লোহিতকণিকার প্রেম।। দেবদাস কুণ্ডু

0
101
galpo

বেলারানি তাকিয়ে আছেন ঘরের বাইরে। বাইরে কী আছে? একটা লম্বা টানা বারান্দা আছে। সেই বারান্দা জুড়ে পর পর পাঁচটা ঘর। বেলারানির ঘরের নম্বর ‍‌৩৮। তারপর ৩৯ এবং ৪০, চারতলা বিল্ডিং। বিল্ডিংটা পাখির ডানার মতো। বাঁ পাশের ডানায় পাঁচটা ঘর, ডান পাশের ডানায় পাঁচটা। ২৬০ স্কয়ার ফুট। তার মধ্যে একটা বড় ঘর। একটা মাঝারি রান্নাঘর। আর একফালি বাথরুম। ৪০টা ঘর নিয়ে এক একটা বিল্ডিং। মোট ১২টা বিল্ডিং, মানে ৪৮০টা ঘর। নাম বি. আর. এস.। পুরো নাম বস্তি রিফিউজি সোসাইটি। মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের অবদান।
বেলারানি ৯ নম্বর বিল্ডিংয়ের চারতলায় ‍‌৩৮ নম্বর ঘরে বসে বাইরেটা দেখছেন এখন। কী দেখছেন? না, চার ফুট হাইটের জাফরি রেলিংয়ের উপর বিপজ্জনকভাবে পর পর ফুলের টব। লাল জবা, সাদা বেল, নীল অপরাজিতা। তার ওপর একটু সাদা একটু নীল আকাশ। বেলারানি কি সত্যিই এসব দেখছেন?
চৌকির ওপর আমরা পঞ্চপাণ্ডব চুপচাপ। তা প্রায় অনেকটা সময়। হিমযুগের নিস্তব্ধতা ভেঙে বেলারানি বললেন, ‘‘এই ফুলগাছের যত্ন নিতেন লোকটা। অতিকষ্টে চারতলার সিঁড়ি ভেঙে নিচে গিয়ে রেলপুকুরের পাড়ে একটা নার্সারি থেকে মাঝে মাঝে সার নিয়ে আসতেন। খুন্তি দিয়ে মাটি আলগা করে সার, জল দিতেন। এক একদিন বলতেন, ‘বুঝলে চণ্ডীর মা, ছেলেরা তো সব আলাদা থাকে। বৃদ্ধ বয়সে এই গাছেরাই আমাদের সন্তান; ফুল, রং আর গন্ধ দিয়ে আমাদের নিঃসঙ্গতা দূর করবে।’’
‘‘আমার কোনও নিঃসঙ্গতা নেই। আমি বলতাম, ‘আমার পাঁচ ছেলে। ডাকলেই তারা আসে। বাজারহাট করে দেয়। অসুখ হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। নাতি-নাতনিরা আসে। আমার বাপু নিঃসঙ্গতা হবে কেন?’’
‘‘তুমি একটা বোকা। লোকটা রেগে গিয়ে বলতেন, ‘কেন জানো বাজারহাট করে দেয়। বোঝো না? আমার বাড়িতে থাকে। আমি যদি উঠে যেতে বলি। কোথায় গিয়ে থাকবে?’’
‘‘ওমা। এ কী কথা? এই পায়রার খোপের মধ্যে পাঁচ ছেলে বউ নাতি নাতনি নিয়ে থাকতে পারতে? তুমি বাড়িটা কিনেছিলে কেন? ভূতে থাকবে বলে? তোমার ছেলেরা তোমার বাড়িতে থাকবে না তো গাছতলায় থাকবে নাকি?’ আমি জোর গলায় বলতাম।’’
‘বেশ বাৎসল্য দেখাচ্ছ? দেখবে, আমি যখন থাকবে না কোন ছেলে তোমায় দেখে?’
বেলারানি চুপ করে থাকলেন। তার চোখে বিষণ্ণতা। বললেন, ‘আমার বিশ্বাস ওরা দেখবে। ওদের মানুষ করেছি বলে নয়। মা বলেও নয়। মানুষ মানুষের জন্য করবে। আমি ওদের গর্ভে ধারণ করেছি, ওরা আমারই সত্বার অংশ।’
লোকটা রেগে যেতে বলতেন, ‘লেখাপড়া জানো না। বড় বড় কথা বেশ বলো, কাগজ যদি পড়তে রোজ তা হলে এই বুকভরা স্বপ্ন তোমার ভেঙেচুরে যেত।’
‘তা হলে বলব, লেখাপড়া না শিখে ভাল করেছি। মানুষের জন্য মানুষ করবে এই কর্তব্যবোধ ভুলে যেতাম। তা তুমি তো কিছু লেখাপড়া শিখেছ, সেই শিক্ষার এই হাল!’
‘মানে।’
‘কোনওদিন তো আমাকে এতটুকু ভালবাসলে না।’ আবার বেলারানি চুপচাপ। মুখে না পাওয়ার বেদনা।
‘কী যা-তা বলছ? তা হলে এই ঘরসংসার, ছেলেমেয়ে এগুলো হল কী করে?’
‘এসব তুমি করেছ জৈবিক টানে। ভালবেসে নয়। ছেলেমেয়ে? সে তো একবিছানায় শুয়েছি। তাই হয়েছে। তাই প্রতি আড়াই বছর অন্তর সন্তানের মা হয়েছি। বলো তো কোন মেয়েটা দুই বা তিন বছর অন্তর মা হতে চায়? গর্ভযন্ত্রণা তুমি বোঝো? যদি বুঝতে মানে আমাকে এতটুকু ভালবাসতে তবে আমি আটটি জীবিত আর একটি মৃত সন্তানের মা হতাম না।’
‘তুমি জানো না, লোকবলই হচ্ছে বাহুবল। এই আমি যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে এখানে চলে এলাম। কেন জানো? আমি আমার মায়ের একমাত্র সন্তান। ওদের সঙ্গে পারব না। তাই প্রাণে বাঁচতে চলে এসেছি।’
galpoএবার বেলারানি বড় করে একটা নিশ্বাস ফেললেন, বললেন, ‘আমিও তো তাই। নারীর সম্মান বাঁচাতে চলে এসেছি। তখন ১২ বছরের কিশোরী। পঞ্চাশ বছর আগে আমরা যে জনসংখ্যা বাড়িয়েছি তার চাপে পৃথিবী এখন মরতে বসেছে। পশুপাখি, মৌমাছি, সাপ, হাতি, গন্ডার কারও জায়গা হচ্ছে না এই পৃথিবীতে। সবটা মানুষ দখল করে নিয়েছে। কিন্তু শুধু মানুষ কি এই পৃথিবীকে বাঁচাতে পারবে?’
‘আচ্ছা তুমি এতসব জ্ঞানের কথা কোথায় পাও বলো তো?’ লোকটা বলতেন।
‘কেন? কোনার ঘরের রবি, পাশের ঘরের শ্যামল, আমার নাতনি ঝিমলি, নাতি আবীর ওরা গল্প করে যে।’
‘ও নাতি-নাতনি এসে জ্ঞান দিয়ে যাচ্ছে। কই আমাকে তো দেয় না।’
‘তুমি ওদের কোনওদিন ভালবেসেছ? আমার গলায় রাগ ঝরে পড়ত, ‘আদর করেছ? তোমার লালচোখ। মেঘগর্জন গলা। ছেলেরা ভয় পেয়েছে।’’
‘তার মানে আমি ডাকাত?’
‘জানি না তুমি কী? গর্ভযন্ত্রণা নিয়ে ছটফট করেছি। কখনও কাছে এসে বলোনি খুব কষ্ট হচ্ছে না বেলা? ওই তোমার বুড়ি মা জলঝড়ের রাতে নিয়ে গেছে হাসপাতাল। তুমি কোনওদিন হাসপাতাল গিয়ে ছেলেমেয়েদের দেখোনি। তোমার শুধু কাজ আর কাজ।’
‘দুটো ব্যবসা করতাম, সামলে সময় কোথায় ছিল আমার?’
‘হ্যাঁ। ব্যবসা তো পৃথিবীতে তুমিই একা করেছ। একদিন যদি যেতে হাসপাতালে, দেখতে বিকেলবেলা স্বামী আসছে স্ত্রীকে দেখতে। সদ্যোজাতকে দেখতে বিছানার পাশে বসে সন্ধ্যার অন্ধকার নামা না পর্যন্ত থেকে গেছে। নার্স দিদিরা তাড়িয়ে দিচ্ছে। তবু যায় না। দরজা-জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। তারা কি কাজ করে আয় করেনি? এখন শেষবয়সে বলছ গাছ তোমায় দেখবে। ফুল দেবে, গন্ধ দেবে, রং দেবে। জীবনের সব রং হারিয়ে এখন ফুলের কাছে রং চাইছ। জীবন শেষ করে এখন গাছের কাছে চাইছ প্রাণ।’
বেলারানি হাঁফাচ্ছেন। বয়স ৭০। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ঘনঘন পড়ছে নিশ্বাস। কম কথা তো বললেন না। কাকে বললেন? পঞ্চপাণ্ডবকে? কিংবা এই পৃথিবীকে। এই আকাশ, গাছ, ফুল, পাখিকে। হয়ত কাউকে নয়। নদী যেমন আপন বেগে বয়ে যায়, তেমন আপন আবেগে বলে গেলেন নিজের লুকোনো বেদনা। আমরা পাঁচটা ভাই অশৌচ কাপড়ে বসে শুনলাম।
চণ্ডী বলল, ‘আমরা তো এসব কিছু কিছু জানি মা, তোমার দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা আছে। আমরা তো কোনওদিন বাবার ওপর কথা বলতে পারিনি।’
বড়দার কথা শেষ হতে বেলারানি বললেন, চিরটাকাল মেজাজ দেখিয়েছেন তোদের সাথে, আমার সাথেও। ‘লোকটা ভাব কত বড় স্বার্থপর। বলে কি না বাড়ি লিখে দিলে ছেলেরা দেখবে না।’
‘মা, বাবা কিন্তু কথাটা মিথ্যে বলেনি। চারপাশে এখন এমনটাই হচ্ছে।’
‘থাম তুই অলক। সব মানুষ অমানুষ হয়ে যায় না। সূর্যের আলো ফুরিয়ে গেলে চাঁদের আলো পড়ে পৃথিবীতে। যদি সব ছেলে বাবা-মাকে না দেখত, তবে নতুন দম্পতিরা সন্তানের জন্ম দিত না। শিশুর কান্নাহাসি পৃথিবীকে সজীব রাখত না!’
‘আমার মনে হল, এই বেলারানি কে? এই দর্শন তাকে কে দিল।’ কবে তিনি এসব উপলব্ধি করলেন? নিবারণ দাস মাত্র গেছেন তিনদিন হল।’
‘দেখ লোকটা আমাকে কোনও একটি গয়না দেয়নি কোনওদিন। নিজে হাতে কিনে আনেননি একটা শাড়ি। অলক তোর বউ অনিতা আমাকে দিয়েছে শাঁখা বাঁধানো। সে পরের মেয়ে। সে বুঝেছে আমার না পাওয়া কষ্ট। যে দিন দিল শাঁখা বাঁধানো সেদিন আমি অনিতাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছি। সেদিন তোর বউ কি বলেছিল জানিস? বলেছিল, ‘মা তুমি কেঁদো না। আমি তোমার বউ না, মেয়ে।’ সেই অনিতাকে বউমা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি লোকটা। কেন? না প্রেম করে বিয়ে করেছে তার ছেলেকে? প্রেমটা এতই ঘৃণ্য, অন্যায় অপরাধ। আসলে নিজে তো কাউকে ভালবাসেনি। তার চোখ দুটো ছলছল করছে, গলার স্বরটা ভেজা ভেজা লাগছে।
‘ছাড়ো মা, যে লোকটা চলে গেছে, তাকে নিয়ে আর কথা বাড়িয়ো না।’
‘হ্যাঁ, তোরা বলতে পারিস অলকের বউ চাকরি করে তাই দিতে পেরেছে। কিন্তু লোকটা কি কম টাকা আয় করেছে? এত বড় একটা সংসার চালিয়েছে। কিন্তু আমার সামান্য একটা শখের কথা ওনাকে বলেও পাইনি আমি! কোনওদিন আমার নামটা মুখে আনেনি। নামটা আমি ভুলে যেতাম। যদি না ভোটের সময় লোক এসে নাম ধরে ডাকত। তাও ভোটের কাগজে বেলারানি শুধুই বেলা। রানিটা খসে গেছে। সে কথা বলতে লোকটা বলেছিল, কবে তুমি রানি ছিলে? পিসেমশাই তো কিছুটা দিয়েই আমার হাতে তুলে দিয়ে গেল। ‘বলেছি, পিসেমশাই গরিব। কী দেবে? তুমি কী দিলে আমাকে? দু’বেলা খাবার! থাকা। আর পাছার কাপড়। এই কি জীবন। এই কি জীবনের চাওয়া!
‘মা। ছাড়ো না।’ ছোটভাই অভি বলল।
‘বললাম, তোমার সম্পত্তি ছেলেদের নামে লিখে দাও।’ বলল, জীবিত থাকতে লিখে দেব না।
‘ওরা যদি সম্পত্তির জন্য রক্তপাত করে।’
‘তুমি দেখবে। আমি তো থাকব না।’
‘তার মানে রক্তপাতের দৃশ্য আমি দেখব, কারণ আমি পাঁচটা ছেলের জন্ম দিয়েছি। আমি মা। আমি কুন্তি। আমি গান্ধারী।’
আমরা পঞ্চপাণ্ডব স্তব্ধ। মহাভারত। নিরক্ষর মহিলা। সিরিয়ালে মহাভারত দেখেছিল। নিজের ভিতর কুন্তিকে গান্ধারীকে খুঁজে পেল?
‘লোকটা জানিস মৃত্যুকে খুব ভয় পেত। অথচ দেখ, মাঝরাতে বলল, বুকে ব্যথা করছে। আমি তেল মেখে দিলাম। ঘুমিয়ে পড়ল। আর উঠল না। নিঃশব্দে, কোনও ছটফট না করে চলে গেল। কখনও কোথাও বুঝি কোনও একটা ভাল কাজ লোকটা করেছে। কী কাজ জানি না আমি।’

।।দুই।।
galpoজানা গেল আজ। বাবার লকার খুলে এক একটা কাগজ বের করা হচ্ছে। বাড়ির দলিল, জমির দলিল, ভাড়ার বিল, ফ্ল্যাটের কাগজ ১৯৫০ সালে কমুন্যাল ডিস্টারবেন্সে ১৫,০০০ টাকার সম্পত্তি পাকিস্তানে ফেলে এদেশে চলেছেন, তার এফিডেফিট এদেশের সিটিজেনশিপের কাগজ সব শেষে একটা কাগজ পেয়ে আমি চমকে উঠলাম, দেখলাম, উপরে লেখা উইল বা চরমপত্র।
‘কীরে অলক কী দেখছিস?’
‘দেখছি না, পড়ছি।’
‘কী পড়ছিস আমাকে শোনা।’
‘আমি শ্রী নিবারণ দাস, পিতা ঈশ্বর রাজেন্দ্রলাল দাস। জাতি হিন্দু। আমার বয়স বর্তমানে ৭৪ বৎসর হইয়াছে। এবং আমার আশঙ্কা যে কোনদিন যে কোন সময় আমার জীবনদীপ নির্বাপিত হইতে পারে। তাই আমার মৃত্যুর পর আমার বাড়ি, জমি, আবাসন এবং ৭০ হাজার টাকার সব স্বত্ব এবং অধিকার সজ্ঞানে, কারো প্ররোচনা ছাড়াই আমার একমাত্র স্ত্রী বেলারানী দাসকে দিয়া গেলাম। যদি আমার পুত্ররা তাকে ভরণপোষন, থাকা, চিকিৎসা এবং মানসিক সঙ্গ দান না করে তবে তিনি সব সম্পত্তি বিক্রি করিয়া বৃদ্ধাবাসে চলিয়া যাইতে পারিবেন।’
galpoআমি থামলাম। আরও চারটে পাতা আছে। থাক। একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে বললাম, ‘মা তুমি বললে না কখনও কোথাও বুঝি কোনও একটা ভাল কাজ করেছে লোকটা! সত্যিই করেছে। বাবা তোমাকে ভালবেসে ছিল মা, নীরবে। সকলের ভালবাসা তো একরকম হয় না।
কথাটা শুনলেন বেলারানি। উঠে গেলেন রান্নাঘরে। একটা ছোট বালতিতে জল নিয়ে বারান্দায় গেলেন। আজ তিনদিন জল পায়নি গাছগুলি। শুকিয়ে গেছে। বিবর্ণ হচ্ছে পাতা। এর আগে কোনওদিন জল দেননি বেলারানি। আজ গাছে জল দিচ্ছেন পর পর। আর আশ্চর্য হচ্ছেন ভেজা মাটি থেকে উঠে আসছে নিবারণ দাসের গায়ের গন্ধ।
তিনি সম্মোহিতের মতো গাছগুলোর কাছে দাঁড়িয়ে থাকলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here