assam

বাসব রায়: দু’চারটে কথা ফটাফট বলে নেওয়া ভাল।
১। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলে ‘রিলিজিয়াস পারসিকুইশন’ শব্দবন্ধ নেই।
২। শুধু ছয়টি ধর্মের উল্লেখ আছে-– হিন্দু, জৈন, শিখ, বৌদ্ধ, পার্সি, খ্রিস্টান।
৩। কাট অব ডেট-– ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪।
৪। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এই তিনটি দেশ উল্লেখিত।
৫। ৫ বছর শরণার্থী থাকলেই নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন উল্লেখিত ছয় ধর্মাবলম্বীরা।
৬। শরণার্থী সময়পর্ব শেষ হচ্ছে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯। অর্থাৎ এই মাসেই।
৭। উল্লেখিত ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ডি-ভোটার সংক্রান্ত মামলা যাঁদের চলছে, নাগরিকত্ব না পাওয়া পর্যন্ত চলতে থাকবে।
৮। উল্লেখিত ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ডিটেনশন ক্যাম্পে যাঁরা রয়েছেন নাগরিকত্ব পাওয়া না পর্যন্ত মুক্তি পাবেন না।
৯। বিলে ‘কন্ডিশন’, ‘রেস্ট্রিকশন’ ও ‘ম্যানার’ উল্লেখিত। এই তিনটি শব্দের ব্যাখ্যা স্পষ্ট করা হয়নি। নাগরিকত্ব পাওয়ার বিশেষ শর্ত থাকতে পারে (কন্ডিশন), কিছু নাগরিক অধিকারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে (রেস্ট্রিকশন) এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার পদ্ধতি জটিল হতে পারে (ম্যানার)। সবই অনুমানসাপেক্ষ।
১০। উত্তর-পূর্ব ভারতের যেসব রাজ্যে প্রবেশ করতে ইনার লাইন পারমিট দরকার, সেই সব রাজ্য এবং অসম, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও মিজোরামের ষষ্ঠ তফশিলভুক্ত অঞ্চলে বিল কার্যকরী নয়।
দুই-সোয়া দুই পৃষ্ঠার বিল পড়ে এটুকুই বুঝেছি যে, এত স্পষ্টভাবে মুসলমানদের অনাগরিক করার কথা আর কেউ বলেনি। সম্ভবত ভাবেওনি।

এটা বিজেপি ও আরএসএস-এর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বিল। আজ লোকসভায় পাস হয়েছে। আগামীকাল রাজ্যসভায়ও, সম্ভবত।
১৯৪৭ সালে, ভারতভাগের সময়, মহম্মদ আলি জিন্নার যুক্তি ছিল মুসলমানদের দেশ হওয়া দরকার। পাকিস্তান হয়েছে, যা শুধুই মুসলমানের দেশ। আর ভারত ছিল সব মানুষের জন্য। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে আন্দোলন করে নয়, ভাষার আন্দোলনে। বর্তমান শাসক ভারতকে ‘শুধুই হিন্দুর’ করার খেলায় মেতেছে, যা একেবারে সর্বনাশা।
এনআরসি-ছুট উনিশ লক্ষের মধ্যে মোটামুটি বারো লক্ষ হিন্দু, এমনটাই সব পক্ষের অনুমান। এবং এই নামহীনদের মধ্যে সবাই বাঙালি। সেজন্য অসমে কোনও বাঙালি হিন্দু সংগঠন সিএবি বিরোধিতায় নেমেছে এটা বিজেপি কিছুতেই মানতে পারে না। আর তাই গতকাল গুয়াহাটিতে সিএবি-বিরোধী একটি সভা করতে দেয়নি পুলিশ। যার আয়োজক ছিল বিভিন্ন হিন্দু বাঙালি সংগঠন।
ভারতীয় সমাজে বিভাজনের খেলায় নেমেছে বিজেপি। আর তার জেরে ধীরে ধীরে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে অসম। ছয় বছর ধরে এনআরসি প্রক্রিয়া চলেছিল প্রকৃত ভারতীয় নির্ধারণের জন্য। যার কাট-অব-ডেট ছিল ২৪ মার্চ, ১৯৭১। অসমে যা এতদিন সর্বজনমান্য ছিল, অসম চুক্তি, তারও কাট-অব-ডেট ওটাই। এবং নতুন বিল এই কাট-অব-ডেটকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই অশান্ত অসম।

বিল ভাল করে নিরীক্ষণ করলে পরিষ্কার যে, এর সুবাদে সবচেয়ে বেশি সুবিধে পাবেন বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু বাঙালিরা। কেন না উল্লেখিত অন্যান্য পাঁচটি ধর্মের মানুষ বাংলাদেশ থেকে ভারতে কমই এসেছেন। আর কে না জানে অসম আন্দোলনই হয়েছিল অসম থেকে বিদেশি (বাংলাদেশি) তাড়াতে। এই বিল সেইসব মানুষকেই নাগরিকত্ব দেবে, এর প্রতিবাদে অসমে জোরদার হচ্ছে সিএবি-বিরোধী আন্দোলন।
আর এখানেই অসমের বাঙালিরা সংকটে পড়ছেন। কেন না এখন ‘লাচিত সেনা’ নামক সংগঠন খোলাখুলি বলছে ‘রাস্তাঘাটে বাঙালিদের মারব’।
অসম চুক্তি হয়ে যাওয়ার পর অসমে শান্তি ছিল প্রায় ৩৫ বছর। ভ্রাতৃত্বের পরিবেশে অসমিয়া-বাঙালি বাস করছে, এখনও। কিন্তু সিএবি-উত্তর অসমে সেই ভ্রাতৃত্ব কলুষিত হওয়ার দিকে যেতে পারে। আশঙ্কা এটাই।
এবং অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিচ্ছে কলকাতার ভুঁইফোঁড় সংগঠন ‘বাংলা পক্ষ’। গর্গ চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর সঙ্গীসাথিরা উসকানিমূলক পোস্ট এবং কথাবার্তা বলে অসমের বাঙালিকে আরও সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। মুসলমান সম্পর্কে আরএসএস-এর মনোভাবেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে অসমিয়াদের প্রতি গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের পোস্টে।
বাংলা পক্ষকে অনুরোধ, সতর্কতাও ধরতে পারেন, কলকাতার মতো নিরাপদ বিবরে বসে উসকানিমূলক পোস্ট-বিবৃতি না দিয়ে সত্যিকারের সিএবি-বিরোধিতা দেখাতে হলে অসমে আসুন। আর না-পারলে নীরব থাকুন।
আমাদের, অসমের বাঙালির, সমস্যা আমাদেরই বুঝে নিতে দিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here