রাজেশ সাহা, কলকাতা: বেশ কয়েক মাস আগেকার কথা। বেহালা চৌরাস্তার কাছে বাইকে বসে ডিউটি করছিলেন এক কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্ট। হঠাৎ নজরে এল, ট্রাম ডিপোর দিক থেকে স্কুটি চালিয়ে বেশ দ্রুত গতিতে ছুটে আসছেন হেলমেটহীন এক মহিলা আরোহী। যথারীতি ওই যুবতীর পথ আটকে গাড়ি ‘সাইড’ করতে বলেন ট্রাফিক সার্জেন্ট। স্কুটি স্ট্যান্ড করিয়ে ট্রাফিক সার্জেন্টের মুখোমুখি হন ওই মহিলা। রাস্তায় স্কুটি নিয়ে বেরিয়ে হেলমেট না পরার কারণ জানতে চান কর্তব্যরত আধিকারিক। এমন প্রশ্ন শুনেও চোখেমুখে অনুশোচনার লেশমাত্র নেই তাঁর। সটান মুখের ওপর সার্জেন্টকে যুবতী জানিয়ে দেন, সবে মাত্র পার্লার থেকে মোটা টাকা খসিয়ে ‘হেয়ার স্ট্রেইটনিং’ করিয়ে ফিরছেন তিনি। এজন্য গচ্চা গেছে গোটা হাজার চারেক টাকা। পার্লার থেকে স্পষ্ট বলে দিয়েছে, আগামী চার দিন ভুলেও চুলে জল লাগাতে না। এই অবস্থায় মাথায় হেলমেট? নৈব নৈব চ। ট্রাফিক সার্জেন্ট পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, তাঁর চুলের যত্ন না জীবন, কোনটা আগে? বছর তেইশের ওই যুবতী জানিয়ে দেন, “এতসব জানি না, চার হাজার টাকা দিয়ে চুল সোজা করিয়ে, তারপর হেলমেট পরে সেটা নষ্ট করতে পারবো না। তার জন্য ফাইন নিলে নিন।” ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে খবর, বিগত দু’বছরে এই একই অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছেন শহরের একাধিক ট্রাফিক সার্জেন্ট।

কয়েক সপ্তাহ আগেই আরেক অভিনব অভিজ্ঞতা হয়েছে বাইপাসের ধারে হাইল্যান্ড পার্কের কাছে কর্মরত এক সার্জেন্টের। তিনি জানান, সাত সকালে হেলমেট না পরেই স্কুটি চালিয়ে অফিস যাচ্ছিলেন এক মহিলা। পথ আটকে, হেলমেট কোথায় জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, “চুলে শ্যাম্পু করার পর আমি হেলমেট পরতে পারি না। শ্যাম্পু করে হেলমেট পরলে চুলে জট পাকিয়ে যায়। ওই ভাবে অফিস যাওয়া যায় না।” কিন্তু বিপদ এলে গোটা জীবনটাই জট পাকিয়ে যাবে কিনা? উত্তরে তিনি সোজাসাপটা বলেন, “কিছু করার নেই। ফাইন নিলে দিয়ে, দেব কিন্তু সব পরিস্থিতিতে কথায় কথায় হেলমেট পরা সম্ভব হয় না”। এই যুক্তি শুনেই তাজ্জব হয়ে যান ওই এলাকার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক সার্জেন্ট। যদিও আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিয়ে তবেই ছাড়া হয় যুবতীকে।

দমদমের বাড়ি থেকে প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের অফিসে স্কুটি চালিয়ে নিত্য যাতায়াত করেন বছর উনত্রিশের এক যুবতী। পুলিশের কড়াকড়িতে হেলমেট পরতে বাধ্য হলেও, আশেপাশে ট্রাফিক সার্জেন্ট নেই দেখলেই মাথা থেকে হেলমেট খুলে ফেলার বদ অভ্যেসটা মাঝে মধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই করতে গিয়েই একদিন হাতেনাতে ধরা পড়ে যান এক সার্জেন্টের কাছে। ওই মুহুর্তে তাঁর মাথায় হেলমেট না থাকার কারণে যথারীতি আইনি পদক্ষেপ করেন পুলিশ আধিকারিক। আর তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়ে রীতিমতো অগ্নিশর্মা রূপ ধারণ করেন ওই যুবতী। হেলমেট পরার বিপক্ষে সওয়াল করে তিনি বলেন, “মাথায় চুলের ক্লিপ থাকলে সব সময় হেলমেট পরতে অসুবিধা হয়”। জোর করে হেলমেট পরালে ‘মাথায় ভীষণ লাগে’ বলেও জোর গলায় দাবি করেন ওই যুবতী।

ইএম বাইপাসের ধারে কর্মরত অধিকাংশ ট্রাফিক সার্জেন্ট জানাচ্ছেন, মেইন রোড বাদ দিয়ে সার্ভিস রোডে গাড়ি নিয়ে বেরোলেই হেলমেট না পরার প্রবণতা বেশি। বাইপাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় ডিউটি পড়লে একই সঙ্গে সার্ভিস রোডে সমান ভাবে নজরদারি চালানো সম্ভব হয় না। ফলে সেই সুযোগে হেলমেট না পরেই চলে যান অনেকেই। একজন সার্জেন্ট বলেন,”কয়েকদিন আগেই এক মহিলাকে ধরলে, কিছুতেই দোষ মানতে চাইছিলেন না। নিজের দাবিতে অবিচল থেকে বারবার বলে যাচ্ছিলেন, আমি তো সার্ভিস রোড দিয়ে গাড়ি চালিয়েছি, মেইন রোডে তো উঠিনি!” নিজের আজব যুক্তি দিয়ে ওই সার্জেন্টের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিয়ে কার্যত নাজেহাল অবস্থা করে ছেড়েছিলেন তিনি

কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে খবর, হেলমেট না পরার পেছনে মহিলাদের সব থেকে বেশি ব্যবহৃত অজুহাত হল ‘মাথা যন্ত্রণা’। লালবাজার ট্রাফিক দফতরের এক কর্তা জানান, “সাম্প্রতিক কালে একটা নতুন প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। হেলমেট ছাড়া গাড়ি চালাতে গিয়ে ধরা পড়লেই সবাই চট করে বলে দেন, মাথা যন্ত্রণার সমস্যা আছে, হেলমেট পড়লেই মাথা যন্ত্রণা করে, তাই পড়তে পারি না”। এক ট্রাফিক গার্ডের ওসি জানান, “এই বাহানার সংখাই এখন সব থেকে বেশি। কেউ কেউ তো আবার ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন পর্যন্ত দেখিয়ে দেন”। তবে শহরের চিকিৎসকরা কিন্তু এই দাবি একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না। চিকিৎসক মহল সূত্রে খবর, সম্প্রতি এই বিষয়ে একটি গবেষণা চালায় ইন্টারন্যাশনাল হেডেক সোসাইটি। সেখানে দাবি করা হয়েছে, এক্সটার্নাল কম্প্রেসার বা বাহ্যিক চাপের কারণে কারোর কারোর মাথা যন্ত্রণা করতে পারে। কিন্তু সেটা সেই অর্থে বড় রোগ নয়। হেলমেট খুলে ফেলার এক ঘণ্টার মধ্যেই তা সেরে যায়। এই বিষয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ অরিন্দম বিশ্বাস বলেন, “এক্সটার্নাল কম্প্রেসার ছাড়া মাথা যন্ত্রণার সঙ্গে হেলমেট পরার সেই অর্থে কোনও সম্পর্ক নেই। হেলমেট না পরলে মাথা যন্ত্রণা করাটা অনেকটাই মানসিক। এর নেপথ্যে সেভাবে কোনও বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি নেই।” তাঁর পরামর্শ, “সব সময় মাথার সঠিক মাপ অনুযায়ী হেলমেট পড়া উচিত। মাথা থেকে হেলমেটের পরিমাপ ছোট হয়ে গেলেই একটা বাহ্যিক চাপ তৈরি হয়, তখনই মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়। এছাড়া আর কোনও কারণ নেই”।

পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু মিছিলে লাগাম টানতে ‘সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ’ চালু করেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পুলিশ প্রশাসনের লাগাতার প্রচারে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার আগের থেকে কমেছে অনেকটাই। কয়েক বছর আগেও শহর কলকাতা বাদ দিয়ে জেলার দিকে এগোলেই আর সেভাবে চোখে পড়ত না ট্রাফিক আইন মানা নিয়ে পুলিশের সক্রিয়তা। কিন্তু বছর কয়েক আগে ‘সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ’ প্রকল্প চালুর পর মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ট্রাফিক আইন নিয়ে পুলিশের কড়াকড়ি বেড়েছে গোটা রাজ্য জুড়েই। তবে শুধু হেলমেটটাই যেন না পরতে পারলেই বাঁচা যায়। তার জন্য বাইক আরোহীরা খুঁজে নিচ্ছেন নিজের মতো করে নতুন নতুন অজুহাত। যেই প্রবণতায় নিজেদের প্রথম সারিতে রেখেছেন শহরের মহিলারা। এক ট্রাফিক আধিকারিকের কথায়, “হেলমেট না পরে ধরা পড়লে নানা বাহানা নারী-পুরুষ সকলেই কম বেশি দেন, তবে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, উদ্ভট ধরনের যুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে মহিলারা অনেক এগিয়ে। এই ক্ষেত্রে কম বয়সী মহিলাদের মধ্যে প্রবণতাটা বেশি দেখা যায়। তবে যে যাই বলুক, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয় সবার ক্ষেত্রে। এই ব্যাপারে কাওকে রেয়াত করা হয় না।”। তাঁর আরও আক্ষেপ, “হেলমেটটা যে নিজের সুরক্ষার জন্য সেটা এদের কে বোঝাবে বলুন তো? আগে নিজে বেঁচে থাকলে তবে তো রূপের যত্ন”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here