মাটি খুঁড়তেই মিলল ৫০ লক্ষের চকচকে হিরে, গ্রেফতার পাচার চক্রের মূল পাণ্ডা

0
89
kolkata bengali desk

রাজেশ সাহা, কলকাতা: এ যে সে পাচার চক্র নয়। একবার কাজ হাসিল হলেই পকেটে কোটির অঙ্ক। তবে মিশনে নামার আগে ঝালিয়ে নেওয়া চিত্রনাট্যের বহর দেখলে মাথায় আসতে পারে একাধিক ব্লকবাস্টার হিন্দি ছবির নামও। এযেন একেবারে হিন্দি ছবিরই ২টি জ্বলজ্বল করা চরিত্র। প্রথম চরিত্রের নাম মান্নান শেখ। সুদর্শন যুবক। প্রবাসী বাঙালি, কাজের সূত্রে থাকেন বাণিজ্য নগরী মুম্বইতে। পেশায় হিরে ব্যবসায়ী। আদি বাড়ি হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায়। ব্যবসার প্রয়োজনে মুম্বই – কলকাতা যাতায়াত লেগেই থাকে। দ্বিতীয় চরিত্রের নাম শাকিল হোসেন। পেশায় অভিজ্ঞ গহনাকর্মী। কাজের প্রয়োজনে বিভিন্ন শহর ঘোরা। হাতের নিপুণ কাজের জন্য অল্পতেই কাজ পেয়ে যান যে কোনও গহনার দোকানে। তবে খুব বেশি দিন এক জায়গায় কাজ করেন না।

 

গত ২৩শে সেপ্টেম্বর কলকাতার গিরিশ পার্ক থানায় প্রসেনজিৎ মাল নামের এক গহনা ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, এক কারিগরের কাছে গহনা পাঠানোর পর তা আচমকা গায়েব হয়ে গিয়েছে। বারবার দরবার করেও মেলেনি ৯৬টি হিরে বসানো সেই বহুমূল্যের সোনার চেন। যার বাজার দর প্রায় লাখ পঞ্চশ। অভিযোগের তীর, কাজের দায়িত্ব নেওয়া কারিগরের বিরুদ্ধে। ব্যবসায়ীর অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে গিরিশ পার্ক থানার পুলিশ। প্রাথমিক জেরা শুরু হয় অভিযুক্ত কারিগরকে নিয়ে। ততদিনে পঞ্চাশ লক্ষের গহনার চিন্তায় কালঘাম ছুটেছে সাদামাটা ওই ব্যবসায়ীর। জেরায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও সন্দেহের উর্ধ্বে ছিলেন না তিনি। এরপরই তদন্তভার হাতে নেয় লালবাজার।

তদন্তে নেমে নজরদারি শুরু হয় গহনার ওই ওয়ার্কশপে। জেরা করা হয় কর্মীদের। কিছুদিনের মধ্যেই কাজ ছেড়ে হঠাৎই নিখোঁজ হয়ে যায় ওই ওয়ার্কশপের দক্ষ কর্মী শাকিল হোসেন। এরপরেই সন্দেহের তীরের মুখে তাঁকে রেখে এগিয়ে যায় লালবাজারের তদন্ত। তবে এই তদন্ত যতই এগোই, ক্রমশ কেঁচো খুঁড়তে কেউটের সন্ধান পেতে শুরু করেন গোয়েন্দারা। শাকিলের ওপর গোপনে লাগাতার নজরদারি চালিয়ে যান তদন্তকারী আধিকারিকরা। সাহায্য নেওয়া হয় বিশেষ প্রযুক্তিরও। আর এতেই মেলে প্রাথমিক সাফল্য। গোপন সূত্রে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, খোয়া যাওয়া হিরে হাত বদল হয়ে পৌঁছে যায় মুম্বইয়ের বাসিন্দা মান্নানের কাছে। এরপরেই তা চরা দামে পাচার হয় আন্তর্জাতিক হিরের বাজারে। মুনাফা – কোটি কোটি টাকা। তদন্ত যতই এগোয় জটিল চিত্রনাট্য ততই পরিস্কার হতে শুরু করে তদন্তকারী আধিকারিকদের কাছে।

এই গোটা গল্পে মান্নান ও শাকিল, ২জনের ভূমিকা অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে। মুম্বইয়ের বাসিন্দা মান্নান শেখ নিজের সোর্স কাজে লাগিয়ে একাধিক গহনার দোকানে কাজ পাইয়ে দিত শাকিলকে। অভিজ্ঞ হিরে ব্যবসায়ীর মুখের কথা ফেলতে না পেরে শাকিলকে কাজে নিয়ে নিতেন বিভিন্ন গহনার দোকানের মালিকরা। এরপরে ধিরে ধিরে এগোতো নয়া মিশনের ব্লু প্রিন্ট। সঠিক সময় এলেই চিত্রনাট্য অনুযায়ী কাজ হাসিল করে পগার পার শাকিল। কিন্তু এতোদিন পুরোপুরি ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিল মান্নানের নাম। প্রথমবার তা আতস কাঁচের তলায় আসে কলকাতা পুলিশের তদন্তে। গোপন সূত্র কাজে লাগিয়ে মান্নান সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করে জানা যায়, খুব শিগগিরই হাসিল করা হিরে হাতাতে মুম্বই থেকে কলকাতা পাড়ি দেবে এই ব্যবসায়ী। সেই মতো নির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী ফাঁদ পাতা হয় বিমানবন্দরে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কলকাতায় পা দিতেই মান্নান শেখকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেন বিমানবন্দরে সাদা পোশাকে মোতায়েন থাকা লালবাজারের গোয়েন্দারা। পুলিশি জেরায় নিজের অপরাধ কবুল করে মান্নান জানায়, চুরির উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন গহনার দোকানে শাকিলকে নিয়োগ করত সে। কয়েক মাস কাজ করেই জল মেতে নিত চুরির কাজে দক্ষ শাকিল। এরপর হাওয়া বুঝে গহনা হাতিয়ে চম্পট। চুরি যাওয়া সেই গহনা বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করতো মান্নান। আর এই আসল কাজ হাসিল করার পারিশ্রমিক হিসেবে শাকিলের মিলত সাকুল্যে ২০-২৫ হাজার টাকা। এই ভাবেই মাসের পর মাস নিপুণ হাতে একের পর এক মিশন সফল করেছে মান্নান-শাকিল জুটি। তবে তাল কাটলো এই প্রথমবার। লালবাজারের দুঁদে গোয়েন্দাদের ফাঁদে পড়ে।

আপাতত শ্রীঘরে ঠাঁই হয়েছে হিরে পাচারকারী মান্নান শেখের। তাকে জেরা করে সন্ধান মেলে চুরি যাওয়া ৫০ লক্ষ টাকার গহনার। জেরায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মঙ্গলবার কলকাতা পুলিশের একটি দল হানা দেয় হুগলি জেলায় গুপ্তিপাড়ায় মান্নানের দেশের বাড়িতে। সেখানে প্রায় কয়েক ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে মেলে গিরিশ পার্ক এর ওই দোকান থেকে চুরি যাওয়া সোনার হারটি। যাতে অক্ষত রয়েছে ৯৬টি হিরের টুকরো। লালবাজারের এক শীর্ষ কর্তা বুধবার বলেন, তদন্তে নেমেই এই চক্রের মূল পাণ্ডাকে আমরা গ্রেফতার করতে পেরেছি, এটা পুলিশের বড় সাফল্য। কিন্তু শাকিল? সেতো এখনও বেপাত্তা! কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান তথা জয়েন্ট কমিশনার (ক্রাইম) মুরলীধর শর্মার আশ্বাস, “খুব শীঘ্রই গ্রেফতার হতে চলেছে শাকিল হোসেন “।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here