বাঁচানো যেত না। হয়তো শিয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খেত। কিন্তু আমি ওকে সুস্থ করে তুলি। তারপর থেকে ওর খেয়াল রাখাই আমার দায়িত্ব।’

কিন্তু ম্যালেনার ডানা ভেঙে যাওয়ায় সে আর ঠিক করে উড়তে পারে না। দীর্ঘদিন ম্যালেনার খেয়াল রাখার সুবাদে ভকিচ লক্ষ্য করেন, বছরের নির্দিষ্ট সময় এলেই একটি সারস বেশ কিছুদিনের জন্য এসে ম্যালেনার সঙ্গে থাকে। ভকিচ ম্যালেনার পুরুষ সঙ্গীর নাম দেন ক্লেপাতান। সাধারণত ওই প্রজাতির সারসরা (স্টর্ক) সারা জীবন একসঙ্গেই থাকে। কিন্তু ম্যালেনা ও ক্লেপাতানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু ব্যতিক্রম। তারা দুজনে বছরের স্রেফ একটা নির্দিষ্ট সময়ই একসঙ্গে কাটায়। আর ক্লেপাতানের এই বার্ষিক আগমনের সময় ভকিচ এক বালতি মাছ খাদ্যস্বরূপ দিয়ে অভ্যর্থনা জানান।

কিন্তু ভকিচেরও একটা সময় কৌতূহল জাগে, ক্লেপাতানের নিবাস কোথায়? একটা বছর ক্লেপাতানের ডানায় ট্র্যাকিং রিং লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভকিচ। তাতে দেখা যায় সুদূর কেপ টাউন থেকে প্রতি বছর ক্রোয়েশিয়া উড়ে আসে ক্লেপাতান। আর এই লম্বা পথ পাড়ি দিতে তার সময় লাগে প্রায় এক মাস।

কিন্তু সব প্রেমের উপাখ্যান বোধহয় সুখের হয় না। সময় পেরিয়ে গেলেও এবছর এখনও পর্যন্ত দেখা নেই ক্লেপাতানের। মার্চ মাসে ম্যালেনার সঙ্গে দেখা করতে একটি সারস এসেছিল ঠিকই, কিন্তু সেটি ক্লেপাতান নয়। ভকিচের ছেলে ডারিও জানান, ‘আমার মনে হয় না ওই সারসটি ক্লেপাতান। কারণ, ওর আচার ব্যবহার একেবারেই আলাদা। এই সারসটি এখানে শুধু মাছ খেতে আসে। ক্লেপাতান কিন্তু যখন আসত, সর্বদা ম্যালেনার সঙ্গে থাকতো।’

ভকিচের আশঙ্কা হয়তো বয়সের কাছেই হার মানতে হয়েছে এই প্রেমকে। ‘এটাই প্রকৃতির নিয়ম। আমার মনে হয় হয়তো বয়সের কারণেই আর কখনও আসা হবে না ক্লেপাতানের। গত বছর যখন ও এসেছিল, দেখে মনে হচ্ছিল ক্লেপাতান খুব ক্লান্ত’, জানান হতাশ ভকিচ।

যুগে যুগে ভালবাসা সব বাধা বিপত্তিকে জয় করে এক হলেও ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছেন রোমিও-জুলিয়েট, হীর-রানঝার মতো অপূর্ণ কিছু ভালবাসা। তেমনই অপূর্ণ হয়েও চির-অমর হয়ে গেল ক্লেপাতান-ম্যালেনার এই অনন্য প্রেমের উপাখ্যানও।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here