নিজস্ব প্রতিবেদক, সিউড়ি: ২০১৩তে শুরু। সে বছরের আগস্ট মাসে দুষ্কৃতিদের গুলিতে খুন হন অশোক ঘোষ। ঠিক তার এক বছর পরেই এলাকারই দলের বিরোধী গোষ্ঠীর মাথা অশোক মুখার্জি খুন হন ঠিক একভাবেই। এবার তার পাশে জুড়ল অশোক ঘোষের ভাই দীপক ঘোষের নাম। তিনিও খুন হয়ে গেলেন দুষ্কৃতিদের গুলিতে। তিনটি খুনেরই কেন্দ্রে বীরভূমের সিউড়ি সদর মহকুমার খয়রাশোল ব্লক। ঘটনাচক্রে অশোকবাবু ও দীপকবাবু দুই ভাইই তৃণমূল কংগ্রেসের খয়রাশোল ব্লকের দলীয় সভাপতি ছিলেন। তাই তিন তিনটি খুনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জুড়ে গিয়েছে রাজনীতির যোগাযোগ। দীপক ঘোষের খুনের জন্য জেলা তৃণমূল সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল যেমন সরাসরি কাঠগড়ায় তুলেছেন বিজেপিকেই তেমনি বিজেপির তরফে এই খুনের জন্য রাজ্যের শাসক দলের গোষ্ঠীকোন্দলের কথাই তুলে ধরেছে। পুলিশ ইতিমধ্যেই এই খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে ৭জনকে আটক করেছে। কিন্তু তারপরেও ঘটনার পিছনে শাসক শিবিরের গোষ্ঠীকোন্দলের সম্ভাবনার কথা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

খয়রাশোল ব্লকের তৃণমূল সভাপতি দীপক ঘোষ(৪৫) রবিবার দুপুরে একটি ফুটবল খেলার অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে হিংলো নদীর নির্জন এলাকায় দুষ্কৃতীদের হামলায় জখম হন। সেই সময় দুষ্কৃতীরা তাকে লক্ষ্য করে ৫ রাউন্ড গুলি করে পাশাপাশি ভোজালির কোপও মারে। তাকে জখম অবস্থায় প্রথমে নাগরাকোন্দা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে দুর্গাপুরের এক বেসরকারি নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই এদিন বেলা একটা নাগাদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দীপকবাবু। এদিন রাত্রে তৃণমূল নেতার মৃতদেহ খয়রাশোলে তার বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। উপস্থিত ছিলেন জেলা তৃণমূল সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল সহ সমস্ত পদাধিকারীরা। ঘটনার জেরে জেলা তৃণমূল সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল জানান, এই খুনের ঘটনায় সরাসরি বিজেপি যুক্ত। দীপক এলাকায় দক্ষ সংগঠক ছিল। তাকে ষড়যন্ত্র করে মারা হয়েছে। তার জন্যই বিজেপি সেখানে দাঁত ফোটাতে পারেনি। বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হবে বলেও তিনি জানান। যদিও রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ জানিয়েছেন, ঘটনার পিছনে শাসক শিবিরের গোষ্ঠীকোন্দলই কাজ করছে। তার মতে খয়রাশোল এলাকার বালি খাদানের দখলকে ঘিরেই তৃণমূলের অন্দরে এই খুনখারাপি শুরু হয়েছে।

পাশাপাশি এদিন সকালে জেলার লাভপুর ব্লকের দ্বারকা গ্রামের ময়ুরাক্ষী নদীর পাড় সংলগ্ন গাছ থেকে ঝুলন্ত এক বিজেপি কর্মীর মৃতদেহ উদ্ধারকে ঘিরেও পরস্পর বিরোধী অভিযোগই উঠে আসছে। অনুব্রতবাবু যেমন দাবি করেছেন তাপস বাগদী(৪০) আত্মহত্যা করেছেন তেমনি জেলা বিজেপির তরফে দাবি করা হয়েছে পুরুলিয়ার বলরামপুরের তিন বিজেপি কর্মীকে খুন করার ধাঁচেই খুন করা হয়েছে তাপসকে। যদিও এপ্রসঙ্গে জেলার পুলিশ সুপার কুনাল আগরওয়াল জানান, দীপকবাবুর খুনের সঙ্গে তাপস বাগদীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর কোন যোগ নেই। দীপকবাবুর খুনের পিছনে কারা জড়িত সেটা আটক হওয়া ৭জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করের পরেই আভাস মিলতে পারে। আর তাপসের দেহের ময়নাতদন্তের রিপোর্টেই বলে হয়েছে এটা আত্মহত্যার ঘটনা। তাই খুনের প্রশ্ন উঠছে না। কেউ যদি ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির রঙ লাগাতে চায় তাহলে পুলিশও সেভাবেই তদন্ত করবে। দাবি আর তাকে ধিরে পাল্টা দাবি যতই জোরালো হোক না কেন, তৃণমূলের আমলে অনুব্রতর জেলায় এখন দলের অন্দরেই ক্রমশ জাঁকিয়ে বসছে সন্দেহ আর আতঙ্ক। কারণ শাসক দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও যেভাবে দুষ্কৃতিদের হাতে একের পর এক নেতা আক্রান্ত হচ্ছেন বা মারা যাচ্ছেন তাতে সুস্থ শরীরে রাজনীতি করাটাই দায় হয়ে উঠছে দলের লোকেদের কাছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here