ujani

শিবানন্দ পাল: এলাহাবাদ প্রশস্তির লেখ থেকে আমরা জানতে পারলাম, গুপ্ত বংশের রাজা সমুদ্রগুপ্ত (৩২৫ থেকে ৩৮০ খ্রিস্টাব্দ) আর্যাবর্তের মোট ৯ জন রাজাকে পরাজিত করে গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। এঁদের ২ জন হলেন আমাদের আলোচ্য নাগদত্ত এবং চন্দ্রবর্মণ। যাঁরা ওই সময়ে এই আদি বঙ্গের শাসক ছিলেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রথমপুরুষ শ্রীগুপ্ত-র আদিনিবাস কোথায় ছিল, সে সম্পর্কে প্রামাণ্য তথ্য কিন্তু এখনও পাওয়া যায়নি। কেউ বলেছেন, তাঁরা বাংলায় রাজত্ব করতেন, বাঙালি ছিলেন, আবার কেউ বলেছেন তাঁরা মগধে রাজত্ব করতেন। তেমন কোনও সংগত প্রমাণ নেই। মানে এখনও জানা যায়নি। অবশ্য খোঁজখবর কতটা হয়েছে সে বিষয়টিও অজানা।

আদি বাংলার ইতিহাস প্রসঙ্গে ৪৩৬ খ্রিস্টাব্দে চিন দেশীয় পরিব্রাজক ইৎ সিং লিখেছেন, গুপ্ত বংশের মহারাজা শ্রীগুপ্ত নালন্দা হতে ৪০ যোজন (২৪০ মাইল) দূরে মৃগস্থাপন স্তূপ তৈরি করেছিলেন। ধীরেন্দ্রচন্দ্র গাঙ্গুলির মতে, মৃগস্থাপন স্তূপ ছিল মুর্শিদাবাদের কাছে। আবার সুধাকর চট্টোপাধ্যায়ের মতে, মৃগস্থাপন স্তূপ মালদহে ছিল। অর্থাৎ দু’জনের মন্তব্য বাংলার দিকে, একজনের মগধ। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, পশ্চিম বর্ধমান জেলার ভরতপুরে একটি বৌদ্ধস্তূপ আবিষ্কৃত হয়েছে। সুতরাং এ সম্পর্কেও আরও বিশদ তথ্য জানা প্রয়োজন। (পড়ুন সপ্তম পর্ব)

এলাহাবাদ স্তম্ভে উৎকীর্ণ লিপি থেকে জানা যায়, সমুদ্রগুপ্ত প্রথমে গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী অঞ্চলগুলি জয় করেছিলেন। তারপর নেপাল, অসম এবং বাংলা তথা পূর্ব-ভারতের দেশগুলি জয় করেছিলেন, আবার এদের অনেককেই করদরাজ্য হিসাবে স্বশাসনের অনুমতিও দিয়েছিলেন। বোঝা যায়, গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থানকালে বাংলাদেশে অনেকগুলি স্বাধীন রাজ্য ছিল। শুশুনিয়ার পর্বতগাত্রের খোদিত লিপিতে যেমন পুষ্করণা-র অধিপতি সিংহবর্মা ও তাঁর পুত্র চন্দ্রবর্মা-র কথা পাওয়া যায়। তেমনই পাওয়া গিয়েছে উজানির শাসক নাগদত্ত-র কথা। বিনয় ঘোষ কর্তৃক উজানিনগরে সংগৃহীত ছড়া’র কথা আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে! গত শতকের পঞ্চাশের দশকে যা তিনি উজানি ক্ষেত্র সমীক্ষাকালে সংগ্রহ করেছিলেন। বিনয় ঘোষ উজানি কোগ্রাম অঞ্চলে উদ্ধার করেছিলেন এই ছড়া: ‘চার মাস বর্ষা, পোখরনা যায় (যাই)/ পোখরনা গিয়ে দেখি দুয়ারে মড়াই/ ছোট মড়াই-এ পা দিয়ে বড় মড়াই-এ পা দিয়ে/ রাই এস গো ঝলমলিয়ে’।

ভূ-মানচিত্র অনুযায়ী বোঝা যায়, বর্ষাকালে উজানি থেকে পোখরনা যাওয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয়, জলপথে নৌকাবাহিত হয়ে সহজসাধ্য ব্যাপার। ছোট মড়াই, বড় মড়াই… ইত্যাদি বিষয়ে বোঝা যায় মানুষের অবস্থা বেশ ভালই ছিল। আরও একটি বিশেষ ব্যাপার যে, এই অঞ্চল কৃষিকেন্দ্রিক হলেও এখানকার মানুষ বছরের বিশেষ সময়ে বাণিজ্য করতেন। বছরের একটা সময় চাষাবাদের কাজ ছিল না। আবার বণিক সম্প্রদায় হিসেবে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের বসবাস এই অঞ্চলে এখনও রয়েছে। এরা ছড়িয়ে আছেন বর্ধমানের এই অঞ্চলে শুধু নয়… বাঁকুড়া জেলার শুশুনিয়ার অঞ্চলেও। ছড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের কোটালিপাড়া অঞ্চলেও। বিষয়গত দিক দিয়ে এ বিষয়টিও রীতিমতো চিত্তাকর্ষক। কিন্তু বিনয় ঘোষ কৃত ছড়ার শব্দ ‘রাই’? রাই মানে রাধা নাকি? তা হলে তো কেষ্টও বাদ যায় না! কী বলেন? আসলে ছড়াকার যে সময়ের কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন, তখন গার্হস্থ্যজীবন‌ও ছিল সহজ সরল সুন্দর।

স্বামীর মঙ্গলকামনায় স্ত্রী খুল্লনা ঘট পেতে মা চণ্ডীর পুজো করছিলেন। এই দৃশ্য দেখে পরম শিবভক্ত ধনপতি সওদাগর পুজোর ঘটে সজোরে লাথি মেরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। কারণ তিনি শৈব। মহাদেবের পূজারী। রাজার নির্দেশে ধনপতি সওদাগর বাণিজ্যের জন্য সিংহল যাত্রা করেন। স্ত্রী খুল্লনা তাঁর মনোকষ্ট নিয়ে আকুল নয়নে স্বামীর সিংহল যাত্রার মঙ্গলকামনায় দাঁড়িয়ে থাকেন উজানিনগরের অজয়ের তীরে। ধনপতি সওদাগরের সপ্তডিঙা বাণিজ্য করতে চলছে। সমুদ্র পাড়ি সিংহল কতদূর… অজানা ভবিষ্যৎ… উজানি পিছনে পড়ে থাকে। গবেষকদের মতে, এসব প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথা। সেসময় নৌপথে মঙ্গলকোটের উজানিনগর থেকে সিংহল যাতায়াতের সময় লাগত কম করে একবছর। ধনপতির বাণিজ্য রসদ নিয়ে সপ্তডিঙাগুলি একে একে চলেছে। কত সুন্দর সুন্দর নাম ওদের‌। মধুকর, শঙ্খচূড়, দুর্গাবর, ছোটমুখী, চন্দ্রবাল, গুয়ারেখী ও নাটশাল‌। ধনপতি নিজে স‌ওয়ার হয়েছেন মধুকর ডিঙাতে। মধুকরের মাস্তুলের নিশান ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। আপন মনঃকষ্ট নিয়ে খুল্লনা নিজের গৃহে ফিরে আসেন।

‘উজানিনগর’ বললে এখন অনেকেই বুঝতে পারবেন না। সমুদ্রগুপ্তের সময়ে উজানিনগর সমৃদ্ধ ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে। ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনী কুনুর এখানে অজয় নদের সাথে মিলিত হয়েছে। এই সঙ্গমস্থলের অনেক গল্পকাহিনি এলাকার মানুষের মুখে মুখে এখনও ঘোরাফেরা করে। উজানিনগর এখন তার গৌরব হারিয়েছে। বর্তমানে মঙ্গলকোটের উজানিনগরকে মানুষ চেনে কোগ্রাম নামে। উজানি বা কোগ্রাম এখন হিন্দুদের একটি পীঠস্থান। পুরাণ মতে, এখানে দেবী ভগবতীর কনুই পড়েছিল। হিন্দুদের এই পীঠস্থানে দেবী মঙ্গলচণ্ডী এবং ভৈরব কপিলেশ্বরের প্রস্তর মূর্তি রক্ষিত আছে।

জনশ্রুতি, দেবী মঙ্গলচণ্ডীর পুজো দেশে প্রচলন করার জন্যই দেবীর ইচ্ছাতে স্বর্গের অপ্সরা অভিশাপগ্রস্ত ‘রত্নমালাকে’ মানবীরূপে খুল্লনা করে এই উজানিনগরে পাঠানো হয়েছিল। প্রসিদ্ধ বণিক ধনপতি দত্তের এক স্ত্রী থাকতেও খুল্লনার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি তাঁকে বিবাহ করেন। কিন্তু পরম শিবভক্ত ধনপতি মাতৃকা শক্তির পূজারিণী খুল্লনার প্রতি অত্যাচার-অবিচার করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। খুল্লনা বনের মধ্যে গিয়ে দেবী মঙ্গলচণ্ডীর পুজো দিয়ে সমস্ত দুঃখ থেকে মুক্তি পান। ধনপতি বেশ কয়েকমাস সমুদ্রযাত্রার পর সিংহলের কাছকাছি কালীদহে কমলেকামিনীর অভাবনীয় দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন। সমুদ্রের জলের উপরে এক পরমসুন্দরী রমণী দু’হাতে দু’টি পূর্ণবয়স্ক হাতি নিয়ে পদ্মফুলের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন, মাঝে মাঝে তিনি ডুবেও যাচ্ছেন। দৃশ্য দেখে অবাক ধনপতি বাণিজ্য শুরুর আগে সিংহলরাজকে এই কাহিনি অবগত করলেন। সিংহলরাজা এসব গালগল্পে বিশ্বাস করলেন না। ধনপতি স‌ওদাগর তাঁর নিজের জীবন বাজি রেখে সিংহলরাজাকে ওই দৃশ্য দেখাবেন বলে গোঁ ধরলেন। কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গা কালীদহে গিয়ে ধনপতি সিংহলরাজকে আর কমলেকামিনী দৃশ্য দেখাতে পারলেন না। স্বাভাবিক কারণে বাজিতে হেরে ধনপতি সদাগরকে সিংহল রাজার কারাগারে বন্দি থাকতে হয়। ধনপতির সঙ্গীরা বাণিজ্যের পসরা নিয়ে সপ্তডিঙা সহ ফিরে এলেও তারা ধনপতি সদাগরের কোনও খোঁজ দিতে পারে না। বছর পার হয়… ধনপতি সওদাগরের আর কোনও খবর পাওয়া যায় না। ধনপতি সওদাগর নিখোঁজ ঘোষণা হয়। উজানিনগরে শোকের ছায়া নেমে আসে। ধনপতির স্ত্রী খুল্লনার গর্ভজাত সন্তান শ্রীমন্ত তখন শিশু। খুল্লনা নিয়মিত মা চণ্ডীর আরাধনা করেন। শ্রীমন্ত যুবক হয়ে সওদাগর বাবা ধনপতির খোঁজে সপ্তডিঙা ভাসায়। বাবার মতো একই ভাবে সেও সিংহল যাত্রা করে। সে ঠিক বাবাকে সিংহল রাজার কারাগার থেকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনে।

সিংহল যাত্রার আগে উজানির যে স্থানে দাঁড়িয়ে শ্রীমন্ত মা খুল্লনার আশীর্বাদ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, উজানিনগরে আজ সেই স্থানের নাম ‘শ্রীমন্তের ডাঙা’। ধনপতি সওদাগর যখন বাণিজ্যে যেতেন না, তখন তার ডিঙাগুলোকে রেখে দেওয়া হত অজয়-কুনুরের সঙ্গমস্থলে, সেই স্থান আজও ‘ভ্রমরার দহ’ নামে পরিচিত। চণ্ডীমঙ্গলের কাহিনি মানুষের কাছে যুগযুগ ধরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেজন্য কাহিনির স্থান কাল পাত্রপাত্রী সকলেই বাঙালিজীবনে পরিচিত। কুনুর-অজয় অধ্যুষিত কোগ্রাম অঞ্চল ভীষণ বন্যাপীড়িত। সেকারণে গল্পকথা বা লোককাহিনির স্থানগুলি পরিবর্তিত হয়েছে বারবার। মঙ্গলকোটের এই অঞ্চলে অজয়-কুনুর-গঙ্গার এই অববাহিকায় বিভিন্ন সময়ে বহু বিষ্ণু মূর্তির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। একসময়ে বিষ্ণু বা নারায়ণ যে এই অঞ্চলের আরাধ্য দেবতা ছিলেন, এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। এখানে পাওয়া গিয়েছে সূর্যদেবতার‌ও মূর্তি। তবে এখানে বিষ্ণু মূর্তির আধিক্য বেশি। আমরা আগেই জেনেছি বাংলাদেশের কোটালিপাড়াতেও সূর্যমূর্তি পাওয়া গিয়েছে, যার উল্লেখ কিছু কিছু সাহিত্যকর্মে দেখা গিয়েছে।

উজানিনগর সংলগ্ন অঞ্চলে প্রাপ্ত বিষ্ণু মূর্তিগুলি আকারে-প্রকারে বিভিন্ন ধরনের। সেগুলির কোনওটি স্থান পেয়েছে সংগ্রহশালায় অথবা কোনওটি পুলিশ চৌকিতে, নয়তো আশ্রিত হয়েছে কারওর ব্যক্তিগত সংগ্রহে, নয়তো পড়ে আছে খোলা আকাশের নিচে। কখনও স্থানীয় মানুষ সেখানে দেবালয় তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন বা কোনও বিশেষ সময়ে তা পূজিত হয়। তারপর পড়ে থাকে। আশ্চর্যের বিষয়, গঙ্গামৃত্তিকার নরম মাটির দেশে এত পাথুরে মূর্তির আধিক্য কী করে হল? শুধু ছোট ছোট মূর্তি নয়, বড় বড় মূর্তিও আছে। এই অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত মূর্তিগুলি ভাস্কর্যের দিক থেকেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পশৈলীতেও এগুলি ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির। চমকিত হতে হয় এই অঞ্চলে প্রাপ্ত পাথরের দশভুজা মহিষমর্দিনী সিংহবাহিনী চণ্ডিকা মূর্তির সঙ্গে পদ্মের উপর আসীন ধ্যানী বুদ্ধ মূর্তি উজানিনগরের স্থানীয় মন্দিরে পাশাপাশি একসাথে পূজিত হতে দেখে।। (পড়ুন নবম পর্ব)

কভারের ছবি: উজানিনগরে মন্দিরে চণ্ডিকা মূর্তির পাশে পদ্মের উপরে আসীন ধ্যানী বুদ্ধ মূর্তি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here